বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

গণতন্ত্র যখন জনতুষ্টিবাদের ফাঁদে

Author

মোঃ রমজান মিয়া , গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫ পাঠ: ৪৬ বার

আজকের পৃথিবীতে সর্বাধিক ঐকমত্যনির্ভর শাসনব্যবস্থার নাম গণতন্ত্র। তার কারণ, এযাবৎকালে পৃথিবীতে যত শাসনব্যবস্থা এসেছে, তন্মধ্যে গণতন্ত্রের বিশেষত্ব এই যে, এটি শাসনকার্যে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকল নাগরিকের অংশগ্রহণ ও বৈধতা নিয়ে পরিচালিত হয়। গণতন্ত্রকে বোঝাতে আব্রাহাম লিংকনের সংজ্ঞাটি উল্লেখ করা যেতে পারে যে, “গণতন্ত্র হলো জনগণের, জনগণের জন্য এবং জনগণ দ্বারা নির্বাচিত সরকারব্যবস্থা।” অর্থাৎ, সরকার জনগণের অংশগ্রহণ ও কল্যাণকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়।

 

গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় যেহেতু জনগণের ভোটের মাধ্যমে প্রতিনিধি নির্বাচন করা হয়, তাই স্বাভাবিকভাবে প্রত্যেকটা দলের প্রধান লক্ষ্য থাকে যে কোনো উপায়ে ভোটে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করা। এতে অবশ্য দোষের কিছু নেই। তবে আলাপের ক্ষেত্র হলো, কোন উপায়ে ভোটের রাজনীতি করা হচ্ছে সেটা নিয়ে। কেননা বর্তমানে ‘পপুলিজম’ তথা জনতুষ্টিবাদী রাজনীতি বিশ্বজুড়ে একটি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি এমন এক প্রকার রাজনৈতিক কৌশল যা জনগণের স্পর্শকাতর আবেগিক বিষয়াবলিকে পুঁজি করে মানুষকে প্রভাবিত করে। যা সমাজকে পরস্পরবিরোধী দুটি শিবিরে বিভক্ত করে যেখানে একদিকে ‘নিষ্কলুষ জনগণ’ এবং অন্যদিকে ‘দুর্নীতিগ্রস্ত এলিটশ্রেণী’। এমনটাই বলেছেন ‘পপুলিজম : অ্যা ভেরি শর্ট ইন্ট্রোডাকশন’ বইয়ের লেখক কাস মাডে। যা মোটাদাগে গণতন্ত্রের অন্তঃস্থল থেকে যুক্তি, সাম্য, প্রগতি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক চিন্তাকে উৎখাত করে দেয়।

জনতুষ্টিবাদের মূল অস্ত্র হলো, এটি রাষ্ট্রের জটিল ও বহুমুখী চ্যালেঞ্জকে সরলীকরণ করে, ধর্ম, সংস্কৃতি, জাতীয় চেতনাকে সামনে হাজির করে। রাষ্ট্র ও জনগণের মৌলিক সমস্যা ও সম্ভাবনাগুলোকে এড়িয়ে যায়। এটি একটি রাষ্ট্রের সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক এবং আন্তর্জাতিক সমস্যা ও সংকটের বহুমুখী বুদ্ধিভিত্তিক বিশ্লেষণের বদলে সাময়িক আবেগিক বিষয়াবলিকে পুঁজি করে সমগ্র বিষয়কে একমাত্রিক দ্বন্দ্বে নামিয়ে আনে। এর মধ্য দিয়ে এমন একটি বয়ান নির্মিত হয়, যেখানে পপুলিস্ট নেতা নিজেকে জনগণের একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থাপন করেন। তা হতে পারে অন্ধজাতীয়তাবাদ, ধর্মান্ধতা, বর্ণপ্রথা কিংবা নির্দিষ্ট মতাদর্শকে কেন্দ্র করে। ফলে সমাজে “আমরা বনাম ওরা” নামের বিভাজন সৃষ্টি হয়। আদারিং ও ট্যাগিং হয়ে ওঠে রাজনৈতিক হাতিয়ার। জনতুষ্টিবাদী নেতারা জনগণকে দ্রুত প্রভাবিত করতে বিভিন্ন ধরনের স্বল্পমেয়াদি কর্মসূচি হাতে নেয়, যেমন- সাময়িক আর্থিক প্রণোদনা, ভর্তুকি, স্বল্প সুদে ঋণদান, চাকরির প্রতিশ্রুতি ইত্যাদি। একইসঙ্গে ব্যক্তিগত ক্যারিশমা এবং রেটোরিক বক্তব্য জনগণকে দ্রুত প্রভাবিত করতে পারে। এখানে সমস্যা হচ্ছে, এসব কার্যক্রমের তাৎক্ষণিক প্রভাব থাকলেও রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি সামগ্রিক পরিকল্পনায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে না।

 

গণতন্ত্র যে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিকের সমমর্যাদার একটি সম্মিলিত রূপ, জনতুষ্টিবাদী রাজনীতি সেটি উপেক্ষা করে কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বার্থ রক্ষা এবং ইচ্ছা-অনিচ্ছার মূল্য দিয়ে থাকে। যেখানে জাতিগত, ধর্মীয়, আঞ্চলিক কিংবা রাজনৈতিক সংখ্যালঘুরা হয়ে পড়ে উপেক্ষিত, অবমূল্যায়িত ও অরক্ষিত। একটি আধুনিক উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র যেখানে বহুপাক্ষিক আলোচনা, গঠনমূলক সমালোচনা এবং অংশগ্রহণমূলক বিতর্কের আহ্বান করে।

 

জনতুষ্টিবাদ গণতন্ত্রের এই সংস্কৃতিকে কলুষিত করে একমুখী ভাষ্যে রূপান্তরিত করে। গণতন্ত্র যে বহুমত ও বহুপথের একটি সমন্বিত সংশ্লেষণ, জনতুষ্টিবাদ সেই মৌলিক আদর্শকে একরৈখিক ও সংকুচিত করে ফেলে। যেখানে ভিন্নমতের গুরুত্ব হারায়, কেবল পপুলিস্ট নেতার কথা কিংবা দলীয় আদর্শই প্রাধান্য পায়। যা সরাসরি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নীতিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

 

একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের চালিকাশক্তি হচ্ছে, তার অন্তর্ভুক্তিমূলক আইনসভা, স্বাধীন বিচারবিভাগ, নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন, স্বাধীন গণমাধ্যম, প্রভাবমুক্ত প্রশাসন, শক্তিশালী বিরোধী দল এবং সচেতন নাগরিক সমাজ। এ প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকরী ভূমিকা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ তথা সমতা রক্ষা, নাগরিক অধিকার নিশ্চিত, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে শাসনকাঠামো সুদৃঢ় করে। জনতুষ্টিবাদ রাষ্ট্রে এসব গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল ও অধীনস্থ করে তোলা হয়।

জনতুষ্টিবাদী নেতা এসব প্রতিষ্ঠানকে ক্রমাগত দুর্বল ও নিজের করায়ত্তে নিয়ে ক্ষমতার একচ্ছত্রীকরণ ও স্বেচ্ছাচারীর পথ প্রশস্ত করে। বর্তমান গণমাধ্যমের সহজলভ্যতা এবং এআই-এর যুগে বিরোধী মত দমনে মিডিয়ায় একক আধিপত্য বিস্তার এবং এআই-এর মাধ্যমে অসত্য ও অতিরঞ্জিত তথ্য, ছবি, ভিডিও প্রচার করে সহজেই জনমতকে প্রভাবিত করা যাচ্ছে। যা সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিতে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

জনতুষ্টিবাদের উত্থান খুব বেশিদিন আগের কথা নয়। ঊনিশ শতকের শেষভাগ থেকে শব্দটি জোড়ালো হচ্ছে, যা বর্তমান বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে। এটি অবশ্য নিজে কোনো পূর্ণতত্ত্ব নয়, বরং একটি সংকীর্ণ মতাদর্শ, যা অন্য কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। তাই, জনতুষ্টিবাদী হওয়ার জন্য চিরায়ত ডানপন্থি, বামপন্থি, সংরক্ষণবাদী, প্রগতিশীল, ধর্মনিরপেক্ষ কিংবা ধর্মীয় গড়ানার হওয়াটা জরুরি নয়, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী কাস মাডে এমনই যুক্তি দিয়েছেন। অঞ্চলভেদে এর রূপ ভিন্ন : ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে এটি অভিবাসনবিরোধী, বর্ণবাদ ও জাতিগত বিদ্বেষ, দক্ষিণ আমেরিকায় অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য এবং দক্ষিণ এশিয়ায় ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে গড়ে উঠছে। তবে, যে মোড়কেই গড়ে উঠুক না কেন, এটি সরাসরি প্রগতিশীল, ভারসাম্যপূর্ণ, উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সৌন্দর্যের সমূলে আঘাত করে।

 

আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, গণতন্ত্র একটি দীর্ঘমেয়াদি চলমান যাত্রা। এ যাত্রা কারো একার নয়, এটি আমাদের সবার। জনতুষ্টিবাদ এ যাত্রাকে একটি সংকীর্ণ পথে নিয়ে যেতে চায়। এ পথ থেকে ফিরতে হলে আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। বিশেষ করে, রাষ্ট্রের সংবিধান ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহকে শক্তিশালী করা, নাগরিকদের শিক্ষিত ও সচেতন হওয়া, সংখ্যালঘু, ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া, সমাজে যুক্তিনির্ভর ও দায়িত্বশীল চিন্তা-চেতনার প্রসার ঘটানো এবং রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত জনতুষ্টিবাদের আড়ম্বরপূর্ণ বুলি থেকে বেড়িয়ে এসে দীর্ঘমেয়াদি টেকসই উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের দিকে মনোযোগ দেওয়া।

 

উল্লেখ্য, আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এরই মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। নির্বাচনে জয়ী হওয়ার জন্য দলগুলোকে জনতুষ্টিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি পরিহার করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় এগিয়ে আসতে হবে, পাশাপাশি নাগরিক হিসেবে প্রত্যেককে এ বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে। তবেই, জনতুষ্টিবাদের ফাঁদ থেকে রক্ষা পেয়ে প্রকৃত গণতন্ত্রের সুফল লাভ করা যাবে।

লেখক: সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে দৈনিক খোলা কাগজ পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!