বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন
হোম / গল্প / নিবন্ধ

গল্প: লাল পিরান

Author

মারজিয়া তাবাসসুম , ইডেন মহিলা কলেজ

প্রকাশ: ৯ মার্চ ২০২৬ পাঠ: ৩৪ বার

গল্প: লাল পিরান

“আব্বা লাল পিরান আইজ দোকানে পাওনাই? আমার কি তাইলি ঈদের দিন লাল পিরান পড়া হইব না!

ছলছল চোখে গফুর মিয়ার হাত নেড়ে নেড়ে বলছে বারো বছরের সবুজ। ”

গফুরের একলা সংসার। বউ আর একটা মাত্র ছেলে সবুজ রে নিয়ে তার দুনিয়া। বাপ মা মরছে কোন কালে। বড় মাইয়া রুজিনাটাও মারা গেছে গত বছরের বন্যায়। কত কাল যে ভাঙ্গা গড়ার লড়াইয়ে নামছে গফুরের মতো শত শত পরিবার। গফুর মিয়ার মেয়ে রুজিনা মরার পর থাইকা সংসারে আকাল ধরেছে। যা-ই গড়ে তাতেই ধস নামে।

এক বছর হয় বউ বাচ্চা নিয়ে ঢাকায় কমলাপুর রেলস্টেশনের পাশে ফুটপাতে টিনের ছাউনি দিয়া তাবুর মতো ছোট্ট ঘরে ওরা বাস করছে। জীবনের কি নিদারুণ বাস্তবতা জন্ম থেকে এই অব্দি দেখতে পাইতাছে গফুর মিয়া। স্বচ্ছল পরিবারে জন্ম হইয়াও নদী ভাঙ্গনে সব হারিয়েছে। আত্মীয় স্বজনরা কেউ নাই বললেই চলে।

গফুর মিয়ার এখন রুটি রুজির এক মাত্র মাধ্যম হলো জুতা সেলাই করা। তা দিয়ে টেনেটুনে কোনোমতে সংসার চললেও চলে না সবুজের পড়ালেখার খরচ। তাই সবুজ স্কুলেও যাইতে পারেনা। অথচ সবুজের কত ইচ্ছা পড়ালেখা করার। এইদিকে গফুরের বউ আবার প্যারালাইজড হইয়া হাটতে পারেনা। শুয়ে বসে কাটায় দিন। তবুও পেটের ক্ষুধা নিবারণ এর জন্য কোনোমতে ছেছড়াইয়া ছেছড়াইয়া ক’টা সিদ্ধ করে আগুনে পানি ঢালে!

ফুটপাতের এই সংসারেও রমজান মাস আসে। বহু কষ্টে ইফতার আর সেহরির মাধ্যমে রবের আদেশ মান্য করে চলছে গফুর মিয়ার পরিবার। আজ রোজার শেষ ইফতার। সবুজ প্রথম রোজা থেকে বায়না ধরে আছে তাকে এইবার একটা লাল পিরান কিনে দিতে হবে। গফুর মিয়াও কথা দিয়েছিলো একটা লাল পিরান আনবে। বউয়ের লাগি একটা নতুন শাড়ি আর নিজের লাগি লুঙ্গি।

সারাদিন সবুজ বাজানের পথের দিকে তাকিয়ে থাকে। মায়ের সাথে ক’টা শুকনো মুড়ি দিয়ে ইফতার করে। বাজানের লাগি তার সে কি অপেক্ষা। রাত বাড়তে থাকে। বাজান আসেনা তার। অন্যদিন যে সময় ফিরতো সেই সময় পার হয়ে যায়, চাঁদ রাতে আশেপাশের বাচ্চারা আনন্দ করে কিন্তু সবুজের লাল পিরান হাতে না নেওয়া অব্দি তার যেনো ঈদ আনন্দ আসবেইনা।

রাত একটার দিকে বাজান আসে। সবুজ ঘুমায়না। বাজানের পদশব্দে ভাঙ্গা দরজা আলগা করে খুলে দেয় সে, বাজান ঘরে ডুকতেই হাতের দিকে তাকিয়ে চোখ তার বিস্ফোরিত হয়ে যায়। বাজানের হাত খালি। কাঁধ ও খালি। যেখানে সব সময় জুতা সেলাই এর বাক্সোটা থাকতো।
এতক্ষণে বাজানের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখে, মুখ তার মলিন, ছুপছুপ রক্তে লাল হয়ে আছে তার মুখ, থুতনি আর দাড়ি। সবুজের মা কোনোমতে উঠে বসে। বলে, কি হইছে তোমার? এই রে কথা কউনা কেন রুজিনার বাপ। বাক্স কই? আরে এমনে দুইন্দদাইল্লা মার্কার মতো থাকলে বুঝমু কেমনে। কউ না কি হইছে।

এতক্ষণে স্তম্ভিত ফিরে আসে গফুর মিয়ার। দরদর করে চোখ দিয়ে বন্যা নামে। গফুর মিয়া কয়,খোদা আমগোরে চিরকাল গরিব রাখবার চায় মোমেনা। ওরা আইজ চাঁদা দিতে না করায় ইফতারের সময় আমার মুখ থাইকা ইফতার কাইড়া নিছে। ওরা আমার বাক্স লুট কইরা লইয়া গেছে। ঈদের বাজার সদাই করমু সব লইয়া গেলো।

সবুজ নিস্তব্ধ হয়ে যায়। সে লাল পিরানের কথা ভুলে যায়। সে ভাবে কারা এমন করলো তার বাজানের সাথে। ভেবে পায়না সে। বাজান আর মায়ের কথা তার কানে পৌছায় না। যেনো বধির হয়ে গেছে তার দুটি কান।

 

লেখক: প্রচার সম্পাদক, ইডেন মহিলা কলেজ।
লিংক কপি হয়েছে!