রমজান মাসের ফজিলত ও করনীয়
রমজান মাসের ফজিলত ও করনীয়
ব্যবসায়ীদের যেমন ব্যবসার সিজন থাকে, যখন তাদের ব্যবসা খুব বেশী হয়, মুনাফা বেশী হয়। তদ্রূপ মু’মিনের জন্য রমযান মাস হল সাওয়াবের মৌসুম, যখন একটি নফল ইবাদতের সাওয়াব একটি ফরযের সমতুল্য হয়ে যায় এবং একটি ফরযের ছওয়াব সত্তরটি ফরযের সমান হয়ে যায়। এমনিতে নফল আর ফরযের মধ্যে কোন তুলনা হয় না। একজন মানুষ যদি এক ওয়াক্ত নামায কাযা করে তথা ওয়াক্ত মত না পড়ে, তাহলে সারা জীবন যদি সে নফল নামায পড়ে, তবুও ঐ ওয়াক্তিয়া ফরয নামাযের সমতুল্য হতে পারবে না। ফরযের মর্যাদাতো এত বেশী। তা সত্ত্বেও বলা হচ্ছে রমযান মাসে একটি নফল ইবাদত করলে একটা ফরযের সমতুল্য হয়ে যাবে। এ হিসেবে চিন্তা করলে বোঝা যায় রমযান মাসে এক একটি আমলের সাওয়াব কত গুণে বর্ধিত হয় তা হিসাব করা কঠিন। তাই রমযান হল সাওয়াব অর্জন করার সময়, রমযান হল সাওয়াব অর্জন করার মৌসুম।
ব্যবসায়ী তার ব্যবসার সিজন আসার আগে মনে মনে সম্পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে নেয় যে, সামনে সিজন আসছে, সিজনকে আমার কাজে লাগাতে হবে, অন্য কোন কাজ করা যাবে না। সিজনের সময় আমি ব্যবসা ছাড়া আর কিছু করব না। রমযানের জন্যও এরকম মানসিক প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। দুনিয়ার যত ঝামেলা আছে, রমযান আসার পূর্বেই সেসব ঝামেলা থেকে আমরা মুক্ত হয়ে যাব। অন্ততঃ এতটুকু মুক্ত হয়ে যাব যে, রমযানে রোযা রাখতে, রমযানের অন্যান্য ইবাদত যেমনঃ তারাবীহ পড়া, বিশেষ তেলাওয়াত করা ইত্যাদির জন্য যেন কোন বাঁধা না থাকে। ঝামেলাগুলি আগেই আমরা সেরে নিব, সব বাঁধাগুলি আগেই দূর করে নিব। রমযানের জন্য আগে থেকেই এরকম প্রস্তুতি নেয়ার দিকে ইংগিত করে রাসূল (সাঃ) বলেছেনঃ
“তোমরা শা’বান মাসের চাঁদ ঠিক মত গণনা করে রাখ। শা’বানের কয় দিন যাচ্ছে আর কয়দিন রমযান আসতে বাকি আছে ঠিকমত খেয়াল রাখ। রমযানের খাতিরে তোমরা এটা কর।”
এখানে বোঝানো হচ্ছে যে, সামনে রমযান আসছে, রমযান আসার আগেই যেন রমযানের জন্য তোমার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়ে যায়। কেউ যদি আগে থেকেই মনে মনে প্রস্তুতি গ্রহণ করে, তাহলে রোযার সময় আর কোন সমস্যা তার থাকবে না। মনের ইরাদা এবং মনের প্রস্তুতিই হচ্ছে বড় জিনিস। মানুষ যখন মনে মনে কোন বিষয়ের প্রস্তুতি গ্রহণ করে, তখন সে বিষয়টা যত কঠিনই হোক সে করতে পারে। মনের হিম্মত কঠিন কাজকেও সহজ করে দেয়। তাই বলা হয়:
হিম্মত বা মনের সাহস হল এসমে আযম। অর্থাৎ, এক মহা শক্তি। মানুষের মনের পাক্কা ইরাদা বা হিম্মত হল এসমে আযমের মত। কারও ইরাদা যদি মজবুত হয়ে যায়, কেউ যদি হিম্মত করে, তাহলে অনেক কঠিন কাজও সে করে ফেলতে পারে।
রমযানের রোযা রাখার ব্যাপারটাও এরকম। কেউ যদি হিম্মত করে আমি রোযা রাখবই, তাহলে সামান্য একটু গ্যাস্ট্রিকের ব্যথা, একটু স্বাস্থের দূর্বলতা, এই সব অজুহাত কোন বাঁধা হতে পারবে না। এই সমস্ত অজুহাত দিয়ে রমযানের রোযা ছেরে দেয়ার কোন অবকাশ নেই। তবে বাস্তবিকই যদি কেউ অসুস্থ্য হন এবং কোন দ্বীনদার পরহেজগার ডাক্তার তাকে রোযা না রাখার পরামর্শ দেন, তাহলে রোযা ছাড়া যাবে। তবে এরকম রোযাও পরে সুস্থ হলে কাযা করে নিতে হবে। অনেক সময় ডাক্তারদের জিজ্ঞাসা করার প্রয়োজনও হয় না, নিজের মনকে জিজ্ঞাসা করলেই মন থেকে উত্তর পাওয়া যায় যে, বাস্তবেই আমি রোযা ছাড়ার মত অসুস্থ, নাকি অসুখের কথা বলি রোযা ছাড়ার বাহানা বের করছি। রাসুল (সাঃ) অনেক ব্যাপারে বলতেনঃ “তোমার মনের কাছে ফতওয়া জিজ্ঞাসা করে দেখ”। অতএব আমি রোযা রাখতে সক্ষম না অক্ষম তা নিজের মনের কাছে জিজ্ঞাসা করলেই উত্তর পেয়ে যাব। মানুষকে অনেক কিছু বলে বোঝানো যায় যে, আমার এই এবার সেই সমস্যা, কিন্তু মনের ভিতরে চোর লুকানো আছে কিনা তা অন্য কোন মানুষ না দেখলেও আল্লাহ পাক তো দেখবেন। কেননা আল্লাহ মনের গোপন বিষয় সম্পর্কেও সম্যক অবগত। তাই কোন অহেতুক অজুহাত বের করে রোযা ছাড়লে আল্লাহর কাছে ধরা পড়তে হবে। হাদীছে এসেছেঃ রাসূল (সাঃ) বলেন:
অর্থাৎ প্রকৃত পক্ষে অসুস্থ নয়, শরীয়ত তাকে রোযা ছাড়ার অনুমতি দেয়নি, এ অবস্থায় কেউ যদি রমযানের রোযা ছাড়ে, তাহলে সারা জীবন সেই রোজা কাজা করতে থাকলেও ঐ ঘাটতি পূরণ হবে না।
এ হাদীছে অনেক কড়া কথা বলা হয়েছে- একটি রোযা কাযা করলে সারা জীবন রোযা রাখলেও সেই ক্ষতি পূরণ হবে না। তাই রোযা রাখার হিম্মত করতে হবে। হিম্মত করলে রোযা রাখা সহজ। হিম্মত না থাকলে কঠিন।
অনেকে এই হিম্মতের অভাবেই তারাবীহও পড়তে পারে না। মনে করে
বিশ রাকআত তারাবীহ পড়তে হবে; ওরে বাবারে সম্ভব নয়। এভাবে তারা হিম্মত হারিয়ে ফেলে। হিম্মত হারালে চলবে না। তারাবীহ পড়া সুন্নাতে মুআক্কাদা এবং বিশ রাকআত তারাবীহ পড়া সুন্নাতে মআক্কাদা। বিনা ওজরে শরীয়ত সম্মত কারণ ছাড়া সুন্নাতে মুআক্কাদা তরক করা গোনাহ।
বিশ রাকআত তারাবীহ পড়তে আমাদের কত কষ্ট বোধ হয়! অথচ- রাসূল (সাঃ) এবং সাহাবায়ে কেরামের অবস্থা কি ছিল? রাসূল (সাঃ) সম্পর্কে হাদীছে স্পষ্ট এসেছে। নামাযে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে রাসূল (সাঃ)-এর পা মোবারক ফুলে যেত। সাহাবায়ে কেরাম তারাবীহ-র জন্য মসজিদে বসে আছেন, রাসূল (সাঃ) হুজরা থেকে বের হচ্ছেন না, বসতে বসতে মধ্য রাত হয়ে গেছে, সাহাবায়ে কেরাম বসে আছেন, রাসূল (সাঃ) বের হবেন, তিনিই তারাবীহ পড়াবেন। এরকম বহু রাতে ঘটেছে। দেখা যায় প্রায় সারাটা রাতই তারাবীহ্ এর জন্য জাগ্রত থাকতে হয়েছে। এই ছিল সাহাবায়ে কেরামের অবস্থা। আর আমরা কত দ্রুত তারাবীহ পড়া যায়, কত অল্প সময়ে তারাবীহ শেষ করা যায় সেই চিন্তা করি।
জোবায়ের আহমেদ শুয়াইব
শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া
সহযোগ সদস্য, বাংলাদেশ তরুন কলাম লেখক ফোরাম, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা।

