শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন
হোম / গল্প / নিবন্ধ

রাত ৩টা

Author

আবু ছাকিব মোঃ নাজমুল হক , ফেনী সরকারি কলেজ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৫ পাঠ: ৬৬ বার

রাত ৩টা বাজে। নির্জন কবরস্থানের মাঝে নতুন একটা কবরের পাশে কাদার মধ্যে বসে চোখের পানি ঝরাচ্ছে সাকিব। চারদিকে ঘোর অন্ধকার। সুনসান নীরবতা, আকাশে রয়েছে মেঘের গর্জন। সন্ধ্যা থেকে বৃষ্টি হয়েছিল। তবে এখন আর নেই। চাঁদের দেখাও মেলেনি আকাশ পানে।

বাড়ি থেকে দুই মিনিট দূরত্বে কবরস্থান। আজকেরই কবর এটি। কবরের পাশে একটা লাইট দেওয়া হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু বিদ্যুৎবিভ্রাটের কারণে জ্বলছে না সে লাইট।

দূর থেকে শিয়ালের কান্নার সুর শোনা যায়। যেন কোনো এক অশরীরী আত্মার আনাগোনা চারপাশে। বিদঘুটে ভয়ংকর এক রাত। তবু সাকিবের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। নতুন কবরটা ধরে সে কাঁদছে তো কাঁদছেই। সে যে হারিয়েছে আপন ধন, আপন মন, সে যে হারিয়েছে তার মায়া, সে যে হারিয়েছে বেঁচে থাকার অবলম্বন, সে হারিয়েছে তার ভালোবাসা।

হঠাৎ পেছন থেকে একটা ডাক ভেসে আসল ‘সাকিব’। কিন্তু সাকিব শুনতে পায়নি, শুনলেও তার ভ্রুক্ষেপ করার সময় নেই। আবার ভেসে আসল একই সুরের সেই ডাক ‘সাকিব’। এবার পেছন ফিরে তাকাল সাকিব। এই বিদঘুটে অন্ধকারে একটা সাদা মায়াবী মুখের অবয়ব দেখা যায়। আর দেখা যায় দুই হাতের কব্জির নিচের অংশ। আর তো কিছু দেখা যায় না। এটা কি মানুষ? সাকিবের মনে প্রশ্ন জাগে। নাকি এটি শরীরবিহীন কোনো আত্মা। আরেকটু লক্ষ করে দেখে সাকিব, এ তো নিহার মতো দেখতে। মনের ভেতর ভয় কাজ করা শুরু করল সাকিবের। নিহা তো আজ মারা গেছে। এই তার হাতের পাশেই নিহার কবর। তবে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এটি কি নিহার আত্মা? নাকি……!

আবার ডেকে উঠল সেই অবয়ব ‘সাকিব, এদিকে আসো’। ভয়ে ভয়ে এগিয়ে গেল সাকিব। না, এ তো কোনো আত্মা নয়। তার শরীর কালো বোরকা আর কালো হিজাব দিয়ে আবৃত। তাই শুধু মাথা আর হাত ছাড়া দূর থেকে কিছুই দেখা যায়নি তার। সাকিব ভাবছে- এত রাতে এই অন্ধকারে মেয়েটি কোথা থেকে এল? মেয়েটি যেন সাকিবের মনের কথা বুঝতে পারল। মেয়েটি বলল, পাশের বাজারে কিছু লোক তাকে জানিয়েছে এই রাস্তায় একটু সামনেই একটা কবরস্থান পাব। নতুন কবর হয়েছে সেখানে আজকে। তার পাশেই সাকিবদের বাড়ি। সেই সূত্র ধরেই একটা রিকশা নিয়ে এসেছে সে। কিন্তু সাকিব তাকে চিনতে পেরেও চিনতে পারে না। এখন আর ভয়ডর করছে না ঠিকই তবে মনে প্রশ্ন সে কোথা থেকে এল? মেয়েটি জানাল, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসেছে সে। সাকিবেরই খোঁজে।

সকালের সূর্য উঠার আগেই রাতের এই ঘটনাটি ছড়িয়ে গেল বাড়িতে বাড়িতে। আশপাশের বাড়ির মানুষগুলো ভিড় জমাতে শুরু করল সাকিবদের উঠানে। মুখে মুখে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল সাকিব রাতে কবরস্থান থেকে একটা পরী জুটিয়ে এনেছে। দুধে মাখা তার গায়ের রং, সিল্কি চুল, কী মিষ্টি হাসি তার! ছোট বাচ্চাদের তাদের মায়েরা সেখানে যেতে দিচ্ছে না। যদি ভয় পায় পরী দেখে। সবার মনেই আতঙ্ক। কে এই মেয়ে!

কিছুক্ষণ আগে সাকিব ঘুমিয়েছে। সাকিবের মা এবার কাতর সরে জিজ্ঞেস করল মেয়েটিকে। তুমি কে মা? সে বলল, আমি নিহা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্য বিভাগে পড়াশোনা করছি। সাকিবের সহপাঠী। সাকিবের মায়ের আর বুঝতে বাকি রইল না, কে সে!

সাকিব চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যের শিক্ষার্থী। কিন্তু ছয় মাস ধরে সে আর বিশ্ববিদ্যালয়ে যায় না।

সবসময় পড়াশোনা করতে থাকা গ্রামের সেরা ছাত্র ছিল সাকিব। স্কুল আর কলেজে যাওয়া-আসাই ছিল তার কাজ। কখনো মেয়েদের নিয়ে ভাবনার সময়টুকুও পায়নি। দেখেওনি হয়তো কোনো রূপসীর চক্ষুযুগল মন দিয়ে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু করতেই তার চোখ পড়ে নিহার দুই চোখে। কতটা মায়াবতী দুটি চোখ। গ্রামের মানুষ যে মেয়েটিকে পরী ভেবে ভুল করতে পারে তার সৌন্দর্যের বর্ণনা আর হয়তো দেওয়ার প্রয়োজন নেই। সাকিব-নিহার বন্ধুত্ব হলো। খুব ভালো বন্ধুত্ব। ডিপার্টমেন্টের অন্য সবার অনুকরণীয় বন্ধুত্ব। তবে অভাগা সাকিব কখনো জানাতে পারেনি তার ভালোবাসার কথা নিহাকে। ভয়! যদি হারিয়ে যায় তার মনের মানুষ। অধিকাংশ ছেলেমেয়ে বন্ধুত্বের মাঝেই ঘটে এমন বিষয়। বন্ধুত্ব হারানোর ভয়ে গোপন করে ভালোবাসার কথা। সাকিবও পারেনি তাই বলতে।

তবু রাখতে পারেনি তাকে। সাকিব ভাবতে পারেনি হঠাৎ তাদের বন্ধুত্বে ফাটল ধরবে। নতুন কারও আগমন ঘটবে সে কল্পনাও করতে পারেনি। নতুন মানুষ এল আর সাকিব থেকে হারিয়ে গেল নিহা। চোখের সামনে বুকের রক্তক্ষরণ কয়জনই বা সহ্য করতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাকিব বাড়ি ফিরে এল। কিন্তু আর যেতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয়ে। কারণ, মানসিক পীড়ায় সে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছে। লোকে তাকে এখন পাগল বলে। নিহাই তার মুখের একমাত্র বুলি, নিহাই তার নিত্যদিনের কল্পনা। আশপাশে কেউ মারা গেলে সাকিব ভাবে নিহা মারা গেছে, তাই সে সারা  দিন বসে থাকে কবরের পাশে আর কাঁদে। গত ছয় মাসে এমন ঘটেছে কয়েকবার। তাই কেউ মারা গেলে পরিবারের সদস্যরা তাকে ঘরে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখে।

কিন্তু গতকাল রাতে সে শিকল ছিঁড়ে ছুটে গেছে নিহার কাছে। তার কল্পিত কবরে যে নিহা শুয়ে আছে সে কীভাবে থাকে ঘরে বসে। খুব ভীতু নিহা যে তাকে ছাড়া ভয় পাবে এই গুমোট অন্ধকারে। তাই ছুটে গেছে সে সেই কবরের পাশে।

লেখক: সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী পর্ষদ।
এই লেখাটি ১৯ এপ্রিল ২০২৫ তারিখে দৈনিক খবরের কাগজ পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!