ডায়াবেটিস নামক মহামারী রোধে প্রয়োজন সচেতনতার লড়াই

ডায়াবেটিস: নীরব মহামারির বিরুদ্ধে সচেতনতার লড়াই
আপনার রক্তের গ্লুকোজ কি কখনো মেপেছেন? মানুষের রক্তে গ্লুকোজের নির্দিষ্ট একটা মাত্রা থাকে,যার থেকে বেশি হলে মেডিকেলের ভাষায় এটাকে ডায়াবেটিস বলে আখ্যায়িত করা হয়।ডায়াবেটিস এখন শুধু একটি রোগের নাম নয়, এটি একবিংশ শতাব্দীর একটি নীরব মহামারি। আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশন –এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রায় ৮০ কোটির বেশি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ এই রোগে আক্রান্ত, এবং দক্ষিণ এশিয়ায় এর প্রকোপ দ্রুত বাড়ছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। শহর থেকে গ্রাম-সবখানেই ডায়াবেটিস আজ উদ্বেগের কারণ।
ডায়াবেটিস মূলত কী?
ডায়াবেটিস মেলিটাস হলো এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি বিপাকীয় রোগ, যেখানে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকে। এর মূল কারণ ইনসুলিন হরমোনের ঘাটতি বা কার্যকারিতার সমস্যা। ইনসুলিন আমাদের অগ্ন্যাশয় থেকে নিঃসৃত হয় এবং রক্তের গ্লুকোজকে কোষে প্রবেশ করাতে সাহায্য করে। যখন এই প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটে, তখনই তৈরি হয় ডায়াবেটিস।
ডায়াবেটিসের কত ধরনের?
টাইপ–১ ডায়াবেটিস – সাধারণত শিশু বা কিশোর বয়সে শুরু হয়। শরীর একেবারেই ইনসুলিন তৈরি করতে পারে না।
টাইপ–২ ডায়াবেটিস – সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের কারণে শরীর ইনসুলিন ঠিকমতো ব্যবহার করতে পারে না।
গর্ভকালীন ডায়াবেটিস – গর্ভাবস্থায় দেখা দেয়, তবে ভবিষ্যতে টাইপ–২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়।
ডায়াবেটিসের কী কী লক্ষন দেখা যায়?
বারবার প্রস্রাব হওয়া, অতিরিক্ত তৃষ্ণা ও ক্ষুধা, অকারণে ওজন কমে যাওয়া, ক্লান্তি, ক্ষত শুকাতে দেরি হওয়া।
অনেক সময় টাইপ–২ ডায়াবেটিসে শুরুতে স্পষ্ট লক্ষণ নাও থাকতে পারে। তাই নিয়মিত রক্তে শর্করা পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ডায়াবেটিস কেন ভয়ের?
অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস দীর্ঘমেয়াদে হৃদরোগ, কিডনি বিকল, স্ট্রোক, অন্ধত্ব এবং স্নায়ু ক্ষতির কারণ হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বারবার সতর্ক করেছে যে, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে না থাকলে এটি জীবনমান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ: আমাদের করণীয়
সুখবর হলো—টাইপ–২ ডায়াবেটিস অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিরোধযোগ্য। সচেতনতা ও সঠিক জীবনযাপন পদ্ধতি অনুসরণ করলে এই রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। তাই ব্যক্তিগত ও পারিবারিক পর্যায়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।
প্রথমত, সুষম খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা দরকার। কম চিনি ও কম চর্বিযুক্ত খাবার গ্রহণ করা উচিত এবং বেশি আঁশযুক্ত শাকসবজি, ফলমূল ও পূর্ণ শস্য খাদ্যতালিকায় রাখা প্রয়োজন। অতিরিক্ত ভাজাপোড়া ও প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চললে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয়।
দ্বিতীয়ত, নিয়মিত ব্যায়াম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট দ্রুত হাঁটা, হালকা দৌড়, সাইকেল চালানো বা অন্যান্য শারীরিক কার্যক্রম শরীরকে সক্রিয় রাখে এবং ইনসুলিনের কার্যকারিতা বাড়ায়। এতে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা স্বাভাবিক রাখতে সহায়তা করে।
তৃতীয়ত, ওজন নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। স্থূলতা ডায়াবেটিসের অন্যতম বড় ঝুঁকির কারণ। তাই সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও নিয়মিত ব্যায়ামের মাধ্যমে স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা উচিত।
চতুর্থত, মানসিক চাপ বা স্ট্রেস কমানোও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়াতে পারে। পর্যাপ্ত ঘুম, মেডিটেশন, নামাজ বা প্রার্থনা এবং ইতিবাচক চিন্তাভাবনা মানসিক সুস্থতা বজায় রাখতে সহায়ক।
সবশেষে, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা অত্যন্ত জরুরি- বিশেষ করে যাদের পরিবারে ডায়াবেটিসের ইতিহাস রয়েছে। সময়মতো রক্তে শর্করা পরীক্ষা করলে প্রাথমিক পর্যায়েই ঝুঁকি চিহ্নিত করা যায় এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়।
সচেতনতা, শৃঙ্খলিত জীবনযাপন ও নিয়মিত পরীক্ষা-এই তিনটি বিষয়ই ডায়াবেটিস প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের মূল চাবিকাঠি।
ডায়াবেটিস কোনো লজ্জার বিষয় নয়; এটি নিয়ন্ত্রণযোগ্য একটি অবস্থা। প্রয়োজন সচেতনতা, নিয়মিত ফলোআপ এবং সঠিক চিকিৎসা। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যম একসাথে কাজ করলে এই নীরব মহামারির বিরুদ্ধে বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব।
পরিশেষে ডায়াবেটিস মানেই জীবন শেষ নয়। সঠিক জীবনযাপন যেমন ( কম কার্বোহাইড্রেট যুক্ত খাবার,ফলমূল, শাকসবজি) , ভালো ঘুম,মানসিক প্রশান্তির চর্চা, শারীরিক ব্যায়াম ও নিয়মিত চিকিৎসা মেনে চললে একজন ডায়াবেটিস রোগীও সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও কর্মক্ষম জীবন যাপন করতে পারেন। আজ থেকেই সচেতন হই, সুস্থ ভবিষ্যৎ গড়ি। ধন্যবাদ।
লেখক:জয় পাল অর্ঘ
শিক্ষার্থী, ফার্মেসি বিভাগ
গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

