বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

ডিজিটাল যুগে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষায় চাই সচেতনতা

Author

মোঃ সফিউল ইসলাম , ফেনী সরকারি কলেজ,ফেনী।

প্রকাশ: ২৮ এপ্রিল ২০২৫ পাঠ: ৩৭ বার

বর্তমান বিশ্বকে যদি কোনো একটি বিশেষণ দ্বারা অভিহিত করা হয় তবে নিঃসন্দেহে ‘ডিজিটাল’ শব্দটি সেই উপমার শীর্ষে অবস্থান করবে। সভ্যতার ইতিহাসে প্রতিটি যুগের একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ছিল, যেমন কৃষি যুগ, শিল্প যুগ ইত্যাদি। আজ আমরা অবস্থান করছি এক পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল যুগে, যেখানে প্রতিটি মুহূর্তে আমাদের জীবন প্রযুক্তির অদৃশ্য ছায়ায় মোড়ানো। তথ্য আদান-প্রদান, যোগাযোগ, বিনোদন, ব্যবসা-বাণিজ্য, এমনকি আমাদের চিন্তাভাবনার ধরনও পরিবর্তিত হয়েছে এই যুগের ছোঁয়ায়। কিন্তু এই অভূতপূর্ব পরিবর্তনের মাঝে যে একটি বিষয় সবচেয়ে বড় প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছে, তা হলো ব্যক্তিগত গোপনীয়তা। আধুনিক মানুষের ব্যক্তিগত পরিসর ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে, কখনো সচেতনভাবে, কখনো বা অজান্তেই।

ডিজিটাল যুগে গোপনীয়তার সংজ্ঞাই বদলে গেছে। আগে যেখানে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা মানে ছিল নিজের চিঠিপত্র, ঘরের আড়াল বা ফোনালাপের সুরক্ষিত থাকা, এখন তা প্রসারিত হয়েছে অনলাইন ডেটা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য, ব্রাউজিং হিস্টোরি, এমনকি আমাদের ডিজিটাল ‘ছায়া’ বা ডিজিটাল আইডেন্টিটির নিরাপত্তা পর্যন্ত। প্রতিদিন আমরা ইন্টারনেটে অসংখ্য তথ্য রেখে যাচ্ছি সচেতনভাবে হোক বা অনিচ্ছাকৃতভাবে। প্রতিটি ক্লিক, প্রতিটি পোস্ট, প্রতিটি সার্চ ইতিহাস এক ধরনের তথ্য যা আমাদের সম্পর্কে ধারণা তৈরি করে। এর ফলে ব্যক্তি যেমন নিজেকে প্রকাশ করার সুযোগ পাচ্ছে, ঠিক তেমনি তার অজান্তেই তার বহু সংবেদনশীল তথ্যও সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে নানা সংস্থা, প্রতিষ্ঠান এমনকি ব্যক্তিগত পর্যায়েও।

বিশ্বের বৃহত্তম টেক জায়ান্টরা আমাদের তথ্যের বিশাল ভান্ডার হাতে পেয়েছে, যার মূল্য এখন তেল বা স্বর্ণের চেয়েও বেশি। তথ্যই আজকের বিশ্ব অর্থনীতির ইন্ধন। বিজ্ঞাপনী সংস্থা, প্রযুক্তি কোম্পানি, এমনকি রাজনৈতিক গোষ্ঠী পর্যন্ত মানুষের আচরণ বিশ্লেষণ করে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহারের কৌশল আঁটছে। আমাদের অনলাইন অভ্যাস, আমাদের আগ্রহ, আমাদের দুর্বলতা, সবই এখন বিশ্লেষণের বিষয়। আমরা কী দেখি, কী পড়ি, কী পছন্দ করি সবকিছুই আজ ট্র্যাক করা হয় বিভিন্ন সফটওয়্যার ও অ্যালগরিদমের মাধ্যমে। এ ক্ষেত্রে অনেক সময় ব্যবহারকারীদের অনুমতি ছাড়াও তথ্য সংগ্রহ করা হয়, আবার কখনো অনুমতির নামে দীর্ঘ ও জটিল শর্তাবলির আড়ালে তা চাপিয়ে দেওয়া হয়, যা অধিকাংশ মানুষ মনোযোগ দিয়ে পড়ে না।

ডিজিটাল যুগে গোপনীয়তার সংকটের আরেকটি বড় দিক হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক, টুইটারের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো আমাদের ব্যক্তিজীবনকে অনেক বেশি প্রকাশ্য করেছে। আমরা নিজেরাই অনেক সময় সচেতনভাবে ব্যক্তিগত মুহূর্তগুলো শেয়ার করি- বন্ধুত্ব, প্রেম, বিয়ে, সন্তান জন্ম, পেশাগত সাফল্য ইত্যাদি। এই প্রকাশের আনন্দ যেমন রয়েছে তেমনি রয়েছে ঝুঁকিও। একবার কোনো তথ্য অনলাইনে চলে গেলে তা পুরোপুরি মুছে ফেলা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। আমাদের অজান্তেই তা স্ক্রিনশট হয়ে ছড়িয়ে পড়ে, সংরক্ষণ হয় ডেটাবেজে বা হ্যাকারের হাতে চলে যায়। ফলে ব্যক্তি বিশেষের ব্যক্তিগত জীবন কখনো কখনো মুদ্রার অন্য পিঠের মতো তার বিরুদ্ধে অস্ত্র হয়ে দাঁড়ায়।

এ ছাড়া ডিজিটাল যুগে নজরদারির পরিমাণও বেড়েছে আশঙ্কাজনকভাবে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বিভিন্ন সরকার ন্যাশনাল সিকিউরিটির নামে নাগরিকদের ওপর নজরদারি চালাচ্ছে। উন্নত প্রযুক্তির সাহায্যে মানুষের কথোপকথন, চলাফেরা, এমনকি চিন্তাভাবনার প্রবণতাও নজরদারির আওতায় আসছে। কখনো এই নজরদারি অপরাধ দমন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে হলেও কখনো কখনো তা হয়ে উঠছে নিছক রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের হাতিয়ার। ব্যক্তি স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার ভারসাম্য রক্ষা করা একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিরাপত্তার অভাবের কারণে সাইবার অপরাধের পরিমাণও বেড়েছে মারাত্মকভাবে। পরিচয় চুরি, তথ্য চুরি, ব্ল্যাকমেইল, ফিশিং আক্রমণ ইত্যাদি এখন নিত্যদিনের ঘটনা। একটি ছোট্ট ভুল ক্লিকেই কেউ হারাতে পারে তার সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত জীবন, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, এমনকি সম্মান। অনলাইন বিশেষ নিরাপত্তাহীনতা মানুষকে ক্রমাগত এক অদৃশ্য ভয়ের মধ্যে রেখেছে, যেখান থেকে মুক্তির পথ খুঁজে পাওয়া সহজ নয়।

একই সঙ্গে প্রযুক্তির অপব্যবহার নতুন নতুন চেহারায় আবির্ভূত হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে মানুষ এখন বাস্তবের সঙ্গে প্রায় অবিচ্ছেদ্য ফেক ভিডিও বা ডিপফেক তৈরি করতে পারছে। কারও মুখ বা কণ্ঠস্বর নকল করে এমন ভিডিও তৈরি করা হচ্ছে, যা বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে, সম্মান নষ্ট করছে এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তার শেষ আশ্রয়টুকুও ভেঙে দিচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, ভবিষ্যতে সত্য ও মিথ্যার সীমানা কীভাবে নির্ধারণ করা যাবে?

ডিজিটাল গোপনীয়তা রক্ষায় আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হলেও তা অনেক সময় যথেষ্ট নয় বা প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে পারে না। ইউরোপীয় ইউনিয়নের জিডিপিআর আইন বিশ্বব্যাপী একটি মানদণ্ড তৈরি করেছে, যেখানে ব্যবহারকারীর তথ্যের অধিকার ও নিরাপত্তার ব্যাপারে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এখনও অনেক অসঙ্গতি দেখা যায়। অনেক দেশ এখনও এই বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন নয়, আবার অনেক দেশ ইচ্ছাকৃতভাবে দুর্বল আইন রেখে নাগরিকদের তথ্য নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে। এ বাস্তবতায় ব্যক্তি পর্যায়েও সচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি। ডিজিটাল নিরাপত্তা এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং ন্যূনতম আত্মরক্ষার অংশ। শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার, নির্ভরযোগ্য সফটওয়্যার ব্যবহার, নিয়মিত আপডেট, অজানা লিঙ্কে ক্লিক না করা, ব্যক্তিগত তথ্য যতটা সম্ভব সীমিতভাবে শেয়ার করা এসব প্রাথমিক সতর্কতা অবলম্বন করা একান্ত প্রয়োজন। একই সঙ্গে সন্তান ও তরুণ প্রজন্মকে সচেতন করে তোলা দরকার, যেন তারা অনলাইন জগতে নিজেদের নিরাপদ রাখতে পারে এবং প্রযুক্তির সুবিধা ভোগ করতে পারে ঝুঁকি ছাড়াই।

ডিজিটাল যুগে গোপনীয়তা রক্ষার লড়াইকে আর কখনোই একা ব্যক্তির লড়াই হিসেবে দেখা যাবে না। এটি একটি যৌথ দায়িত্ব, ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্র তিন পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া ডিজিটাল নিরাপত্তার স্বপ্ন অধরা থেকে যাবে। প্রযুক্তির বিকাশ যেমন অনিবার্য, তেমনি তার অপব্যবহারও অবশ্যম্ভাবী। এ কারণে আমাদের চেতনায় থাকতে হবে, প্রযুক্তির দাস হয়ে নয়, প্রযুক্তির সদ্ব্যবহারকারী হয়ে উঠতে হবে। গোপনীয়তা আমাদের মৌলিক অধিকার, ডিজিটাল যুগেও তা যেন অক্ষুণ্ন থাকে, এ দাবি আজ সর্বস্তরের মানুষের।

আমাদের জানতে হবে, প্রতিটি তথ্যের বিনিময়ে আমরা কী হারাচ্ছি। ফ্রি ইন্টারনেট সেবার পেছনে যে মূল্য দিতে হচ্ছে, তা অর্থের নয়, আমাদের গোপনীয়তার। সচেতন ডিজিটাল নাগরিক হওয়া এখন সময়ের দাবি, যেখানেই হোক, একটি পোস্ট দেওয়ার আগে, একটি অ্যাপ ইনস্টল করার আগে কিংবা একটি ওয়েবসাইটে প্রবেশ করার আগে চিন্তা করতে হবে, কতটুকু তথ্য আমি দিচ্ছি, কতটুকু ফেরত পাচ্ছি। গোপনীয়তার চেতনাই হতে পারে আমাদের আত্মরক্ষার প্রথম ঢাল।

ডিজিটাল যুগের সুবিধা ও সম্ভাবনা অসীম। এই যুগ আমাদের সামনে বিশাল সুযোগের দ্বার উন্মুক্ত করেছে। তবে সেই সুযোগের চাবিকাঠি হলো সঠিক ব্যবহার এবং সচেতনতা। তথ্যের এই মহাসাগরে আমাদের নিজের সত্তাকে বাঁচিয়ে রাখার লড়াই চলবে, চলতেই হবে। কারণ ভবিষ্যতের পৃথিবীতে হয়তো প্রযুক্তি হবে আরও উন্নত, কিন্তু ব্যক্তির অধিকার ও গোপনীয়তার প্রশ্নে মানবিক মূল্যবোধই হবে আমাদের শেষ আশ্রয়স্থল।

লেখক: সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ২৮ এপ্রিল ২০২৫ তারিখে সময়ের আলো পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!