“ঈদের পথে সড়ক যখন মৃত্যুর ফাঁদ”

নববধূ মারজিয়া—বুকে তার একরাশ স্বপ্ন। নতুন সংসার হবে, নতুন জীবনের সূচনা হবে ভালোবাসার মানুষটির হাত ধরে। হাতভর্তি মেহেদি, চোখভর্তি লাজুক হাসি আর অজস্র স্বপ্ন নিয়ে সে পা বাড়িয়েছিল জীবনের নতুন পথে। কিন্তু স্বপ্ন দেখা শেষ হওয়ার আগেই সেই স্বপ্নগুলো ঝরে গেল নির্মম বাস্তবতার ধাক্কায়।বাগেরহাটের রামপালের বেলাইব্রিজ এলাকায় খুলনা–মোংলা মহাসড়কে ঘটে যাওয়া এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা মুহূর্তেই কেড়ে নেয় তার জীবন। বরযাত্রীবাহী একটি মাইক্রোবাস ও নৌবাহিনীর একটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে দুমড়েমুচড়ে যায় দুই গাড়িই। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান বর–কনেসহ ১৪ জন। এর মধ্যে ১৩ জনই ছিলেন একই পরিবারের। আনন্দযাত্রা পরিণত হয় শোকযাত্রায়—একটি নতুন সংসার শুরু হওয়ার আগেই শেষ হয়ে যায়।
সোহেল—২২ বছরের এক তরুণ। হয়তো সেও স্বপ্ন দেখেছিল পরিবারের সঙ্গে ঈদ কাটানোর, প্রিয়জনদের মুখে হাসি ফোটানোর। কিন্তু রাজধানীর সদরঘাটে ঘটে যাওয়া এক লঞ্চ দুর্ঘটনা কেড়ে নেয় তার জীবন।
বিকেলের ব্যস্ত সময়ে যাত্রী তোলার সময় ‘আসা যাওয়া–৫’ লঞ্চটিকে ধাক্কা দেয় ‘এমভি জাকির সম্রাট–৩’। সংঘর্ষের তীব্রতায় পিষ্ট হন যাত্রীরা। চোখের পলকে ঘটে যায় সবকিছু। সোহেল নামের সেই তরুণ আর কোনোদিন ফিরে যাবে না তার বাড়িতে।
সুমাইয়া—একজন তরুণী, স্বপ্নে ভরা তার জীবন। বাবার সাথে বের হয়েছিল ঈদের কেনাকাটা করতে। নতুন পোশাক, নতুন আনন্দ—সবকিছু ঘিরে ছিল উৎসবের উচ্ছ্বাস। কিন্তু সেই ঈদ আর তার দেখা হলো না।
রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় একটি ট্রাকের ধাক্কায় মোটরসাইকেল থেকে পড়ে যান সুমাইয়া ও তার বাবা সাজু আক্তার সুমন। মুহূর্তেই ট্রাকের নিচে চাপা পড়ে দুজনেই প্রাণ হারান। যে বাবা মেয়েকে নিয়ে বের হয়েছিলেন ঈদের আনন্দ ভাগ করে নিতে, সেই পথই হয়ে উঠলো তাদের জীবনের শেষ যাত্রা।
মুহূর্তেই শেষ হয়ে গেল লালমনিরহাটের একটি পরিবার। ঈদযাত্রা যেন কাল হয়ে দাঁড়ালো তাদের জন্য। বাড়ি ফেরার পথে পাটগ্রামে সড়ক দুর্ঘটনায় স্বামী-স্ত্রী ও তাদের শিশু সন্তানসহ একই পরিবারের তিনজন প্রাণ হারান। একটি পরিবার, একটি আশ্রয়—সবকিছু একসাথে নিভে গেল এক নিমিষেই।
বগুড়ার শেরপুরে আরেকটি হৃদয়বিদারক ঘটনা। একই পরিবারের চারজন নিহত হয়েছেন এক সড়ক দুর্ঘটনায়। ঢাকা থেকে রংপুরে ঈদ উদ্যাপন করতে যাচ্ছিলেন তারা। পথেই ঘটে বিপর্যয়। মাইক্রোবাসটি দুর্ঘটনার কবলে পড়ে, ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান একজন, পরে মৃত্যু হয় আরও কয়েকজনের। তবে অলৌকিকভাবে বেঁচে যায় দেড় বছরের একটি শিশুকন্যা—যে হয়তো বড় হয়ে জানবে, একটি দুর্ঘটনা কিভাবে তার পুরো পরিবার কেড়ে নিয়েছে।
ঈদ মানেই আনন্দ, উচ্ছ্বাস, প্রিয়জনের কাছে ফেরার আকুলতা। সবার মনেই থাকে একরাশ সুখের স্বপ্ন—বাড়ি ফিরবে, পরিবারের সঙ্গে কাটাবে আনন্দমুখর সময়। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—স্বপ্ন কি সবার বাড়ি পৌঁছায়?
প্রতি বছর ঈদ এলেই দেশের সড়ক ও নৌপথে ঘটে অসংখ্য দুর্ঘটনা। কোনো মা হারান তার সন্তানকে, কোনো স্ত্রী হারান তার স্বামীকে, আবার কোনো পরিবার হারায় তাদের একমাত্র অবলম্বনকে। একটি দুর্ঘটনা মানে শুধু একটি মৃত্যু নয়—একটি পুরো পরিবারের ভেঙে পড়া, একটি ভবিষ্যতের সমাপ্তি।
ঈদের সময় অতিরিক্ত যাত্রীচাপ, বেপরোয়া গতি, চালকের ক্লান্তি এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি হয়ে ওঠে ভয়াবহ। অনেক চালক দীর্ঘ সময় বিশ্রাম ছাড়া গাড়ি চালান, যার ফলে মনোযোগ হারিয়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে। অন্যদিকে যাত্রীদের অসচেতনতা, অতিরিক্ত ভিড় এবং ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রাও বড় কারণ।
নৌপথেও নেই নিরাপত্তার নিশ্চয়তা। অতিরিক্ত যাত্রী বহন, অসতর্ক নৌচালনা এবং নিয়ম না মানার প্রবণতা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে এখনই প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ—
১.তাৎক্ষণিক শাস্তি নিশ্চিত করা
২.ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ করা
৩.চালকদের জন্য নির্ধারিত বিশ্রামের নিয়ম বাধ্যতামূলক করা
৪.বেপরোয়া গতি নিয়ন্ত্রণে স্পিড মনিটরিং বাড়ানো
৫.ঈদকেন্দ্রিক বিশেষ ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা জোরদার করা
৬.নৌপথে নিরাপত্তা বিধি কঠোরভাবে অনুসরণ নিশ্চিত করা
৭.সচেতনতা বৃদ্ধি—যাত্রীদের ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা পরিহার করা
৮.সিসিটিভি ও হাইওয়ে নজরদারি বাড়ানো
৯. ঘুস ও দুর্নীতির মাধ্যমে অদক্ষ কাউকে ড্রাইভিং লাইসেন্স না দেওয়া
১০.ডোপ টেস্টের মাধ্যমে ড্রাইভার নেশায় আসক্ত কিনা সেটা পরীক্ষা করা।
ঈদ আনন্দের উৎসব—কিন্তু সেই আনন্দ যেন আর কোনো পরিবারের জন্য শোকের কারণ না হয়। মারজিয়ার অসমাপ্ত স্বপ্ন, সোহেলের থেমে যাওয়া পথচলা, সুমাইয়ার না দেখা ঈদ, কিংবা একসাথে নিভে যাওয়া পুরো পরিবারগুলোর গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়—একটি দুর্ঘটনা কতটা নির্মম হতে পারে।
আমাদের সামান্য সচেতনতা, দায়িত্ববোধ আর নিয়ম মেনে চলাই পারে অসংখ্য প্রাণ বাঁচাতে। নইলে প্রতি ঈদেই এভাবেই ভেঙে যাবে হাজারো স্বপ্ন, নিভে যাবে অগণিত জীবন।
আর প্রশ্নটা বারবার ফিরে আসবে—
স্বপ্ন কি সত্যিই সবার বাড়ি পৌঁছায়?
