বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

ঈদকে ঘিরে কাঁচাবাজারে লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি: ভোগান্তিতে সাধারণ মানুষ

Author

শারমিন রিমা খাতুন , গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ১৮ মার্চ ২০২৬ পাঠ: ১১২ বার

কাঁচাবাজারের অস্থিরতা যেন এখন নিত্যদিনের বাস্তবতা। বছরজুড়েই কোনো না কোনো অজুহাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তে থাকে, কিন্তু ধর্মীয় উৎসবগুলোকে ঘিরে এই মূল্যবৃদ্ধি যেন আরও প্রকট হয়ে ওঠে। বিশেষ করে ঈদকে সামনে রেখে কাঁচাবাজারে যে অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধি দেখা যায়, তা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে চরমভাবে দুর্বিষহ করে তোলে। এবারও তার কোনো বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে না।

ঈদ মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব। এই সময় মানুষ স্বাভাবিকভাবেই পরিবারের জন্য একটু ভালো খাবার, অতিথি আপ্যায়ন ও আনন্দের আয়োজন করতে চায়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ঈদ যতই কাছে আসে, বাজারের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ততই বাড়তে থাকে। সবজি, মাছ, মাংস, ডিম, মসলা প্রায় সব কিছুর দাম হঠাৎ করেই বাড়তে দেখা যায়। যেমনটা এখন দেখা যাচ্ছে। চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, পেঁয়াজ, রসুন, চিনিসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম অস্বাভাবিকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা নিয়ে সরকারের কোনো মাথাব্যাথা দেখা যাচ্ছে না। এমনকি ঈদ আসার আগেই ব্রয়লার মুরগির দাম বেড়ে হয়েছে কেজি প্রতি ২২০-২৫০ টাকা, সোনালি মুরগি ৩২০-৩৫০ টাকা যা একজন দিনমজুরের একদিন এর আয় থেকেও বেশি। এ যেনো এক নিরব অত্যাচার চলছে খেটে খাওয়া মানুষদের ওপর।

অথচ বর্তমান বিশ্বের অধিকাংশ মুসলিম দেশে রমজান উপলক্ষে নিত্যপণ্যের দাম কমানো বা স্থিতিশীল রাখা হয়, যা ‘রমজান এফেক্ট’ হিসেবে পরিচিত। সৌদি আরব, কাতার ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশে সরকার ভর্তুকি, শুল্ক ছাড় ও বিশেষ ছাড়ের মাধ্যমে পণ্যের দাম কমিয়ে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখে।

ইন্দোনেশিয়া সরকার এ বছর রমজানে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে প্রায় ১৩ ট্রিলিয়ন রুপিয়া বাজেট বরাদ্দ করেছে, যার আওতায় পরিবহন খরচ কমানো এবং শুল্ক ছাড় দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, সৌদি আরব, কাতার, দুবাইসহ মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোতে রোজা এবং ঈদ উপলক্ষে পণ্যের দাম আরো হ্রাস করার বা স্থিতিশীল রাখার ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু আমাদের বাংলাদেশে দেখা যায় তার ভিন্ন চিত্র, উৎসব উপলক্ষে করা হয় যেন আরো বেশি নিরব অত্যাচার এবং নির্যাতন যা উৎসবের আনন্দকে উপভোগ করার থেকে আরও কষ্টদ্বায়ক করে তোলে বেশি।

বাজারে গেলে ক্রেতারা প্রায়ই শুনতে পান একই ধরনের অজুহাত সরবরাহ কম, পরিবহন খরচ বেড়েছে, পাইকারি বাজারে দাম বেশি ইত্যাদি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই মূল্যবৃদ্ধির প্রকৃত কারণ কী? বাস্তবে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে অসাধু ব্যবসায়ীদের মজুদদারি, সিন্ডিকেট ও বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাই মূলত এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজারে কার্যকর নজরদারির অভাব থাকলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। যখন ব্যবসায়ীরা বুঝতে পারেন যে চাহিদা বাড়ছে এবং নিয়ন্ত্রণ কম, তখন তারা ইচ্ছামতো দাম বাড়ানোর সুযোগ পেয়ে যান। ফলে সাধারণ ভোক্তাদের উপরই পড়ে এর পুরো চাপ। এই পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে ফেলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষকে। সীমিত আয়ের মানুষদের জন্য প্রতিদিনের বাজার করা এখন একপ্রকার সংগ্রামে পরিণত হয়েছে।

ঈদের মতো আনন্দের সময়েও যখন মানুষ বাজারের উচ্চমূল্য নিয়ে চিন্তিত থাকে, তখন উৎসবের আনন্দ অনেকটাই ম্লান হয়ে যায়। তাই বাজার নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আরও কার্যকর ভূমিকা অত্যন্ত জরুরি। নিয়মিত বাজার তদারকি, মজুদদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এছাড়া কৃষক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও কার্যকর করা প্রয়োজন। যাতে মধ্যস্বত্বভোগীদের অতিরিক্ত লাভের সুযোগ কমে এবং ভোক্তারা ন্যায্য দামে পণ্য কিনতে পারেন।

সবকিছু বিবেচনায় বলা যায়, ঈদকে কেন্দ্র করে কাঁচাবাজারে লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি শুধু একটি সাময়িক সমস্যা নয়, বরং এটি আমাদের বাজার ব্যবস্থাপনার গভীর দুর্বলতার প্রতিফলন। এ ধরনের পরিস্থিতি চলতে থাকলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা আরও কঠিন হয়ে উঠবে এবং উৎসবের আনন্দ ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে। তাই এখনই প্রয়োজন শক্তিশালী তদারকি, স্বচ্ছ বাজার ব্যবস্থা এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ। সরকার, ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সম্মিলিত উদ্যোগেই কেবল এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব, যাতে ঈদের আনন্দ সত্যিকার অর্থে সবার জন্য সমানভাবে উপভোগ্য হয়ে ওঠে।

 

শারমিন রিমা খাতুন

গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ (২৪-২৫)

লেখক: সদস্য, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!