শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

প্লাস্টিক বর্জন করি, সুস্থ পরিবেশ তৈরি করি

Author

মোহাম্মাদ আশিক , রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৫ পাঠ: ২৯ বার

প্লাস্টিক বর্জন করি, সুস্থ পরিবেশ তৈরি করি

আমরা এমন এক যুগে বাস করছি যেখানে “সুবিধা” নামক শব্দটি মানব জীবনের প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে। দৈনন্দিন জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই আমরা সেই সুবিধার জন্য হাত বাড়াই প্লাস্টিকের দিকে, খাবার সংরক্ষণ, কেনাকাটার ব্যাগ, পানির বোতল, প্যাকেটজাত পণ্য, এমনকি শিশুদের খেলনাতেও। প্লাস্টিকের ব্যবহার আমাদের জীবনে অবিচ্ছেদ্য বিষয়ে পরিণত হলেও, এর ক্ষতিকর প্রভাব দিন দিন প্রকট হয়ে উঠছে। প্রতি বছর বিশ্বে কোটি কোটি টন প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপন্ন হয়, যার অধিকাংশই পুনঃচক্রিত হয় না এবং মাটি, জল ও বাতাসের মাধ্যমে পরিবেশকে দূষিত করছে। প্লাস্টিক দূষণ শুধু পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে না, বরং মানুষের স্বাস্থ্য, প্রাণিজগৎ এবং সমুদ্রের জীববৈচিত্র্যকেও হুমকির মুখে ফেলেছে। বিশেষ করে, মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি, খাদ্যশৃঙ্খল ও পানির মাধ্যমে মানুষের দেহে প্রবেশ করছে। যা দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। এই সংকটের মোকাবিলায় শুধু আইন ও নিয়ন্ত্রণই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সচেতনতা, উদ্ভাবনী প্রযুক্তি এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে সমন্বিত উদ্যোগ।বাংলাদেশে ২০০২ সালে প্লাস্টিক বা পলিথিন ব্যাগ নিষিদ্ধ করে আইন হয়। এই আইনটি পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের (১৯৯৫) অধীনে প্রণীত হয়েছিল এবং এর মাধ্যমে পলিথিন শপিং ব্যাগের উৎপাদন, বিপণন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হলেও কিছু মাত্রও ফলপ্রসূ হয় নি বরং দিন দিন বেড়েই চলছে।বর্তমান বিশ্বে প্লাস্টিক দূষণ একটি সংকটের পর্যায়ে পৌঁছেছে। আল জাজিরার ৭ আগস্ট ২০২৫-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্ব বছরে প্রায় ৪০০ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপন্ন করছে, যা পৃথিবীর মোট মানুষের ওজনেরও বেশি। কিন্তু এই বর্জ্যরে মাত্র ৯ শতাংশ পুনঃচক্রিত হচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, যদি প্লাস্টিক উৎপাদন অব্যাহত থাকে, ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ তিনগুণ বৃদ্ধি পেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক সহযোগিতা আরও জরুরি হয়ে উঠেছে। প্লাস্টিকের সুবিধা অস্বীকার করা যায় না।হালকা, সস্তা, সহজে ব্যবহারযোগ্য। কিন্তু এর এই সহজলভ্যতাই আমাদেরকে এক ভয়াবহ নির্ভরশীলতার দিকে ঠেলে দিয়েছে। বাজারে গেলে আমরা একটিবারও ভাবি না যে পলিথিন ব্যাগের বিকল্প কী হতে পারে। রেস্টুরেন্ট থেকে খাবার আনলেও প্লাস্টিকের পাত্র ছাড়া যেন আর কিছু ভাবা যায় না। এই মনস্তাত্ত্বিক নির্ভরতা আমাদের পরিবেশের জন্য এক ধ্বংসযজ্ঞের পথ খুলে দিয়েছে।একটি প্লাস্টিক ব্যাগ গড়ে ১০ থেকে ২০ মিনিট ব্যবহৃত হয়, অথচ এটি মাটিতে পচতে সময় নেয় ৪০০ থেকে ৫০০ বছর! অর্থাৎ আমরা কয়েক মিনিটের স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রেখে যাচ্ছি শতাব্দীব্যাপী বিষের স্তূপ।এছাড়াও প্রচুর পরিমানে প্লাস্টিকের বর্জ বিভিন্ন ভাবে নদী-নালা,কুপ,খাল-বিলে এমনকি কৃষি জমিতে ফেলে জমির উর্বরতা নষ্ট করছে ও পরিবেশ কে অসুস্থ করে ফেলছে।এর সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো,এই প্লাস্টিক সূক্ষ্ম আকারে (মাইক্রোপ্লাস্টিক) ভেঙে আমাদের খাবার ও পানির সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করছে। মাছ, পাখি, গবাদিপশু,কেউই এর থেকে মুক্ত নয়। বিজ্ঞানীরা ইতোমধ্যে প্রমাণ করেছেন, মানুষের শরীরেও মাইক্রোপ্লাস্টিক কণিকা পাওয়া যাচ্ছে, যা ক্যানসার, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা এবং নানা দীর্ঘমেয়াদি রোগের জন্ম দিচ্ছে। এছাড়াও প্লাস্টিকের ভিতরে থাকা জীবানু গুলো পচে, বাতাসের সাথে মিশে আমাদের শরীরে বিভিন্ন রোগ তৈরি হচ্ছে, জ্বর, মাথা ব্যাথা, পেট ব্যাথা, হাপানি,পানিবাহিতসহ বিভিন্ন মারাত্মক রোগ আমাদের সমাজে বেড়েই চলছে। প্লাস্টিকের ভয়াবহ প্রভাব শুধু পরিবেশেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি অর্থনীতিতেও বিরূপ প্রভাব ফেলছে। জলাবদ্ধতার কারণে নগর ব্যবস্থাপনায় বিপুল অর্থ ক্ষয় হচ্ছে, কৃষিজমি অনুৎপাদনশীল হয়ে পড়ছে, নদী দূষণের কারণে মৎস্যসম্পদ ধ্বংস হচ্ছে। অথচ এসব ক্ষতি মোকাবিলায় রাষ্ট্রকে ব্যয় করতে হচ্ছে কোটি কোটি টাকা। ফলে একদিকে যেমন আমরা নিজেদের পরিবেশ নষ্ট করছি, অন্যদিকে অর্থনীতিকেও ক্ষতির মুখে ঠেলে দিচ্ছি। তাই সমস্যার সমাধান একদিনে সম্ভব নয়। তবে সচেতনতার শুরু হতে হবে আজই, এখান থেকেই। প্লাস্টিক বর্জন মানে কেবল পলিথিন না নেওয়া নয়, বরং জীবনযাত্রার প্রতিটি স্তরে বিকল্প ভাবনার চর্চা করা। যেমন,
কাপড় বা জুটের ব্যাগ ব্যবহার করা,
খাবার সংরক্ষণে কাঁচ বা স্টিলের পাত্র ব্যবহার করা,
একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক পণ্য এড়িয়ে চলা,
স্কুল, অফিস, বাজার—সব জায়গায় সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো, যেখানে সেখনে প্লাস্টিকের বর্জ্য ফেলা থেকে বিরত থাকা একটা নির্দিষ্ট স্থানে ফেলা।
সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণে উৎসাহ প্রদান করা। পরিবেশ রক্ষা কোনো একক ব্যক্তির দায়িত্ব নয়,এটি এক গভীর নৈতিক অঙ্গীকার। সমাজের প্রতিটি স্তরে যদি আমরা সচেতন হই। পরিবার থেকে শুরু করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত,তাহলে পরিবর্তন সম্ভব। শিশুরা যেন ছোটবেলা থেকেই,প্লাস্টিকের ক্ষতিকর দিক গুলো সম্পর্কে বুঝতে পারে এমন শিক্ষা দেওয়া।এভাবেই আমরা মুক্তি পেতে পারি প্লাস্টিকের ক্ষতিকর ছোবল থেকে। আসুন আমরা একসাথে আমাদের পরিবেশ রক্ষা করি সুস্থ ও সুন্দর পরিবেশ তৈরি করি আমাদের প্রজন্ম কে রক্ষা করি।

 

মোহাম্মদ আশিক
শিক্ষার্থী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
ashikhasanm03@gmail.com
01766861123

 

 

লেখক: সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ১১ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে বাংলাদেশের খবর পত্রিকার লিংক; https://epaper.bangladesherkhabor.net/first-edition/2025-10-11/4 পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!