বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

বেপরোয়া পরাশক্তি ও এশিয়ার ঝুঁকি

Author

সৈয়দ মুহাম্মদ আজম , কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

প্রকাশ: ১২ মার্চ ২০২৬ পাঠ: ২৭ বার

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান আরও আগ্রাসী ও উদ্বেগজনক হয়েছে। শ্রীলঙ্কার কাছাকাছি সমুদ্রে মার্কিন সাবমেরিনের টর্পেডো হামলায় শুধু ইরানি নৌবাহিনীর একটি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। এই হামলার ঘটনা দেখিয়েছে, ট্রাম্পের কাছে যেন পুরো পৃথিবীই একটি যুদ্ধক্ষেত্র।

ওয়াশিংটনের কূটনীতির জায়গা দখল করেছে একের পর এক বিমান হামলা। এসব হামলায় শত শত ইরানি বেসামরিক মানুষ নিহত ও আহত হচ্ছেন। ট্রাম্পের হোয়াইট হাউসকে অনেকে ক্রমেই অস্থির সিদ্ধান্তের কেন্দ্র বলে মনে করছেন। যুদ্ধের লক্ষ্যও বারবার বদলাচ্ছে। এমনকি ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের পরবর্তী ‘আয়াতুল্লাহ’ নির্বাচনে তাকে ভূমিকা রাখতে হতে পারে। এদিকে তার প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথও কঠোর সামরিক ভাষায় হত্যার হুমকি দিচ্ছেন।

যুদ্ধ শুরু হওয়ার এতটা সময় পর স্পষ্ট হয়েছে, ইরানের নেতারা ট্রাম্পের ভেনেজুয়েলার মতো কোনো অভ্যুত্থানের পরিকল্পনার সামনে নতি স্বীকার করতে চান না। সামরিক শক্তিতে পিছিয়ে থাকলেও ইরান ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে চাপ তৈরি করছে এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ব্যস্ত রাখছে। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই, কারণ ইরান আগেই সতর্ক করেছিল, তাদের ওপর হামলা হলে সংঘাত পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়বে।

এই অবস্থায় ট্রাম্প এখন মিত্র দেশগুলোর সঙ্গেও বিরোধে জড়াচ্ছেন। তিনি জর্জ ডব্লিউ. বুশের পুরোনো নীতি অনুসরণ করছেন ‘আমাদের পক্ষে না হলে আমাদের বিরুদ্ধে’। উপসাগরীয় আরব দেশগুলো ও যুদ্ধের আঘাতে বিপর্যস্ত লেবানন এই সংঘাত বন্ধ দেখতে চায়। ব্রিটেন ও ইউরোপের অনেক দেশও এতে জড়াতে চায় না, তবু পরিস্থিতি তাদের টেনে নিচ্ছে। একই সঙ্গে বিশ্ব অর্থনীতিতেও চাপ বাড়ছে। ট্রাম্পের এই সংঘাতে কোনো বীর নেই, আছে শুধু ভুক্তভোগী। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজকে অনেকে এখানে ব্যতিক্রম হিসেবে দেখছেন।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে গাজায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ রয়েছে। বিশ্লেকদের মতে, ইরানে হামলার ঘটনাগুলোর জন্য ট্রাম্পকেও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে জবাবদিহি করতে হতে পারে, বিশেষ করে ২৮ ফেব্রুয়ারি মিনাবের একটি স্কুলে ভয়াবহ বোমা (টর্পেডো) হামলার ঘটনায়।

স্নায়ুযুদ্ধের পর থেকে প্রত্যেক মার্কিন প্রেসিডেন্টের লক্ষ্য হলো বিশ্বে তাদের আধিপত্য ধরে রাখা। সেটা করতে তারা নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা করেননি। বরং নিজেদের সুবিধামতো পরিবর্তন করতে প্রস্তুত তারা। যেমন, দ্বিতীয় ইরাক যুদ্ধে তারা ‘ইচ্ছুক জোট’ ব্যবহার করেছে, সমুদ্র আইন সম্পর্কিত জাতিসংঘের চুক্তি (ইউএনসিএলওএস) মানেননি, এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে যোগ দেননি। মার্কিন নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থা এমনভাবে চলছে যেন শক্তিশালী দেশগুলো নিজেদের সুবিধামতো আইন প্রয়োগ করে, আর আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগ হয় কেবল অভিযুক্ত বা ভুক্তভোগীর পরিচয়ের ওপর ভিত্তি করে।

মার্কিন প্রশাসনের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের প্রবণতা। তারা যেকোনো অপছন্দের শাসনব্যবস্থা অপসারণ করতে চায়। যদিও পূর্বের প্রশাসনের যুদ্ধ বা হস্তক্ষেপ সমালোচনা করেন পরবর্তীরা। তবু নতুন প্রশাসন প্রায়শই একই পথে হাঁটে, কখনও কখনও আরও উগ্রভাবে।

স্নায়ুযুদ্ধ শেষের পর মার্কিন সামরিক অভিযান বিভিন্ন কারণে চালানো হয়েছে। ১৯৯০ সালে কুয়েতে ইরাকি আক্রমণ থামানো হয়েছে আন্তর্জাতিক নিয়ম রক্ষার নামে। ১৯৯০-এর দশকে বলকান ও সোমালিয়ায় মানবিক হস্তক্ষেপ করা হয়েছে। ২০০১ সালে ৯/১১ হামলার পর আফগানিস্তানে অভিযান চালানো হয়েছে জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার অজুহাতে। ২০০৩ সালে দ্বিতীয় ইরাক যুদ্ধ শুরু হয়েছে, মিথ্যা অস্ত্র ও সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ দেখিয়ে মধ্যপ্রাচ্য পুনর্নির্মাণের জন্য।

তবে ট্রাম্পের সময় সামরিক হস্তক্ষেপ কেন চালানো হয়েছে, তা বোঝা কঠিন। তারা ভেনিজুয়েলায় প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ করেছে এবং ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা করেছে। যদিও এই দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কোনো আসন্ন বা অস্তিত্বগত হুমকি তৈরি করেনি। তবু হস্তক্ষেপের প্রবণতা অব্যাহত আছে।

মধ্যপ্রাচ্যের পুনরাবৃত্ত অস্থিতিশীলতা ও ইউক্রেনে চলমান যুদ্ধের কারণে এশীয় দেশগুলো কিছুটা আশ্বস্ত বোধ করতে পারে। এর সঙ্গে যুক্ত আছে ‘ডোনরো ডকট্রিন’, যা পশ্চিম গোলার্ধকে যুক্তরাষ্ট্রের একচেটিয়া প্রভাবের এলাকা হিসেবে ধরা হয়। তবে এশিয়া সম্পূর্ণ নিরাপদ নয়। শীতল যুদ্ধের সময় এশিয়ায় মার্কিন হস্তক্ষেপ দীর্ঘস্থায়ী ছিল, যেমন ভিয়েতনাম যুদ্ধ। এখন কেন আমরা আশা করব ওয়াশিংটন সংযম দেখাবে? ল্যাটিন আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে সরকার উৎখাতের পর কেন তারা এশিয়ার ওপর হাত তুলবে না?
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো এশিয়ার জন্য সতর্কবার্তা। ক্ষমতা বা আদর্শ যেকোনো কারণে ওয়াশিংটন দুর্বলতা দেখলেই দীর্ঘদিনের প্রতিপক্ষদের ওপর দ্রুত ঝাঁপিয়ে পড়ে। প্রযুক্তির উন্নতি যুদ্ধকে কম ঝুঁকিপূর্ণ করেছে, যেমন নির্ভুল হামলা ও ড্রোন আক্রমণ, যা মার্কিনদের বড় ক্ষতির মুখে ফেলে না।

উত্তর কোরিয়া পারমাণবিক অস্ত্রের কারণে নিরাপদ মনে করতে পারে, কিন্তু ভেনেজুয়েলা ও ইরানে সাম্প্রতিক ‘সাফল্য’ ট্রাম্প প্রশাসনকে আরও আত্মবিশ্বাসী করেছে। চীনও নিরাপদ নয়। যদিও দেশটির নেতৃত্বকে সরাসরি লক্ষ্যবস্তু করার সম্ভাবনা ক্ষীণ। তবে ট্রাম্পের ঝুঁকি নেওয়ার মনোভাব ও প্রশাসনে চীনবিরোধী উপদেষ্টার উপস্থিতি ঝুঁকি বাড়িয়েছে। মার্কিন দৃষ্টিকোণ থেকে বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়াও যৌক্তিক, কারণ সময়ের সঙ্গে চীনের সামরিক শক্তি বাড়ছে।

ভারতও যুক্তরাষ্ট্রের নজরে। গ্লোবাল সাউথের আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে পরাজয় মেনে বসেছে। পাকিস্তানের সঙ্গে সাম্প্রতিক সংঘাত ও রাশিয়ার তেল কেনার জন্য ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি ভারতের মনোবলে প্রভাব ফেলেছে। যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্ট জানিয়েছে, তারা ভারতকে চীনের মতো পরাশক্তি হতে দেবে না। ভারত মহাসাগরে ইরানি নৌযানের হামলার তথ্য সরবরাহ করেছে পেন্টাগনকে। বিনিময়ে রাশিয়ার তেল কিনতে অনুমতি পেয়েছে। এছাড়া, ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে। ফিলিস্তিনের বিরুদ্ধে নিজেদের নাগরিক পাঠিয়ে ‘বন্ধুত্বের’ পরীক্ষা দিয়েছে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় দেশগুলো খুব সতর্কতার সঙ্গে ইরানে হামলার প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। এই অঞ্চলের বিভিন্ন জোট সংগঠন এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি। হরমুজ প্রণালী বন্ধের কারণে জ্বালানি মূল্য ও বীমা প্রিমিয়াম বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা রপ্তানিমুখী দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থনীতিকে হুমকির মুখে ফেলেছে। এ ছাড়া, এই অঞ্চলে পশ্চিমা স্বার্থকে লক্ষ্য করে ইরানি প্রক্সিদের আক্রমণের সম্ভাব্য হুমকিও অগ্রাহ্য করা যায় না।

প্রতিবেশী মিয়ানমারেও মার্কিন-চীনের দ্বন্দ্ব, বাংলাদেশের সেন্টমার্টিন দ্বীপ, চট্টগ্রাম বন্দর ও দেশীয় রাজনীতিতে মার্কিন আধিপত্যের প্রভাব লক্ষ্য করা যায় বলে অনেকে মত দেন। তবে বাংলাদেশে সামরিক অভিযান চালানোর মতো পরিস্থিতি নেই।
প্রবাদ আছে ‘যুক্তরাষ্ট্র যার মিত্র, তার কোনো শত্রুর প্রয়োজন নেই’। গ্রিনল্যান্ডের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের হুমকি প্রমাণ করেছে, এশিয়ার গণতান্ত্রিক দেশ এবং মার্কিন জোটের অংশীদাররাও এই ধরনের চাপ থেকে মুক্ত নয়।

ইরান যুদ্ধ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলবে। ইরানে হামলার ঘটনা প্রমাণ করে যুক্তরাষ্ট্র বেপরোয়া এবং চঞ্চল পরাশক্তি।

করোনা মহামারীর পর চীনের ওপর বিশ্বের অতিরিক্ত সরবরাহ-নেটওয়ার্ক নির্ভরতার কারণে দেশটির ঝুঁকি কমানো জরুরি। ঝুঁকি কমানো মানে যুক্তরাষ্ট্রের অস্থির ও ‘সঠিক বা ভুল হতে পারে’ ধরনের পররাষ্ট্রনীতি থেকে দূরে থাকা।

জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী কিশিদা ফুমিও ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের প্রতিক্রিয়ায় বলেছিলেন, ‘আজকের ইউক্রেন আগামীকালের পূর্ব এশিয়া হতে পারে’। কিন্তু ট্রাম্পের অহংকার এবং যুক্তরাষ্ট্রের শাসন পরিবর্তন ও আধিপত্য রক্ষার প্রচেষ্টার কারণে বলা যায়, ‘আজকের মধ্যপ্রাচ্য আগামীকালের এশিয়া হতে পারে’।

লেখক: শিক্ষার্থী, মিডিয়া, কমিউনিকেশন অ্যান্ড জার্নালিজম, কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ।

লেখক: প্রচার সম্পাদক, সমন্বিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ১২ মার্চ ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশের খবর পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!