বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

টেকনাফ— অভিজাত‍্যে অভিশপ্ত

Author

মোহাম্মদ ইমরান খান , University of Dhaka

প্রকাশ: ১১ মার্চ ২০২৬ পাঠ: ২৮৪ বার

টেকনাফের কথা শুনলেই মস্তিষ্কে ভেসে ওঠে পাহাড় আর সমুদ্রের বুক চিরে চলে যাওয়া মেরিন-ড্রাইভের দৃশ্য। রাস্তার ধারে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা সুপারির বাগান। দীর্ঘ পর্বতের পদতলে বালুকাময় চর আর বঙ্গোপসাগর ও নাফ নদীর মোহনায় গড়ে ওঠা শাহপরীর দ্বীপ। সমুদ্র পেরিয়ে বিচ্ছিন্ন সেন্টমার্টিনের নীল জলরাশির বুকে প্রবালের অস্তিত্ব। লবণের সুবিস্তীর্ণ ধূসর প্রান্তর কিংবা ধান ক্ষেতের সবুজ নকশা। ভেসে ওঠে অনন্য প্রেমলীলায় গাঁথা সেই মাথিন কূপের কাহিনি; সীমান্ত ঘেঁষে বয়ে চলা নাফ নদীর কথা যা থেকে টেকনাফের নামকরণ হয়েছে

সাম্প্রদায়িক বৈচিত্রের এক অনন্য উদাহরণ টেকনাফ। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি এ জনপদে মিলিত হয়েছে। শিক্ষার প্রসারে এ অঞ্চলে বিভিন্ন মাদ্রাসা ও স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। টেকনাফের ছেলেমেয়েরা দেশের বিভিন্ন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে জ্ঞানের দ‍্যুতি ছড়াচ্ছে। পেশাগত জীবনেও তারা বিভিন্ন সেক্টরে দেশ ও জাতিকে সেবা দিয়ে যাচ্ছে।

কিন্তু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, শিক্ষা ও বৈচিত্র্যে ঐশ্বর্যপূর্ণ এ নগরী কল্পনায় যেমনটা শিল্পীর তুলীতে অঙ্কিত দৃশ্যের মত, বাস্তবে ততটা অভিশপ্তও বটে। সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় টেকনাফ নানা সমস্যার আঁতুর-ঘরে পরিণত হয়েছে। চোরাচালান, মাদক কারবারি, মানব পাচার, অপহরণ ও সীমান্ত অব‍্যস্থাপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ কিছু সমস্যার কারণে এখানে জনজীবনের স্বাভাবিক পথচলা ব‍্যাহত হচ্ছে। অরক্ষিত সীমান্ত ব‍্যবস্থাপনার ফলে মাইন বিস্ফোরণ ও মিয়ানমার থেকে ছোঁড়া গুলিতে অনেক সময় প্রাণ নাশের মত ঘটনা ঘটে। জান্তা বাহিনী কর্তৃক জেলে অপহরণের মত দৃষ্টান্তের নজিরও মিলেছে; যা সীমান্ত নিয়ে সাধারণ জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। তার ওপর রোহিঙ্গা শরণার্থীর আশ্রয়কেন্দ্র হওয়ায় টেকনাফে জনসংখ্যার চাপ সৃষ্টি হয়েছে–যার প্রভাবে বনজঙ্গল উজাড়, নিত্য প্রয়োজনীয় বাজারে চাপ ও যানজটের সমস্যা তীব্র আকার ধারণ করেছে।

দীর্ঘদিন নাফনদী বন্ধ থাকায় এবং এর পরিবর্তে যথাযোগ্য কর্মসংস্থানের ব‍্যবস্থা না হওয়ায় জেলেরা অনৈতিক উপার্জনের পথ বেছে নিচ্ছে। রোহিঙ্গারা তুলনামূলক কম মজুরিতে সহজলভ্য হওয়ায় তারা দেশীয় জনগণের প্রতিস্থাপন হয়ে পড়ছে। ফলে কাজের অভাবে মানুষ বাধ্য হয়ে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে যায়। রোহিঙ্গা সমস্যা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে ব‍্যর্থ হওয়ায় তারা জনপদে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে। অন‍্য দিকে, নৈসর্গিক সৌন্দর্যে ঘেরা পর্যটন স্পট হলেও টেকনাফ কখনো যথাযথভাবে মূল‍্যায়ন হয়নি। বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন টেকনাফে অবস্থিত হলেও অব‍্যবস্থাপনার কারণে তা দুর্ভোগে পরিণত হয়েছে। পশ্চিমে সমুদ্র ও পূর্বে নাফ নদীর মধ‍্যস্থলে সুবিস্তীর্ণ পাহাড়ের সৌন্দর্য মানুষকে মুগ্ধ করার পরিরর্তে আতঙ্ক ও ভীতি প্রসার করে। পাহাড়গুলো ডাকাতের কুড়েঘরের রূপ নিয়েছে। দর্শনার্থী তো দূরের কথা, স্থানীয় জনগণও তাদের মাতৃভূমির সৌন্দর্য যথাযথভাবে উপভোগ করতে পারেনি অপহরণের ভয়ে।

এ অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য কোন জনপ্রতিনিধি তৈরি না হওয়ায় প্রশাসনের উপর কখনো তেমন চাপ সৃষ্টি হয়নি। ফলে প্রশাসন এসব সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে প্রতিনিয়ত নির্দিষ্ট কিছু সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে আসছে। এদিকে স্থানীয় জনগণ অনিশ্চিত দিন পার করছে এবং স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে হিমশিম খাচ্ছে।

এই সমস্যাসমূহ সমাধান করতে না পারলে টেকনাফ তার সম্ভাবনা হারাবে এবং শীঘ্রই একটি অনিরাপদ জনপদে পরিণত হবে।

লেখক: সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!