শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

পরবর্তী সংযোগ ট্রেন মিস হচ্ছে হরহামেশায়! কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনার দায়ে জরিমানা গুণতে হয় ৬ গুন পর্যন্ত : দায় কেনো যাত্রী নেবে?

Author

মো মোকছেদুল মমিন , বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর

প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২৫ পাঠ: ৪০ বার

গত ১৭ জুন ২০২৫ সকালবেলা রামসাগর এক্সপ্রেসে করে আমার রংপুর যাওয়ার কথা ছিল। আমি ছিলাম তিনজনের একটি যাত্রীদল নিয়ে। আমাদের ওঠার কথা ছিল নলডাঙ্গা স্টেশন থেকে, যা কাউনিয়া-সান্তাহার সেকশনের গাইবান্ধা জেলার অন্তর্গত একটি ছোট স্টেশন। সূচি অনুযায়ী রামসাগর এক্সপ্রেস ট্রেনটি সকাল ৮টা ২১ মিনিটে নলডাঙ্গা স্টেশন ত্যাগ করার কথা। সে অনুযায়ী আমরা যথাসময়ে, অর্থাৎ সকাল ৮টা ১৬ মিনিটে স্টেশনে উপস্থিত হই; কিন্তু অবাক হয়ে দেখি, ট্রেনটি অনেক আগেই ছেড়ে গেছে-কমপক্ষে আধা কিলোমিটার দূরে চলে গেছে তখনই। বোঝা গেল, ট্রেনটি ৮টা ১৫ মিনিটেই স্টেশন ত্যাগ করেছে-অর্থাৎ নির্ধারিত সময়ের প্রায় ছয় মিনিট আগে।

যিনি ওই সময় কাগজের টিকিট বিক্রি করছিলেন (নাম রায়হান), তিনিও ট্রেন চলে যাওয়ার পর স্টেশন ছেড়ে গিয়েছিলেন। ফলে তার সঙ্গে কথা বলার সুযোগও পাইনি। বগুড়া কমিউটারের টিকিট বিক্রেতাকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন- ট্রেন সময়মতোই গেছে। তার ঘড়িতে তখন সময় ৮টা ১৭। আমি প্রশ্ন করলাম- যদি সময় ৮টা ১৭ হয়, তাহলে কিভাবে ৮টা ২১-এ ছোটা ট্রেন সময়মতো যেতে পারে? তিনি আর কোনো উত্তর দেননি। এরপর আমরা দ্রুত অটোযোগে বামনডাঙ্গা স্টেশনে ছুটে যাই, আশা ছিল সেখানে হয়তো ট্রেনটি ধরতে পারব; কিন্তু সেখানে পৌঁছেও দেখি ট্রেন চলে গেছে। শেষে বাসে করে রংপুর যেতে হলো, যার ভাড়া পড়ল ৮৫ টাকা- যেখানে ট্রেনে ভাড়া ছিল মাত্র ২০ টাকা।

ইচ্ছা ছিল বামনডাঙ্গা স্টেশনে অভিযোগ করার, কিন্তু একই দিনে বিশ্ববিদ্যালয়ে সকাল ১০টা ৩০ মিনিটে ক্লাশ থাকায় তা সম্ভব হয়নি। কারণ পরবর্তী বাস এক ঘণ্টা পর, আর সেটা ধরলে ক্লাশ মিস হয়ে যেত।

প্রশ্ন হচ্ছে, রেলের এ ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীনতা কি আমরা চিরকাল মেনে নেব? কখনো ঘণ্টার পর ঘণ্টা দেরি, আবার কখনো সময়ের আগেই ট্রেন ছেড়ে যায়। তাহলে এই ব্যবস্থা কতটুকু যাত্রীবান্ধব? রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ আসলে কী করছে?

রেলগাড়ির ক্ষেত্রে ৩০ সেকেন্ডও গুরুত্বপূর্ণ সময়। সেখানে ছয় মিনিট আগেই ট্রেন ছেড়ে যাচ্ছে! এটাকে আর যাই বলা হোক, জনসেবা বলা যায় না। একই স্টেশন থেকে এর আগেও একবার (গত বছর) ট্রেন নির্ধারিত সময়ের প্রায় ২ মিনিট আগে ছেড়ে গিয়েছিল। তখন ভাগ্যক্রমে বামনডাঙ্গায় গিয়ে ধরতে পেরেছিলাম। আবার গত বছরের শেষদিকে দিনাজপুর কমিউটারের বিলম্বের কারণে পদ্মরাগ এক্সপ্রেস ধরা সম্ভব হয়নি- মাত্র ৩০ সেকেন্ডের জন্য মিস করে আমাকে তিনগুণ খরচ করে গন্তব্যে পৌঁছতে হয়।

এসব ঘটনা নিছক বিচ্ছিন্ন নয়-এগুলো এখন রেলপথ ব্যবস্থার স্বাভাবিক চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ একটি ট্রেনের সময়ানুবর্তিতা অনেকের পরবর্তী যাত্রার ভিত্তি। কেউ কেউ এক ট্রেন মিস করে অন্য ট্রেন ধরার পরিকল্পনায় থাকেন, স্থানীয় যাত্রীদের ক্ষেত্রেও এভাবে পরিকল্পনা হয়। কিন্তু রেলের এই অনিয়ম তাদের নিত্যদিনের বিড়ম্বনায় পরিণত করছে।

রেলের এই প্রহসনের কয়েকটি বাস্তব বিপর্যয় রয়েছে। যেমন-

এক. সময়ের অপচয়, দুই. এক ট্রেনের বিলম্বে অন্য ট্রেন মিস হয়ে অর্থনৈতিক ক্ষতি, তিন, নির্ধারিত সময়ের আগেই ট্রেন ছেড়ে যাওয়া, যা একেবারে অগ্রহণযোগ্য।

প্রশ্ন হচ্ছে-এভাবে চললে মানুষ কেন ট্রেন ব্যবহার করবে? যদি সময়সূচিই মানা না হয়, তাহলে তা প্রকাশের প্রয়োজনটাই বা কী? যদি ট্রেন কন্ট্রোল রুম বা লোকোমাস্টারের খেয়ালখুশি এত চলতে থাকে, তাহলে যাত্রীদের প্রস্তুত থেকেও ট্রেন মিস হবে, আর তারা ভেবে নেবে-ভাগ্যে ছিল না।

তবু এই লোক দেখানো সময়সূচি বন্ধ করা হোক। বরং স্পষ্ট করে বলা হোক-ট্রেনের নির্দিষ্ট কোনো সময় নেই-যা ইচ্ছা, যখন ইচ্ছা; যাত্রীদের অন্তত তখন প্রস্তুত থাকার মানসিকতা থাকবে। রেল কর্তৃপক্ষ কি এসব চোখে দেখেন না? কন্ট্রোল রুমে বসে শুধু বেতন নেওয়ার জন্যই কি তারা আছেন? এটা আপাতত এমনটাই মনে হয়।

এভাবে আর চলতে পারে না-যাত্রীসেবার নামে এই ব্যর্থতা আর সহ্যযোগ্য নয়। রেল যদি যাত্রী পরিবহনে সক্ষম না হয়, তাহলে এ ব্যবস্থা বন্ধ করে দেয়া হোক। নয়তো দ্রুত কার্যকর, টেকসই সমাধানে এগিয়ে আসুক রেল কর্তৃপক্ষ।

রেলওয়ের জন্য প্রস্তাবনা:

প্রথমত, ট্রেন নিয়ন্ত্রণ কক্ষকে সর্বদা মনোযোগী ও সক্রিয় রাখতে হবে। পরিকল্পনামাফিক নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে বেশিরভাগ সমস্যার সমাধান সম্ভব।

দ্বিতীয়ত, যেসব ট্রেনের সঙ্গে যাত্রীদের পরবর্তী ট্রেন ধরার পরিকল্পনা থাকে (যেমন দিনাজপুর কমিউটার ও পদ্মরাগ এক্সপ্রেস), সেই ট্রেনগুলোর কন্ট্রোলিং আরও সচেতনভাবে করতে হবে।

তৃতীয়ত, প্রতিটি লোকোমোটিভে নেটওয়ার্ক সংযুক্ত ডিজিটাল ঘড়ি স্থাপন করা উচিত-যাতে সময়ের অগ্র বা বিলম্বের আশঙ্কা না থাকে।

আমরা চাই, বাংলাদেশ রেলওয়ে আরও যাত্রীবান্ধব হোক। আর যাত্রীসেবা যেন প্রহসনে পরিণত না হয়।

লেখক: মোকছেদুল মমিন, শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।

লেখক: দপ্তর সম্পাদক, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ২৯ জুন ২০২৫ তারিখে দৈনিক সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!