নিস্পৃহতার একলা প্রহর

মাঝে মাঝে জীবন এমন এক অদ্ভুত স্টেশনে এসে থামে, যেখানে ট্রেনের শব্দ আছে কিন্তু কোনো গন্তব্যের তাড়া নেই। আমি এখন ঠিক সেই প্ল্যাটফর্মেই দাঁড়িয়ে আছি। চারপাশের চেনা মুখগুলো হঠাৎ করেই ঝাপসা হয়ে আসছে, আর আমার চোখের পাতায় এক অদৃশ্য কালিতে লেখা হয়ে গেছে “I’m not Interested”।
একটা সময় ছিল যখন মানুষকে খুশি করার এক অদ্ভুত নেশা তাড়া করে বেড়াত। কে কী ভাবল, কে কেন মুখ ফিরিয়ে নিল এসব সাত-পাঁচ ভাবনায় রাতের ঘুম হারাম হতো। এখন সেই তাড়নাগুলো কর্পূরের মতো উবে গেছে। কাউকে ইম্প্রেস করার জন্য বাড়তি কোনো শব্দ খরচ করতে এখন বড্ড অলসতা লাগে। এমনকি বুকের গহীনে যদি কারোর জন্য এক চিমটি ভালোবাসাও জমে থাকে, সেটাকে সযত্নে আড়াল করে রাখতেই এখন বেশি স্বস্তি পাই। কাউকে পাওয়ার সেই আদিম ব্যাকুলতা এখন আমার ভেতরে মৃতপ্রায়।
মুঠোফোনের স্ক্রিনে চ্যাটিংয়ের নীল আলো এখন ভীষণ অসহ্য লাগে। ঘন্টার পর ঘন্টা স্ক্রিনে আঙুল চালিয়ে কৃত্রিম আবেগের আদান-প্রদান করার মতো মানসিক শক্তি আর অবশিষ্ট নেই। কেউ ভুল বুঝলে আগে বুক ফেটে যেত, হাজারটা ব্যাখ্যা সাজাতাম নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে, সম্পর্কের সুতোটা ছিঁড়ে যাওয়ার ভয়ে কুঁকড়ে থাকতাম। অথচ এখন কেউ ভুল বুঝে দূরে চলে যেতে চাইলে আমি শুধু স্থির হয়ে তাকিয়ে দেখি। মনে মনে বলি, “যেতে দাও।” এই যে চেনা মানুষগুলো স্রোতের মতো জীবন থেকে সরে যাচ্ছে, তাদের আটকানোর মতো কোনো আকুতি বা জেদ কোনোটাই আমার ভেতর আর কাজ করে না।
আসলে এটা কোনো জেদ নয়, কিংবা কোনো অহংকারও নয়। এটা কেবলই এক ধরণের চূড়ান্ত নিস্পৃহতা। আমি এখন সেই একাকীত্বের সাথে সন্ধি করেছি, যেখানে হারানোর কোনো ভয় নেই আর পাওয়ার কোনো মিথ্যে প্রত্যাশা নেই। নিজের ভেতরের এই নিঃশব্দ শূন্যতাটুকুই এখন আমার একমাত্র আশ্রয়। জীবনের এই পর্যায়ে এসে আমি বুঝতে পেরেছি, সবাইকে ধরে রাখার চেয়ে নিজেকে শান্ত রাখাটাই এখন বেশি জরুরি…

