ত্রাণ চাই না- টেকসই বেড়িবাঁধ চাই

ঘূর্ণিঝড় সিডর, ইয়াস, আইলা, মহাসেন, বুলবুলের আঘাতের ক্ষত এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেননি উপকূলীয় মানুষেরা। আবারো হানা দিল প্রলঙ্করী ঘূর্ণিঝড় রেমাল। লন্ডভন্ড করে দিল উপকূলীয় জনপদ। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয় বেড়িবাঁধ বিহীন এলাকা গুলো। ষাটের দশকে নির্মিত হওয়া একাধিক বেড়িবাঁধ গুলো বিভিন্ন বন্যা ও জলোচ্ছাস ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। বারবার সংস্কার করা হলেও নির্মিত হয়নি টেকসই বেড়িবাঁধ। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ উপকূলীয় এলাকার মানুষগুলো এখন ত্রাণ চায় না। তাইতো সকলের প্রাণের দাবী টেকসই বেড়িবাঁধের।
২০২১ সালের ১৬ জুন জাতীয় সংসদে পটুয়াখালী-৩ আসনের সংসদ সদস্য এস এম শাহজাদা “ত্রাণ চাই না, বাঁধ চাই” লেখা প্ল্যাকার্ডটি নিজের গলায় ঝুলিয়ে স্থায়ী বেড়িবাঁধের দাবী তুলেছিলেন।
‘মিথ্যা আশ্বাস আর নয়; এবার টেকসই বাঁধ চাই, আর চাইনা ভাসতে; এবার দিন বাঁচতে, উপকূলের কান্না; শুনতে কি পান না’- এমন বিভিন্ন স্লোগান তুলে মানববন্ধন করেছে সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপকূলের সহস্রাধিক তরুণ ও স্থানীয় উপকূলবাসী। ২৮ মে বিকেল ৫টায় ঘূর্ণিঝড় রেমালসহ বিভিন্ন সময়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্থ উপকূলীয় এলাকায় টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের দাবিতে সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার পদ্মপুকুর ইউনিয়নের পাতাখালী পয়েন্টে ধ্বসে যাওয়া ক্ষতিগ্রস্থ বেড়িবাঁধের ওপর এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।
বরগুনার তালতলীতে নিশানবাড়িয়া ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকায় ভয়াবহ ভাঙন প্রতিরোধে স্থায়ী ও টেকসই বেড়িবাঁধের দাবিতে মানববন্ধন করে সর্বস্তরের জনগণ। ত্রাণ চাই না, স্থায়ী ও টেকসই বেড়িবাঁধ চাই- প্রধানমন্ত্রীর কাছে এমন দাবি করেন ভুক্তভোগীরা। কক্সবাজারের চকরিয়ায় মাতামহুরী নদীর বিএমচর কণ্যারকুম টার্নিং পয়েন্টে স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মানের দাবিতে মানববন্ধন করেছে স্থানীয় জনসাধারণ।
গত ২৬ মে রাতে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গে আঘাত হানে প্রবল ঘূর্ণিঝড় রেমাল। সরকারি হিসাবে, ঝড়ের প্রভাবে জলোচ্ছ্বাসে, ঘর ভেঙে ও দেয়াল ধসে পটুয়াখালী, সাতক্ষীরা, ভোলা, বরিশাল, খুলনা ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলায় অন্তত ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। ঝড়ের মধ্যে জলোচ্ছ্বাসে বাঁধ ভেঙে উপকূলের বহু জনপদ তলিয়ে যায়। রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি, ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ঘূর্ণিঝড়ে ২০ জেলায় ৬ হাজার ৮৮০ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে প্রাথমিক হিসেবে বেরিয়ে এসেছে। তবে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি আরো বেশি।
ঘূর্ণিঝড় রেমালের কারণে পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার পানপট্টি বোর্ড এলাকায় বাঁধটি বুড়াগৌরাঙ্গ নদীর তীব্র গতির ঢেউয়ে ভাঙন শুরু হয়। তখন উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. মহিউদ্দিন আল হেলাল সেখানে উপস্থিত হয়ে বাঁধ রক্ষার জন্য চেষ্টা করেন। তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে দুইটি বেকু (মাটি কাটার যন্ত্র স্কভেটর) দ্বারা প্রায় ১৬ ঘণ্টা মাটি কেটে বস্তা ফেলে মূল বাঁধের পাশ দিয়ে আরেকটি বাঁধ তৈরি করা হয়। ঘূর্ণিঝড় শেষে দেখা গেছে ঢেউয়ের তোপে মূল বাঁধটি নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে আর নতুন বাঁধটি টিকে গেছে। এছাড়া ডাকুয়া ইউনিয়নের তেঁতুলতলায় উপজেলা প্রশাসন এর নির্দেশনায় নতুন করে কয়েক হাজার জিও ব্যাগ ফেলা হয় দুর্যোগকালীন সময়। সরেজমিনে দেখা যায় এসব বেড়িবাঁধ বেশিরভাগ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও শেষ মুহূর্তের কর্মকান্ডের জন্য বিলীন হয়ে যায়নি।এসব বেড়িবাঁধ রক্ষা করতে না পারলে গলাচিপা পৌরসভাসহ অন্তত ৬টি ইউনিয়ন সম্পূর্ণরূপে পানিতে নিমজ্জিত হতো এবং ভেসে যেত হাজার হাজার ঘর-বাড়ি, পশু-পাখি, ফসলের ক্ষেত, মাছ, রাস্তাঘাট।
উপজেলার চরকাজল ইউনিয়নের বড় চরকাজল এলাকার ২ নম্বর ওয়ার্ডের শান্ত মুদির বাড়ির পাশ দিয়ে ২০/২৫ ফুট ও একই এলাকার বেড়িবাঁধের তিনটি পয়েন্টে ভেঙে জোয়ারের পানি প্রবেশ করেছিল। এতে করে ২০ হাজার পরিবার পানিবন্দী।
বঙ্গপোসাগরে সৃষ্ট প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় রেমালের আঘাতে সাতক্ষীরার উপকূলীয় জনপদে ১৫০০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড সাতক্ষীরা-১ ও ২ এর অধীনে ২০টি পয়েন্টে এসব বাঁধ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে শ্যামনগর উপজেলার কপোতাক্ষ ও খোলপেটুয়া নদীবেষ্টিত সুন্দরবনসংলগ্ন ব-দ্বীপ অঞ্চল গাবুরা ইউনিয়নের সাড়ে ২৯ কিলোমিটার বেড়িবাঁধে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ও নতুন করে ফাঁটল দেখা দেয়ায় হুমকির মুখে পড়েছে এখানকার বসবাসরত মানুষ।
বরগুনায় ঘূর্ণিঝড় রেমালের প্রভাবে তীব্র জোয়ারের পানির চাপে বাঁধ ভেঙে পাঁচটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পায়রা ও বিষখালী নদীর বেড়িবাঁধ ভেঙে বরগুনা সদর ও আমতলী উপজেলায় এ প্লাবিত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে আমতলী উপজেলার আড়পাংগাশিয়া ইউনিয়নের পশরবুনিয়া নামক এলাকায় তিনটি ও সদর উপজেলার ঢলুয়া ইউনিয়নের ডালভাঙ্গা নামক এলাকায় দুইটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।
২০২৩ সালের ১৪ মে বেলা ৩টার দিকে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের উপকূলে আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় মোখা। যার প্রভাবে ভারী বৃষ্টি ও ঝড় হয় এবং প্রতি ঘণ্টায় ১৭৫ মাইল পর্যন্ত বেগে প্রবল বাতাস বয়ে যায়। ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে সেন্ট মার্টিন, টেকনাফ আর শাহ পরীর দ্বীপের মানুষেরা। ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং ২০২২ সালের ২৫ অক্টোবর বাংলাদেশ ও ভারতকে প্রভাবিত করেছিল। বরিশালের কাছে বাংলাদেশের ওপর আছড়ে পড়ে। ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের আঘাতে দেশের ১৪ জেলায় ৩৩ জন মারা যান। ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের তান্ডবে দেশের ১০ হাজার ঘরবাড়ি এবং ৬ হাজার হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
২০২০ সালের ২০ মে বাংলাদেশে আঘাত হানে সুপার সাইক্লোন আম্পান। এতে বাঁধগুলো ভাঙার ফলে পটুয়াখালী জেলার অন্তর্গত গলাচিপা, কলাপাড়া, এবং রাঙ্গাবালীসহ ১০টি গ্রাম ডুবে যায়। প্রায় ৩হাজারটি চিংড়ি এবং কাঁকড়া খামার বন্যায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়ে যায়। সাতক্ষীরা জেলার, পূর্ব দুর্গাবতীতে, একটি বাঁধের কিছু অংশ ৪ মিটার (১৩ ফুট) উঁচু বন্যার জলে ভেসে যায়, যার ফলে ৬০০ টি বাড়িঘর ডুবে যায়।
ঘূর্ণিঝড় বুলবুল ২০১৯ সালের ৯ নভেম্বর ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার সাগর দ্বীপ উপকূলে আঘাত হানার পর স্থলভাগ দিয়ে বাংলাদেশে আসায় ক্ষয়ক্ষতি আশঙ্কার চেয়ে কম হয়। ঝড়ে মারা যায় ২৪ জন। ৭২ হাজার ২১২ টন ফসলের ক্ষয়ক্ষতি হয়, যার আর্থিক মূল্য ২৬৩ কোটি পাঁচ লাখ টাকা। ক্ষতি হয় সুন্দরবনেরও। ২০১৯ সালের ৩ মে বঙ্গপোসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় ফণীর আঘাতে বাংলাদেশে ৯ জনের মৃত্যু হয়। তবে প্রাণহানি কম হলেও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল অনেক বেশি। সরকারি হিসাব মতে, ঘূর্ণিঝড় ফণীর কারণে ঘরবাড়ি, বাঁধ, সড়ক ও কৃষিতে ৫৩৬ কোটি ৬১ লাখ ২০ হাজার টাকার ক্ষতি হয়। ২০১৭ সালের ৩০ মে ১৪৬ কিলোমিটার বাতাসের গতিতে কক্সবাজার উপকূলে আঘাত হানে। ঘূর্ণিঝড় মোরা’র আঘাতে কক্সবাজার উপকূলের শতাধিক বাড়ি-ঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। ২০১৩ সালের ১৪ মে এটি উত্তর-পূর্বাংশের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। এতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। কার্যত জনজীবন অচল হয়ে পড়ে। ২০০৯ সালে উত্তর ভারত মহাসাগরে জন্ম নেওয়া ঘূর্ণিঝড় আইলা। ঘূর্ণিঝড়টি আঘাত হানে ২৫ মে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাংশ ও ভারতের দক্ষিণ-পূর্বাংশে।
ঘূর্ণিঝড় সিডর কেন্দ্রীয় অংশ ২০০৭ সালে ১৫ নভেম্বর সন্ধ্যা ৬টার পর বাংলাদেশের পাথরঘাটায় বালেশ্বর নদীর কাছে উপকূল অতিক্রম করে। এক রিপোর্টে বলা হয়- ঘূর্ণিঝড়ের বাংলাদেশের প্রায় ৬ লাখ টন ধান নষ্ট হয়। সুন্দরবনের পশুর নদীতে বেশকিছু হরিণের মৃতদেহ ভাসতে দেখা যায় এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ এবং বিভিন্ন প্রাণীর মৃত্যু হয়। ঝড়ের প্রভাবে প্রায় ৯ লাখ ৬৮ হাজার ঘর-বাড়ি ধ্বংস এবং ২১ হাজার হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়। এ ঝড়ে প্রায় ২ লাখ ৪২ হাজার গৃহপালিত পশু এবং হাঁস-মুরগি মারা যায়।
বেড়িবাঁধ হচ্ছে উপকূলের রক্ষাকবজ, বেড়িবাঁধ থাকলে উপকূলের মানুষ নিরাপদ থাকবে। মানুষের থাকার বাড়ি আছে, ঘরে খাবার আছে। তারা এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ। কিন্তু উপকূলীয় এসব মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নেই। প্রতিবছর বন্যা ও জলোচ্ছ্বাস গুড়িয়ে যায় তাদের স্বপ্ন। তাই টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ এখন উপকূলীয় মানুষের একমাত্র প্রাণের দাবী।

