বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং এবং আমাদের দায়িত্ব

Author

মোহাম্মদ নুর হোসেন নয়ন , Government Teachers' Training College, Rangpur

প্রকাশ: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পাঠ: ৫৩ বার

ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং এবং আমাদের দায়িত্ব
মোহাম্মদ নুর হোসেন নয়ন

বাংলাদেশ আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে। দীর্ঘ সময় ধরে ভোটাধিকার কার্যত নিষ্প্রভ হয়ে থাকার পর মানুষের মনে আবারও আশা জাগছে—এই আশা যে এবার ভোট মানে কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং সত্যিকারের অংশগ্রহণ। আপাত শান্ত পরিবেশ কখনো বিভ্রান্তিকর হতে পারে। কারণ নির্বাচন কেবল ভোটের দিন নয়; এটি একটি দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়া, যেখানে শেষ মুহূর্তের কয়েকটি সিদ্ধান্ত পুরো ফলাফলকে পাল্টে দিতে পারে। তাই এই মুহূর্তে নিশ্চিন্ত হওয়ার চেয়ে সতর্ক থাকা বেশি দায়িত্বশীল। মানুষের মনে যখন প্রত্যাশা জন্ম নেয়, তখন সেই প্রত্যাশাকে রক্ষা করাই সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব।

ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বলতে শুধুমাত্র ব্যালট বাক্সে কারচুপি বা ভোটকেন্দ্র দখলের কাজকে বোঝানো হয় না। এটি একটি ধীর, পরিকল্পিত, বহুস্তরবিশিষ্ট প্রক্রিয়া, যা ভোটের অনেক আগে থেকেই শুরু হয় এবং নির্বাচনের পর পর্যন্ত প্রভাব রাখে। মাঠ অসমান করা, প্রতিদ্বন্দ্বীকে দুর্বল করা, ভোটারদের মনে অনিশ্চয়তা ও অনীহা ঢোকানো, প্রশাসন ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে নীরব বা পক্ষপাতদুষ্ট করে তোলা—সব মিলিয়ে নির্বাচনকে ভেতর থেকে ফাঁপা করে দেয়। বাইরে থেকে নির্বাচন শান্ত ও নিয়মমাফিক মনে হলেও, প্রতিযোগিতার শর্ত যদি আগে থেকেই নিয়ন্ত্রণ করা হয়, সেটিই সবচেয়ে কার্যকর ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং।

নির্বাচন-পূর্ব রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ এই প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপ। রাজনীতি যেন স্বাভাবিকভাবে মাঠে নামতে না পারে, তার জন্য মামলা, গ্রেপ্তার, হাজিরা ও জামিনের একটি ধারাবাহিকতা তৈরি করা হয়। এটি বাইরের চোখে আইনসম্মত মনে হলেও বাস্তবে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে ক্লান্ত ও দুর্বল করে। নেতারা যখন সভা–সমাবেশের বদলে আদালতের বারান্দায় সময় কাটায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক মাঠ ফাঁকা হয়ে যায়। কোনো প্রকাশ্য নিষেধাজ্ঞা ছাড়াই এভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা সীমিত করা সম্ভব। এর ফলে ভোটারদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি পায় এবং অংশগ্রহণ কমে আসে, যা নির্বাচনকে নিয়ন্ত্রিত ও পূর্বনির্ধারিত ফলাফলের দিকে ঠেলে দেয়।

প্রশাসনের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল। অনেক সময় লিখিত নির্দেশের প্রয়োজন হয় না; একটি সাধারণ ইঙ্গিতই যথেষ্ট। কে কতটুকু করলে নিরাপদ থাকবে—এই অদৃশ্য বোঝাপড়াই প্রশাসনের আচরণ নির্ধারণ করে। যখন প্রশাসন রেফারির মতো নীরব থাকে না, বরং খেলোয়াড়ের মতো অংশগ্রহণ করে, তখন নির্বাচন আর জনগণের প্রতিযোগিতা থাকে না; এটি হয়ে যায় নিয়ন্ত্রিত ফলাফলের দিকে ধাবিত একটি প্রক্রিয়া। প্রশাসনের অচলতা বা পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ সরাসরি জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ণ করে, যা ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং-এর গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।

নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং সবচেয়ে প্রশ্নবিদ্ধও। কমিশন যদি দৃঢ়, দৃশ্যমান এবং সময়োপযোগী অবস্থান গ্রহণ করে, তবে অনিয়মের আশঙ্কা অনেকাংশে প্রশমিত হয়। কিন্তু যদি নীরবতা বজায় থাকে, সিদ্ধান্তগুলো নির্বাচন-পরবর্তী আলোচনার জন্য রাখা হয়, তবে সেই নীরবতাই ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং-এর অংশ হয়ে দাঁড়ায়। কমিশনের দায়িত্ব কেবল ভোট আয়োজন করা নয়; এটি মানুষের আস্থা রক্ষা করার দায়িত্বও বহন করে। মানুষের আস্থা ভেঙে গেলে নির্বাচন তার প্রকৃত অর্থ হারায়, আর গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে।

আধুনিক সময়ে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং-এর একটি তুলনামূলক নতুন কৌশল হলো ‘ভিকটিম কার্ড’ খেলা। এখানে ক্ষমতাবান পক্ষ নিজেদের নির্যাতিত বা ষড়যন্ত্রের শিকার হিসেবে উপস্থাপন করে, যাতে বাস্তব ক্ষমতার প্রশ্ন আড়ালে চলে যায়। রাষ্ট্রীয় সুবিধা, প্রশাসনিক প্রভাব এবং প্রচারযন্ত্র থাকা সত্ত্বেও নিজেদের ‘অসহায়’ হিসেবে তুলে ধরার মাধ্যমে সমালোচনাকে শত্রুতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এতে ক্ষমতার ব্যবহার আত্মরক্ষার ভাষায় ঢেকে যায়, আর ভোটার যুক্তির জায়গা ছেড়ে আবেগের জায়গায় সরে আসে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়াভিত্তিক ন্যারেটিভ যুদ্ধ। ভুয়া তথ্য, আংশিক সত্য, বিকৃত ভিডিও, পরিকল্পিত ট্রোলিং এবং কৃত্রিম ট্রেন্ডের মাধ্যমে জনমতকে ধীরে ধীরে একটি নির্দিষ্ট মানসিক কাঠামোর মধ্যে আটকে দেওয়া হয়। ভোটার যদি যৌক্তিক প্রশ্ন তোলার চেষ্টা করে, তাকে ষড়যন্ত্র বা রাষ্ট্রবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এতে সাধারণ ভোটার প্রশ্ন করতেই ভয় পায়, আর গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ ধীরে ধীরে ক্ষয় পায়।

এই সবকিছুর স্বাভাবিক পরিণতি হিসেবে সামনে আসে বিপজ্জনক বয়ান: “আমি ভালো, সবাই খারাপ।” এখানে একটি পক্ষ নিজেকে একমাত্র দায়িত্বশীল ও গ্রহণযোগ্য শক্তি হিসেবে তুলে ধরে, বাকি সবাইকে অযোগ্য, দুর্নীতিগ্রস্ত বা রাষ্ট্রের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে। এর ফলে নির্বাচন আর জনগণের রায় থাকে না; এটি ধীরে ধীরে একটি নৈতিক একচেটিয়াকরণের আনুষ্ঠান্যে পরিণত হয়। ভোটার তখন আর বিচারক নয়, অনুসারীতে রূপান্তরিত হয়। একই সঙ্গে পুরোনো কিছু বয়ান—“সবাই সমান খারাপ”, “ভোট দিয়ে কিছুই বদলায় না”, “স্থিতিশীলতার জন্য পরিবর্তনের দরকার নেই”—নতুন মোড়কে ফিরে আসে। এসব কথা সরাসরি কাউকে জিতিয়ে না দিলেও ভোটারদের আগ্রহ কমিয়ে দেয়, অংশগ্রহণকে সীমিত করে, আর কম অংশগ্রহণ মানেই ফলাফল নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়ে ওঠে।

আগামী ভোট একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। এখনো বড় কোনো অনিয়ম দৃশ্যমান হয়নি—এটি ইতিবাচক। তবে বাংলাদেশের ইতিহাস দেখিয়েছে, শেষ মুহূর্তের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি তৈরি হয়। তাই প্রশাসনের নিরপেক্ষতা, নির্বাচন কমিশনের দৃঢ়তা এবং নাগরিকদের সচেতন ভূমিকা নিশ্চিত করা জরুরি। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো মানুষের আশা। প্রায় ১৭ বছর পর মানুষ আবার একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রত্যাশা করছে। এই আশা কোনো দলের নয়; এটি নাগরিকের। মানুষ আর নাটক চায় না; তারা শুধু চায় নিজের ভোট নিজে দিতে এবং সেই ভোটের মূল্য নিশ্চিত হতে।

এটি অভিযোগের জন্য লেখা নয়; সতর্কতার জন্য লেখা। নির্বাচন শেষ হওয়ার পর আফসোস কোনো কাজে আসে না। গণতন্ত্র রক্ষা করতে হলে সন্দেহের আগেই স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হয়। এখনো সময় আছে—ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং যেন অভিযোগে পরিণত না হয়, তা আগেভাগেই অসম্ভব করে দেওয়া রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব। একটি সুষ্ঠু নির্বাচন শুধু সরকারের নয়; এটি রাষ্ট্রের, নাগরিকের এবং গণতন্ত্রের সম্মিলিত দায়। এই প্রত্যাশা রক্ষা করাই আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

লেখক: তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে দৈনিক খোলাকাগজ পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!