শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

তারেক রহমানের চোখে নিরাপদ বাংলাদেশ প্রত্যয়, পরিকল্পনা ও রাষ্ট্রচিন্তার নয়া পাঠ

Author

মো দিদার আলী সরকার , চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫ পাঠ: ২৬ বার

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নিরাপত্তা শব্দটি বহুবার উচ্চারিত হয়েছে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটি সীমাবদ্ধ থেকেছে ক্ষমতা রক্ষা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শক্তি প্রদর্শন কিংবা ভিন্নমত দমনের যুক্তিতে। একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার রাজনৈতিক দর্শন, নেতৃত্বের দৃষ্টিভঙ্গি এবং জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্কের ভিত্তিতে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে নিরাপদ বাংলাদেশ একটি বহুল আলোচিত ধারণা। সাম্প্রতিক এক জনসভায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এ ধারণাকে সামনে রেখে জাতির উদ্দেশে একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা দেন। মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি বিশ্বখ্যাত মানবাধিকার নেতা মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের  আদলে উচ্চারণ করেন- I have a plan. For the people of my country, for my country, এই উক্তির মধ্য দিয়ে তিনি শুধু আবেগ নয়, বরং একটি রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও ভবিষ্যৎ রূপরেখা তুলে ধরার চেষ্টা করেন। এটি শুধু ক্ষমতার পালাবদলের হুঙ্কার নয়, বরং একটি রাষ্ট্রকে কীভাবে জনগণের কল্যাণে ঢেলে সাজানো যায়, তার এক আধুনিক ব্লু-প্রিন্ট। তারেক রহমানের বক্তব্যে নিরাপদ বাংলাদেশ শুধু আইনশৃঙ্খলা বা অপরাধ দমনকেন্দ্রিক কোনো ধারণা নয়। বরং এটি একটি সামগ্রিক রাষ্ট্রচিন্তা, যেখানে নাগরিকের জীবন, মতপ্রকাশ, ভোটাধিকার, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং ন্যায়বিচার সবকিছুই অন্তর্ভুক্ত। তার মতে, একটি রাষ্ট্র তখনই নিরাপদ হয়, যখন নাগরিকরা ভয় নয়, বরং আস্থার পরিবেশে বসবাস করতে পারে তখনই প্রকৃত ফলাফলটা ফুটে ওঠে। এ আস্থা গড়ে ওঠে রাষ্ট্র ও নাগরিকের পারস্পরিক দায়বদ্ধতার মাধ্যমে। রাষ্ট্র যখন নাগরিকের মৌলিক অধিকার রক্ষা করে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে এবং আইনের সমান প্রয়োগ ঘটায়, তখন নাগরিকের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ তৈরি হয়। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় আস্থা তৈরি হয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে। নাগরিক যখন বিশ্বাস করে যে তার ভোটের মূল্য আছে, তার মতামত শোনা হয় এবং রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে তার প্রভাব রয়েছে, তখন সে নিজেকে রাষ্ট্রের অংশ হিসেবে দেখতে শুরু করে। এ অংশীদারত্ববোধই একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত নিরাপত্তার ভিত্তি। তার বক্তব্যের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু ছিল গণতন্ত্র। তিনি বলেন, জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত না হলে রাষ্ট্র কখনোই নিরাপদ হতে পারে না। অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনকে তিনি নিরাপদ বাংলাদেশের ভিত্তি হিসেবে চিহ্নিত করেন। তার

বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে তারেক রহমান সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়, এ নীতির পাশাপাশি জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়ার কথা বলেছেন। তিনি এমন এক পররাষ্ট্রনীতির কথা ভাবছেন, যা বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ায় শুধু একটি ভৌগোলিক ভূখণ্ড নয়, বরং একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক করিডর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের রেমিট্যান্স যোদ্ধা হিসেবে যথাযথ মর্যাদা দেওয়া এবং তাদের পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও তার এ ভিশনের অংশ মতে, ভোটাধিকার হরণ মানে শুধু একটি রাজনৈতিক অধিকার কেড়ে নেওয়া নয়, বরং নাগরিক নিরাপত্তার ভিত্তিকে দুর্বল করা। তারেক রহমান আইনের শাসনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, আইন যদি সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ না হয়, তবে সমাজে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং মানবাধিকার রক্ষাকে তিনি একটি নিরাপদ রাষ্ট্রের অপরিহার্য উপাদান হিসেবে উল্লেখ করেন। নিরাপত্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে তিনি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার কথা বলেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, বেকারত্ব, মূল্যস্ফীতি ও বৈষম্য বাড়লে সামাজিক অস্থিরতা অনিবার্য হয়ে ওঠে। তাই তরুণদের কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং ন্যায্য অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি এ বিষয়গুলো তার পরিকল্পনার অংশ। তারেক রহমান বলেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ছাড়া কোনো সমাজ নিরাপদ হতে পারে না। ভিন্নমত দমন করলে রাষ্ট্র শক্তিশালী হয় না বরং দুর্বল হয়। তিনি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, ডিজিটাল নিরাপত্তার নামে হয়রানি বন্ধ এবং নাগরিক কণ্ঠস্বরকে সম্মান করার আহ্বান জানান। তার বক্তব্যে স্পষ্ট হয় যে, তিনি আবেগের চেয়ে পরিকল্পনাকে গুরুত্ব দিতে চান এবং জনগণের সামনে একটি ভবিষ্যৎ ভিশন উপস্থাপন করতে চান। তারেক রহমানের প্ল্যান বা পরিকল্পনার মূল কেন্দ্রে রয়েছে এমন একটি দেশ, যেখানে বিচারহীনতার সংস্কৃতি থাকবে না। গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ সামাজিক সেখান থেকে উত্তরণের পথ দেখিয়েছেন তিনি। তার ভাষায়, নিরাপদ বাংলাদেশ মানে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোরতা নয়, বরং নাগরিকের কথা বলার স্বাধীনতা, ভোটের অধিকার এবং আইনের চোখে সবার সমান সুযোগ নিশ্চিত করা। তারেক রহমানের এ পরিকল্পনার একটি বড় অংশ জুড়ে আছে দেশের তরুণ সমাজ। তিনি বারবার বলছেন দেশের সম্পদ দেশের মানুষের জন্য। পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনা, মেধাভিত্তিক প্রশাসন গড়ে তোলা এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরির মাধ্যমে বেকারত্ব দূর করাই তার মূল লক্ষ্য। তিনি এমন এক অর্থনৈতিক মডেলের কথা একটি বড় অংশজুড়ে আছে বেকারত্ব দূরীকরণ। তিনি মেধাভিত্তিক প্রশাসনের কথা বলছেন, যেখানে কোটা নয় যোগ্যতাই হবে চাকরির একমাত্র মাপকাঠি। মুক্ত গণমাধ্যম হলো গণতন্ত্রের পাহারাদার। সংবাদপত্রের পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়ে তিনি রাষ্ট্রকে জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে চান। পাশাপাশি চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শিক্ষাক্ষেত্রে আধুনিকায়ন ও কারিগরি গবেষণায় বরাদ্দ বৃদ্ধির মাধ্যমে একটি স্মার্ট ও কর্মঠ প্রজন্ম গড়ার পরিকল্পনাও তার এ ভিশনের অংশ। দেশের মানুষ আজ সেই দিনের অপেক্ষায়, যখন তার এই প্ল্যান অনুযায়ী প্রতিটি নাগরিক নির্ভয়ে ভোট দিতে পারবে, নিজের ধর্ম পালন করতে পারবে এবং প্রতিটি মা তার সন্তানের ঘরে ফেরার বিষয়ে সুনিশ্চিত থাকতে পারবেন। নিরাপদ বাংলাদেশ শুধু একটি স্লোগান নয়, এটি এখন ১৬ কোটি মানুষের বাঁচার দাবি। একটি নিরাপদ রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড হলো তার শিক্ষাব্যবস্থা। তারেক রহমান তার রূপরেখায় বর্তমানের মুখস্থনির্ভর শিক্ষা পদ্ধতির পরিবর্তে ‘কর্মমুখী ও গবেষণাভিত্তিক শিক্ষা’র প্রস্তাব করেছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, শুধু সার্টিফিকেটধারী শিক্ষিত বেকার তৈরি নয়, বরং বিশ্ববাজারের সঙ্গে তাল মেলাতে সক্ষম দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিই হবে নিরাপদ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রক্ষাকবচ। এজন্য তিনি জাতীয় বাজেটের উল্লেখযোগ্য অংশ শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে বরাদ্দের প্রতিশ্রুত দিয়েছেন, যা চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সুফল ঘরে তুলতে সহায়ক হবে। বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে তারেক রহমান সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়, এ নীতির পাশাপাশি জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়ার কথা বলেছেন। তিনি এমন এক পররাষ্ট্রনীতির কথা ভাবছেন, যা বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ায় শুধু একটি ভৌগোলিক ভূখণ্ড নয়, বরং একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক করিডর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের রেমিট্যান্স যোদ্ধা হিসেবে যথাযথ মর্যাদা দেওয়া এবং তাদের পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও তার এ ভিশনের অংশ। তারেক রহমানের এই নিরাপদ বাংলাদেশের স্বপ্ন আজ শহরের ড্রয়িংরুম থেকে শুরু করে গ্রামের চায়ের দোকান পর্যন্ত আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। তারেক রহমান মানবাধিকারকে রাষ্ট্রের নৈতিক মানদণ্ড হিসেবে তুলে ধরেন। তার বক্তব্যে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও হয়রানির মতো বিষয়গুলো নিরাপত্তার পরিপন্থি হিসেবে চিহ্নিত হয়। একটি রাষ্ট্র যখন নাগরিকের মৌলিক অধিকার রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তখন সেই রাষ্ট্রের নিরাপত্তা টেকসই হতে পারে না। বাংলাদেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ তরুণ। তারেক রহমান তরুণদের রাষ্ট্রগঠনের অংশীদার হিসেবে দেখার কথা বলেন। শিক্ষিত কিন্তু কর্মহীন তরুণ সমাজ যে কোনো দেশের জন্যই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তরুণদের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে না পারলে রাষ্ট্র শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিকভাবেও ঝুঁকির মুখে পড়ে। তারেক রহমানের চোখে নিরাপদ বাংলাদেশ মানে এমন একটি রাষ্ট্র যেখানে নাগরিক ভয় নয়, ভরসা নিয়ে বাঁচবে, যেখানে ক্ষমতার উৎস হবে জনগণ, যেখানে আইন হবে ন্যায়ের প্রতীক এবং রাজনীতি হবে জনকল্যাণের হাতিয়ার। তবে এটি স্পষ্ট যে I have a plan উচ্চারণের মধ্য দিয়ে তিনি বাংলাদেশ নিয়ে একটি সুসংহত রাজনৈতিক আলোচনার সূচনা করেছেন।

লেখক: সদস্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে খোলা কাগজ পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!