বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

ইসলামি উচ্চশিক্ষার বিশেষায়িত কেন্দ্র : ইবির ‘ডি’ ইউনিটের অধীনে আধুনিক ও ধ্রুপদী জ্ঞানচর্চা

Author

হাবিব আল মিসবাহ , ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ৭ এপ্রিল ২০২৬ পাঠ: ৯৪ বার

 

ইসলামি উচ্চশিক্ষার বিশেষায়িত কেন্দ্র : ইবির ‘ডি’ ইউনিটের অধীনে আধুনিক ও ধ্রুপদী জ্ঞানচর্চা

 

দিনের শান্ত প্রহরগুলোতে, সকাল হোক বা পড়ন্ত বিকেল, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়ার (ইবি) থিওলজি এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ অনুষদ ভবনের করিডোর দিয়ে হাঁটলে এক অদ্ভুত প্রশান্তি কাজ করে। দেয়ালে ক্যালিগ্রাফির আঁচড় আর শিক্ষার্থীদের মুখে আরবি ভাষার ধ্রুপদী গুঞ্জন জানান দেয়, এটি কেবল একটি ভবন নয়, বরং এটি দেশের ইসলামি উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার এক অবিনাশী মিনার। ১৯৭৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের যে মূল লক্ষ্য ছিল “আধুনিক শিক্ষার সাথে ইসলামি শিক্ষার সার্থক সমন্বয়”, তার সার্থক রূপকার এই ‘ডি’ ইউনিট।

বর্তমানে এই ইউনিটের অধীনে তিনটি ভিন্ন অনুষদের চারটি বিভাগ পরিচালিত হচ্ছে :

থিওলজি এণ্ড ইসলামিক স্টাডিজ অনুষদভুক্ত : আল-কুরআন এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ এবং আল-হাদীস এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ।

ইসলামিক এন্ড কম্পারেটিভ রিলিজিয়ন অনুষদভুক্ত : দাওয়াহ এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ।

কলা অনুষদভুক্ত : আরবি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ।

 

ঐতিহ্যের ধারক ও স্বাতন্ত্র্যের লড়াই

বর্তমানে দেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইবির অন্যান্য বিভাগগুলো যখন ‘গুচ্ছ’ (GST) পদ্ধতির ছায়াতলে, তখন ইবির ‘ডি’ ইউনিট তার নিজস্ব পরীক্ষা পদ্ধতি ও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য বজায় রেখেছে। এই ইউনিটে যুক্ত আছে কলা অনুষদের অন্যতম প্রাচীন বিভাগ ‘আরবি ভাষা ও সাহিত্য’। এর ফলে আল-কুরআন, আল-হাদীস এবং দাওয়াহ এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের সাথে আরবির মেলবন্ধনে এই ইউনিটটি আরও শক্তিশালী এক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। বিশেষায়িত জ্ঞান ও কিতাবুল আসরের ওপর ভিত্তি করে স্বতন্ত্র পরীক্ষা পদ্ধতি এই ইউনিটের আভিজাত্য ও অ্যাকাডেমিক গভীরতাকে ধরে রেখেছে।

 

গবেষণায় তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক সমন্বয় :

ইবির ‘ডি’ ইউনিটের বিভাগগুলো শুধু পাঠদানেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এগুলো একেকটি উচ্চতর অ্যাকাডেমিক রিসার্চ সেন্টার। এখানে এমফিল (MPhil) ও পিএইচডি (PhD) পর্যায়ে কুরআন, হাদিস, ফিকহ ও দাওয়াহ বিষয়ে নিয়মিত মৌলিক গবেষণা হচ্ছে, যা বাংলাদেশের ইসলামিক লিটারেচারকে সমৃদ্ধ করছে।

এখানকার শিক্ষক ও গবেষকরা ইসলামকে কেবল একটি ধর্মীয় আচার হিসেবে নয়, বরং একটি সমন্বিত জীবনদর্শন ও আদর্শিক রূপরেখা হিসেবে উপস্থাপন করছেন। দাওয়াহ এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের মাধ্যমে মানবাধিকার, নারীর অধিকার, মিডিয়া ও দাওয়াহ এবং আন্তঃধর্মীয় সংলাপের (Interfaith Dialogue) মতো সমকালীন বৈশ্বিক ইস্যুতে ইসলামের কালজয়ী ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ হচ্ছে। এর ফলে আধুনিক সমাজের জটিল প্রশ্নগুলোর বুদ্ধিবৃত্তিক সমাধান মিলছে এই অনুষদ থেকেই।

 

আন্তর্জাতিক সংযোগ ও গ্লোবাল রিপ্রেজেন্টেশন

এই ইউনিটের শিক্ষার্থীরা আজ কেবল দেশের সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই। মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুরু করে ইউরোপ ও দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়ে তারা উচ্চতর গবেষণায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের স্থানীয় জ্ঞান আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে পৌঁছাচ্ছে এবং গ্লোবাল অ্যাকাডেমিক সার্কেলে দেশের প্রতিনিধিত্ব বাড়ছে। বায়ো-এথিক্স (চিকিৎসা নৈতিকতা), ইসলামিক ইকোনমিক্স এবং সোশ্যাল জাস্টিসের মতো আধুনিক ডিসিপ্লিনগুলোর সাথে ইসলামের নৈতিক মেলবন্ধন তৈরিতে এখানকার শিক্ষার্থীরা অগ্রণী ভূমিকা রাখছেন।

 

নতুন দিগন্তের অপেক্ষায় : ‘সিরাত’ ও ‘তাফসীর’ বিভাগ

এবারের ভর্তি মৌসুমে সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় ছিল নতুন দুটি বিভাগের সংযুক্তি। দীর্ঘদিনের দাবি ও পরিকল্পনার পর ‘ডিপার্টমেন্ট অব কম্পারেটিভ তাফসীর’ এবং ‘ডিপার্টমেন্ট অব আস-সিরাহ আন-নববীয়্যাহ’ চালুর সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বিভাগ দুটির পাঠ্যক্রম ও জনবল কাঠামো চূড়ান্ত হলেও বর্তমানে তা ইউজিসির (UGC) ফাইল অনুমোদনের অপেক্ষায় ঝুলে আছে। তুলনামূলক তাফসীর শাস্ত্র এবং বিশ্বনবি (সা.)-এর পবিত্র জীবনী নিয়ে স্বতন্ত্র এই বিভাগ দুটি চালু হলে, ইসলামি গবেষণা ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে যাবে।

 

আগামীর সম্ভাবনা

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়া আজ কেবল একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, বরং এটি ইসলামি কৃষ্টি ও সংস্কৃতির ধারক। ‘ডি’ ইউনিটের অধীনে বিভাগগুলো থেকে বের হওয়া শিক্ষার্থীরা বিসিএস ক্যাডার থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সবখানেই তাদের মেধার স্বাক্ষর রাখছেন

সত্যি বলতে, ডি ইউনিটের গবেষণা শুধু অতীতকে সংরক্ষণ করে না, বরং বর্তমানকে ব্যাখ্যা করে এবং ভবিষ্যতের জন্য বুদ্ধিবৃত্তিক দিকনির্দেশনা দেয়। ইউজিসির সবুজ সংকেত পেলে যখন ‘সিরাত’ ও ‘তাফসীর’ বিভাগ পূর্ণোদ্যমে যাত্রা শুরু করবে, তখন এই ইউনিটটি বিশ্বের অন্যতম সেরা ইসলামিক রিসার্চ হাবে পরিণত হওয়ার পথে আরও একধাপ এগিয়ে যাবে। ঐতিহ্যের এই ধারা বয়ে চলুক প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে, ইবির লাল পাড়ের সবুজ প্রান্তরে।

 

হাবিব আল মিসবাহ

আল-কুরআন এণ্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ।

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

উপ-দপ্তর সম্পাদক, বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা।

০১৬১১-৫৬৩৮১৯

hmh42242@gmail.com

লেখক: উপ-দপ্তর সম্পাদক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!