শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

বেকারত্বের সমস্যা ও সমসাময়িক বাস্তবতা।

Author

মোছাঃ আহসানা হাবিবা অরনা , ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬ পাঠ: ৫ বার

বর্তমান সময়ে বেকারত্ব সমস্যা আমাদের দেশের অনেক বড় একটি সমস্যা। প্রতিবছর এদেশের বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়, ইন্জিনিয়ারিং কলেজ, মেডিকেল কলেজ থেকে কয়েক লক্ষ শিক্ষার্থী শিক্ষাজীবনের ইতি টেনে এদেশের শ্রম বাজারে প্রবেশ করে। কিন্তু এদেশের বাস্তবতা ভিন্ন, চাকরি পাওয়া আর সোনার হরিণ পাওয়া এদেশের সমাজ বাস্তবতায় একই কথা। প্রতিবছর যেই পরিমান শিক্ষার্থী পাশ করে বের হয় তার তুলনায় চাকরির বাজার সীমিত। বিবিএস এর সর্বশেষ ত্রৈমাসিক শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশে বেকারত্বের হার পূর্বের তুলনায় যথেষ্ট বেড়েছে। এই জরিপ থেকে স্পষ্ট দেখা যায় পূর্বের অর্থবছরে যেখানে বেকারত্ব হার ছিল ৩.৯৫%, সেখানে ২০২৪-২৫ অর্থ বছরের শেষ দিকে এই হার বেড়ে ৪.৬৩% এ এসে দাঁড়ায়। অর্থাৎ সংখ্যাই হিসাব করলে দেশের শ্রমবাজারে বেকারের সংখ্যা একবছরেই বেড়েছে প্রায় চার লাখ। যা একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য সত্যিই উদ্বেগের বিষয়।

‎হতাশার বিষয় দেশের এই ক্রমবর্ধমান বেকারদের তালিকার একটা বড় অংশ জুড়ে রয়েছে এদেশে শিক্ষিত যুব সমাজের এক বিরাট অংশ। আর এর মূল কারণ এদেশে শিক্ষাব্যবস্থা ও সমসাময়িক বাস্তবতা। বিশ্ব যখন প্রায়োগিক বিষয়গুলোর প্রতি বেশি জোর দিয়ে বিশাল এক প্রযুক্তি বিপ্লবের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে তখন সেই একই সময়ে দাঁড়িয়ে এদেশের শিক্ষাব্যবস্থা এখনো তাত্ত্বিক বিষয় নির্ভর। যদিও কিছু ক্ষেত্রে সরকার কারিগরি শিক্ষা ও প্রযুক্তিগত শিক্ষার প্রচার ও প্রসারের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল। কিন্তু এর বেশিরভাগই অব্যবস্থাপনা ও প্রশিক্ষণ জনিত দূর্বলতার কারণে ফলপ্রসূ হতে পারেনি। আর মূলত এই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও চাকরির বাজারের ভিন্ন বাস্তবতার কারণেই শ্রমবাজারে  তৈরি হয় ব্যাপক প্রতিযোগিতা। অনেক সময় দেখা যায় ভালো সিজি ও যথাযথ যোগ্যতা থাকলেও সল্প সিটের কারণে ভালো একটা চাকরি থেকে অনেকেই বঞ্চিত হয়। ফলে তৈরি হয় হতাশা, যা অনেক সময় আত্মহত্যা পর্যন্ত রূপ নেয়।

‎মূলত শিক্ষিত হওয়ার পরও বেকার জীবন, সামাজিক অবজ্ঞা, অবহেলা ও নানাবিধ জটিলতা তাদেরকে অনেক সময়ই ভুল পথে যেতে বাধ্য করে। উইকিপিডিয়ার একটি প্রতিবেদনে দেখা গিয়েছে- এদেশে প্রতিবছর গড়ে ৩০০ থেকে ৫০০ এর অধিক শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করে। যাদের অনেকেই ক্যারিয়ার নিয়ে ছিল দুশ্চিন্তার শিকার ও হতাশাগ্ৰস্থ। আর এভাবেই ঝরে যায় এদেশের বহু তরুণ মেধাবী প্রাণ। যাদেরকে সঠিকভাবে ব্যবহার করলে হয়তো দেশের উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখা যেতো।

‎তাছাড়া দূর্নীতির কষাঘাতে জর্জরিত এই দেশে ঘুষ ও স্বজনপ্রীতির ফলে দেশের শ্রম বাজারে যে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে তা সত্যিই আশঙ্কাজনক। চাকরির বাজারে একে তো প্রচুর প্রতিযোগিতা তার উপর স্বজনপ্রীতির রমরমা কালচার এই সবকিছুতে জর্জরিত হয়ে তরুণ প্রজন্ম শুধু যে হতাশার কিংবা আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় তা নয় অনেক সময় জরিয়ে পরে অপরাধের কালো জগতে। যা দেশ ও জাতি কারো জন্যেই শুভ কিছু বয়ে আনে না। এজন্য এই পরিস্থিতিতে বেকারত্ব সমস্যার অন্যতম সমাধান হতে পারে এদেশে উদ্যোগতা বিনির্মাণ ও শিল্প-বানিজ্যের বিস্তারের দিকে নজর দেওয়া। দেশের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করলে দেখা যায় দেশে শিক্ষিত তরুণ সমাজ অনুপাতে চাকরির বাজার অনেক কম। ফলে চাকরির বাজারে বেড়েছে ব্যাপক প্রতিযোগিতা। চাহিদা অনুপাতে নতুন করে উদ্যোগতা বিনির্মাণ না হওয়ার ফলে দেশের জাতীয় আয় ও দেশের সার্বিক উন্নয়নে বেশ বড়সড় প্রভাব পড়ছে। এজন্য দেশের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় ক্ষুদ্র, মাঝারি এবং বড় ধরনের ব্যবসা বাণিজ্য ও শিল্পের প্রচার-প্রসার ঘটানো জরুরি। এখানে স্বস্তির বিষয় এদেশে শিল্প-বানিজ্যের অবস্থা বর্তমানে বেশ উর্ধ্বমুখী ও সম্ভাবনাময়। তবে এখানো এই সেক্টরে পলিসিগত ও বৈদেশিক বাণিজ্যে শুল্ক ও রপ্তানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে বেশকিছু সংকট রয়ে গিয়েছে।

‎বিশেষ করে দেশীয় অর্থনীতিতে কর্পোরেট বানিজ্যে শুল্কের হার অনেক বেশি হওয়ায় ছোট ও মাঝারি মানের বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো বেশ হুমকির মুখে পড়েছে। এখানে একটি বিষয় উল্লেখ্য কর্পোরেট কর বাংলাদেশে সরকারের অন্যতম করের উৎস। তবে কর এর হার বেশি হওয়ায় অনেক বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠানই বিভিন্ন অসৎ উপায়ে কর ফাঁকি দেয়। এর ফলে দেশের সামগ্রিক রাজস্ব যেমন কমে পাশাপাশি অর্থনৈতিক বৈষম্য বৃদ্ধি পায় চরমভাবে। সেক্ষেত্রে কর কিছুটা কমিয়ে এনে, সকল ধরনের প্রতিষ্ঠান থেকে যথাযথভাবে ও যুগোপযোগী উপায়ে নৈতিকভাবে কর আদায় করলে এই সংকট অনেকটাই লাঘব করা সম্ভব। কম কর আরোপ করেও যদি করদাতা বাড়নো যায়  তবে একদিক দিয়ে যেমন জিডিপি ও জিএনপি বাড়বে অন্যদিকে মাঝারি বা ছোট বানিজ্যেক প্রতিষ্ঠানগুলোও বাজারে টিকে থাকবে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি দেশের অবকাঠামো উন্নয়নও ত্বরান্বিত হবে এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় বাড়বে।

‎পাশাপাশি উদ্যোক্তা বিনির্মাণের দিকেও সরকারের উচিত যথেষ্ট নজর দেওয়া। সেক্ষেত্রে সরকারিভাবে যুবকদেরকে বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে। বিশেষ করে এই সুযোগে যুবকদেরকে যথোপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও উৎসাহ দিয়ে কৃষি ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন সম্ভব। তাছাড়া হস্তশিল্প ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধি করার মাধ্যমেও নতুন উদ্যোক্তা বিনির্মাণ সম্ভব। বর্তমান সময়ে প্রযুক্তির ব্যাপক উৎকর্ষের ফলে দেশীয় বাজারে যেমন নৃত্য নতুন সম্ভাবনার তৈরি হয়েছে সেই সাথে আন্তর্জাতিক বাজারেও ব্যবসা বাণিজ্যের সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে অনলাইন মার্কেটিং ও অনলাইন বিজনেস বর্তমানে ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। পাশাপাশি কিছু দেশের সাথে ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থা ও এজেন্সী সুবিধা ভালো হওয়ায় বৈদেশিক বাণিজ্যের সম্ভাবনাও বেড়েছে। তবে বর্তমানে বিভিন্ন দেশে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে অনেক দেশে বানিজ্যের পথ কিছুটা সংক্রিন হয়েছে। তারপরও যতটুকু সম্ভবনা উন্মুক্ত তা সফল উদ্যোক্তা বিনির্মাণের জন্য যথেষ্ট।

‎কিন্তু বর্তমান সমাজের বাস্তবতা অনুযায়ী একজন তরুণের উদ্যোক্তা হওয়ার পথে প্রথম বাধা আর্থিক সংকটাপন্ন অবস্থা। এদেশের বেশিরভাগ মানুষ মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত। ফলে যথেষ্ট পরিমাণে মূলধন নিয়ে ব্যবসা শুরু করা এদেশের তরুণদের কাছে স্বপ্নের মতো। তাছাড়া এই স্বপ্নের পথে আরো বড় বাধা এদেশের ব্যাংক ব্যবস্থাপনা। অধিকাংশ ব্যাংক যে পলিসিতে উদ্যোক্তাদের লোন দেয় তা অনেক সময়ই উদ্যোক্তাদের অনুকূলে থাকে না। এজন্য উদ্যোক্তা তৈরির পথ সুগম করতে তরুণদেরকে অল্প সুদে, অল্প শর্ত আরোপে লোন প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে।

‎মূলত সরকারকে এখন এদেশের বেকারত্ব সমস্যা ও অর্থ সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটাতে গেলে বহুমাত্রিক প্রদক্ষেপ নিতে হবে। বিশেষ করে শিক্ষা ব্যবস্থার পরিপূর্ণ অবকাঠামোর যুগ উপযোগীকরণ জরুরী। পাশাপাশি এদেশের শিল্প ও বানিজ্যিক খাত গুলোতে আধুনিকায়ন ও নীতিগত পরিবর্তন দরকার। তবেই দেশ বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্ত হবে।

‎এসব প্রদক্ষেপ যে শুধু বেকারত্ব সমস্যার সমাধান করবে তা নয় বরং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও বড় প্রভাব ফেলবে। তাছাড়া এই সুযোগে শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো গেলে ভবিষ্যতে একটি অত্যাধুনিক ভবিষ্যত প্রজন্ম তৈরির পথ সুগম হবে। এজন্য বেকারত্ব সমস্যার সমাধান ও এদেশের সমসাময়িক পরিস্থিতির মোকাবেলার জন্য সরকারকে পূর্ণ উদ্যমে এদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং শিল্প-বানিজ্যের বিস্তারের দিকে বিশেষ নজর দেওয়া উচিত। পাশাপাশি কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করতে সরকারি ও বেসরকারি খাত সমূহের সমন্বয় জরুরি। সর্বোপরি কোটা বা দলীয় পরিচয় কিংবা স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে নয় নিয়োগে যোগ্যতা হোক প্রার্থীর আসল পরিচয়।

লেখক: দপ্তর সম্পাদক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!