ভিয়েতনাম,আফগানিস্তানের পর তেহরানে ফের ওয়াশিংটনের ব্যর্থতা

লিবিয়ার গাদ্দাফি থেকে শুরু করে মিশর, ইরাকের সাদ্দাম, সিরিয়া, ইয়েমেন সর্বত্রই যুক্তরাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদের অভিশাপ পড়েছে। এখানের রাজনীতি যতটুকু জটিল ভাবা হয়, তার থেকেও ঢের বেশি।
মনে পড়ে কি, গত বছর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্য বিনিয়োগ চুক্তির সফরে এক ভাষণে বলেছিলো, “যুক্তরাষ্ট্র এখন আর কোনো দেশের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের লক্ষ্যে পরিচালিত হবে না। বিগত প্রেসিডেন্টরা জাতি গঠনের নামে জাতি ধ্বংস করেছে”।ধারণা করা হয়েছিলও, আফগানিস্তানে পরাজয়ের পর অনেকটা ঠান্ডা মাথায় বিশ্বরাজনীতি চালাবে ট্রাম্প প্রশাসন সর্বদা নিজেকে শান্তির দূত হিসেবে উপস্থাপন করতো। কিন্তু এই স্বঘোষিত শান্তির দূত গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা করতে সম্ভাব্য সব স্থানে হামলা করে খামেনির মৃত্যু নিশ্চিত করেছে। একইসাথে স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছে, ইরানের নতুন নেতা কে হবে, তা যুক্তরাষ্ট্র ঠিক করে দেবে। নয়তো হামলা চলমান থাকবে। ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা ভেঙে নতুন সরকার বসাতে সব ধরনের হামলা চালিয়েছে ওয়াশিংটন। বাদ যায়নি স্কুলের শিশু থেকে শুরু করে অর্থনীতি ভেঙে দেবার পরিকল্পনা। তাতেও যখন জনগণকে উসকে শাসনব্যবস্থা ভাঙতে পারেনি, তখনি শুরু হয় বীভৎস সব হামলা। তেলের ডিপোতে হামলা করে তেহরানকে কালো ধোয়ায় আচ্ছাদিত করে দিয়েছে। লক্ষ লক্ষ মানুষকে দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে ফেলেছে। পানি শোধনাগার হামলা করে। কিন্তু এতসব হামলার পরেও দিব্যি টিকে আছে ইরান, সকল ধরনের হুমকির পালটা হুমকি দিয়ে যাচ্ছে ইরান। কিন্তু কীভাবে? তা বুঝতে বিগত বছরগুলোর মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির পাতা উলটাতে হবে।
গত শতক থেকেই মধ্যপ্রাচ্যে ও আফ্রিকায় নিজেদের সাম্রাজ্যবাদের সম্ভাব্য হুমকি হয়ে যে-সব দেশ আলোচনায় এসেছে, তাদের সবাইকে শুধু ধ্বংসই করেনি, সম্পূর্ণ মেরুদন্ড ভেঙে দিয়েছে হোয়াইট হাউস। গত শতকের তেল রাজনীতির মঞ্চে নিজেকে প্রভু রূপে আদিষ্ট করতে সৌদি, কাতার, বাহরাইন, কুয়েতের মতো দেশের মনে অনিরাপত্তার মন্ত্র দিয়ে পেট্রো-ডলার চুক্তি থেকে শুরু করে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের ঘাঁটি তৈরি করেছে, আর এসব সামরিক ঘাঁটিতে সৌদি, বাহরাইন, কাতার, কুয়েত নিজেদের অর্থ ঢালতো।
১৯৪৭ এ ইসরাইল প্রতিষ্ঠা, তখন বিশ্বে সমাজতন্ত্র আর গণতন্ত্রের অস্তিত্বের লড়াইয়ে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েতের আশা ছিলও ইসরায়েল তাদের সমাজতন্ত্রকে গ্রহণ করবে। তাই বেশি না ভেবেই একপ্রকার স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দিয়ে দিলো ইসরাইলকে, কিন্তু ইসরায়েল যে রাজনীতির শিল্পী! বেছে নিলো যুক্তরাষ্ট্র ও তার মতবাদ। মন্দ নয় যে, সোনার হরিণ বটে।
লিবিয়ার গাদ্দাফি থেকে শুরু করে মিশর, ইরাকের সাদ্দাম, সিরিয়া, ইয়েমেন সর্বত্রই যুক্তরাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদের অভিশাপ পড়েছে। এখানের রাজনীতি যতটুকু জটিল ভাবা হয়, তার থেকেও ঢের বেশি। ১৯৪৭ এ ইসরাইল প্রতিষ্ঠা, তখন বিশ্বে সমাজতন্ত্র আর গণতন্ত্রের অস্তিত্বের লড়াইয়ে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েতের আশা ছিলও ইসরায়েল তাদের সমাজতন্ত্রকে গ্রহণ করবে। তাই বেশি না ভেবেই একপ্রকার স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দিয়ে দিলো ইসরাইলকে, কিন্তু ইসরায়েল যে রাজনীতির শিল্পী! বেছে নিলো যুক্তরাষ্ট্র ও তার মতবাদ। মন্দ নয় যে, সোনার হরিণ বটে। ইসরায়েলকে সব ধরনের সুবিধা দেওয়া শুরু করলো ওয়াশিংটন। মধ্যপ্রাচ্যে যে কিনা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করবে। সুদূর আমেরিকা মহাদেশে বসেও এক এক করে মধ্যপাচ্যের সিরিয়া, লিবিয়া ও মিশরকে গুড়িয়ে দিলো। গত শতকে মিশর আধুনিক মিসাইল ও বিমান বাহিনীর জন্য অনেক প্রকল্পের কাজ শুরু করলেও ইসরায়েলের হামলা সেসব প্রকল্প ব্যর্থ হয়েছে। এমনকি সিরিয়ার পরমাণু প্রকল্পও। একি সাথে ইরাকের ভয় ও ইরানের মতাদর্শ প্রচারের ভয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রের হুমকির বিপরীতে সেখানে রাজতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে এবং কে কতটুকু ক্ষমতার অধিকারী হবে রাজপরিবারে, তার স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।
ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের মূল লক্ষ্যে পার্থক্য থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের প্রভাব বৃদ্ধি করে নিজেদের শাসনে রাখতে হবে, এই লক্ষ্যে উভয় এক। ওয়াশিংটনের সহযোগিতায় একে একে সিরিয়া, মিশির, ইরাকের হুমকি রুখে দিলেও বারবার ব্যর্থ হয়েছে ইরানকে শান্ত করে দিতে। দুই দশক ধরে ব্যর্থ প্রেমিকের মতো হোয়াইট হাউসকে তেল আবিব নিজেদের পাশে পায়নি ইরানে হামলা করতে। আর যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা ছাড়া ইরানের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ভেদ করে হামলা করা তেল আবিবের পক্ষে অসম্ভব।
কিন্তু রাজনীতির চিত্র পালটে যায় ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে যখন সিরিয়ায় ইরানের মদদপুষ্ট আসাদের পতন হয়। অনেকটা স্বস্তি বোধ করেন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো। পরবর্তীতে ইরানের সাথে পূর্বের সংঘাতের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার ঘোষণা দেয় রিয়াদ। ব্যর্থ হয় নেতানিয়াহুর সেই পরিচিত প্রবাদ – আমার শত্রুর শত্রু আমার বন্ধু। এখন ইরান প্রকাশ্যে কেবল ইসরায়েলের জন্যই হুমকি।
সময়ের সাথে সাথে ইরানের হুমকি দিন দিন ইসরায়েলের কাছে তীব্রতর হয়ে উঠে। শুধু কি ইসরায়েলের কাছেই? সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, জর্ডান সবার কাছেই ইরান এক নতুন হুমকি হিসেবে চিহ্নিত হয়। ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করে ফেললে ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের আচরণ সম্পূর্ণ পরিবর্তন হয়ে যাবে। হুমকি, হামলার রাজনীতির পরিবর্তে এই অঞ্চলে ইরানের সাথে সমঝোতার রাজনীতির পথে হাঁটবে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু এটা যেমন ইসরায়েলের অস্তিত্বের হুমকি, তেমনি সৌদি আরব, বাহরাইন, কাতার, কুয়েত, জর্ডান তাদের জন্যও হুমকি। কিন্তু রাজনীতির চিত্র পালটে যায় ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে যখন সিরিয়ায় ইরানের মদদপুষ্ট আসাদের পতন হয়। অনেকটা স্বস্তি বোধ করেন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো। পরবর্তীতে ইরানের সাথে পূর্বের সংঘাতের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার ঘোষণা দেয় রিয়াদ। ব্যর্থ হয় নেতানিয়াহুর সেই পরিচিত প্রবাদ – আমার শত্রুর শত্রু আমার বন্ধু। এখন ইরান প্রকাশ্যে কেবল ইসরায়েলের জন্যই হুমকি।
অবশেষে ওয়াশিংটনকে পাশে নিয়েই ইরানে হামলা করে বসে ইসরায়েল। আর তা যে আগে থেকেই বিস্তর পরিকল্পনায় করেছে তা প্রথমদিনের হামলা ইরানের সর্বোচ্চ নেতা খামেনিকে হত্যার সফলতায় বুঝা যায়। ওয়াশিংটনের ধারণা ছিলও ভিন্ন, খামেনিকে হত্যা করে এই যুদ্ধের ভার আরবদের বুঝিয়ে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র বিক্রি করবে এবং খামেনির মৃত্যুর ফলে পূর্বের ইরাক, মিশর, লিবিয়ার মতো ইরানের শাসনব্যবস্থারও পতন হবে। ইরানের সাথে রিয়াদ সমমনার দেশ-কাতার, কুয়েত-এদের পূর্বের সংঘাতের দিকে তাকালে দেখা যায়, তেহরানের প্রক্সি বাহিনী হিজবুল্লাহ, হুতি ও আসাদের সাথে রিয়াদের সংঘাত যেখানে মাখন খেতো যুক্তরাষ্ট্র। সরাসরি ইরানের সাথে সংঘাত না করে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রি করতো আরবদের কাছে। কিন্তু এবার যেন পালটে গেলো সেই চিত্র। স্পষ্টই নিজেদের স্বার্থ ছাড়াই কেবল ইসরায়েলের স্বার্থে হামলা করে তেহরানে। যুদ্ধে চলে যায় হোয়াইট হাউসের ইচ্ছার বাহিরে। তবে হোয়াইট হাউসের কাছে বড়ো ধাক্কা আসে, যখন সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যু নিশ্চিত করার পরও ইরানের শাসনব্যবস্থার পতন হয়নি এবং আরবদেশে হামলা করার পরও সৌদি, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন যুদ্ধে নিজেদের যুক্ত করেনি। তেহরানও সাফ জানিয়ে দেয়, আরবদেশে হামলার কোনো উদ্দেশ্য নেই তেহরানের, কেবল মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে তারা হামলা করছে। প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষার কারণে ইরানে স্থল অভিযান সম্ভব না। ফলে রণতরি, বিমান ও মিসাইল হামলা ছাড়া সম্ভব না ইরানে হামলা করা। যুদ্ধে হোয়াইট হাউসের ব্যর্থতা চরমে পৌঁছায়, যখন দিল্লিকে রুশ তেল কেনার অনুমতি দেয় এবং সেইসাথে মস্কোর উপর থেকে তেল রপ্তানির নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে বাধ্য হয় ওয়াশিংটন। কারণ একটাই, ইরানে হামলার জেরে তেহরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১২০ ডলারে পৌঁছায়। তেল বাণিজ্যের ধমনি হরমুজ তেহরান বন্ধ করে দিলে ওয়াশিংটন এই প্রণালি ব্যবহারে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয় । এছাড়াও হরমুজ প্রণালি ব্যবহারে ইরানকে টেক্স দেয়া লাগবে এবং তা চীনা ইউয়ানে । তেল সংকটে ইতোমধ্যে বিশ্ব ভুগতে শুরু করেছে । এতো দীর্ঘস্থায়ি যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র যাবে তা হোয়াইট হাউজের কল্পনায় ছিলও না ।
ইরানের টিকে থাকার প্রথম কারণ জাতিগত মেরুদন্ড। প্রাচীন পারস্য সাম্রাজ্যের সন্তান ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের দাসত্ব মেনে নেবে না তারা। এছাড়াও গত শতাব্দী থেকে কীভাবে আরবদের মেরুদন্ড ভেঙে দিয়েছে তার সবই প্রত্যক্ষ করেছে ইরানের জনগণ। সামরিক ক্ষেত্রেও ওয়াশিংটনের যুদ্ধের কৌশল ও ভেঙে পরা রাষ্ট্রের দুর্বলতা বিশ্লেষণ করে নিজেদের সামরিক প্রতিরক্ষা সাজিয়েছে তেহরান। আইআরজিসির তৈরি “মোজাইক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা” । ফলে সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যু হলেও আঞ্চলিক ইউনিট ও প্রতিরক্ষা ইউনিট নিজেদের নেতৃত্বে যুদ্ধ চালিয়ে যায়।
বিগত ১৬ দিনের হামলায় সর্বোচ্চ নেতা খামেনিকে হত্যা ছাড়া আর সফলতা পায়নি হোয়াইট হাউস, বিপরীতে ব্যর্থতার ঝুড়ি ভারী হচ্ছে ওয়াশিংটনের। হতে পারে ভিয়েতনাম, আফগানিস্তানের পর তৃতীয় কোনো লজ্জাজনক পরাজয়!

