আকস্মিক বৃষ্টিতে চড়ুইভাতির গল্প

ফুটবল টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় ব্যাচের সবাই মিলে একটা চড়ুইভাতি করার চিন্তা থাকলেও ক্লাস, টিউটোরিয়ালের চাপে হয়ে উঠছিলো না। অবশেষে যখন একটু ব্যস্ততা কমলো, মাথার উপর থেকে পরীক্ষার চিন্তা কিছুটা সরে গেল তখন হুট করেই একদিন সিআর বললো,” আগামী পরশু ক্লাস, টিউটোরিয়াল কিছু নেই। চল আমরা ঐদিনই চড়ুইভাতিটা করে ফেলি।” উল্লেখ্য আমরা সবাই ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান ও উপাত্ত বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। ব্যাচের সবাই সাঁই দিতেই ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে ডেট ঠিক হয়ে গেল, স্থান মীর মুগ্ধ সরোবর (পূর্ব নাম মফিজ লেক)। মাঝে মাত্র একদিন সময়, এর মধ্যে সবার কাছ থেকে টাকা তুলে বাজার করে পরের দিনই চড়ুইভাতি করা বেশ কঠিনই বটে। তার উপর যারা ঐদিন ক্লাসে অনুপস্থিত ছিল তাদের জানানো, চেয়ারম্যান স্যারের কাছ থেকে অনুমতি নেওয়া, শিক্ষকদের দাওয়াত দেওয়া সব মিলিয়ে মাত্র একদিনে সব ম্যানেজ করা বেশ কষ্টকর। আমাদের খাবারের মেনু ঠিক করা হয়েছিলো সিদ্ধ ডিম ভাজি, গরুর মাংস, সাদা ভাত আর চর্বি দিয়ে ঘন ডাল। একেবারে বাঙালি খাবার। আর এই সবকিছু নিজেরাই একসাথে রান্না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
দেখতে দেখতে মাঝের দিনটি কেটে গেল সবকিছু ম্যানেজ করতে। চড়ুইভাতির দিন সকাল ৯ টার দিকে সবকিছু শুরু করার কথা থাকলেও রমনীদের সজ্জিত হয়ে যেতে যেতে এগারোটা বেজে যায়। যার কারণে সিআর এর বিস্তৃত ঝাড়ি খেয়ে চড়ুইভাতির উদ্বোধন হয়। পরবর্তীতে সকলে মিলে রান্নার কাজ শুরু করা হয়। প্রধান রাঁধুনি ছিলো আমাদের ব্যাচের মধু। নাম যেমন মধু রান্নার টেস্টও একেবারে মুখে লেগে থাকার মতো। একদিকে রান্না চলছিল অন্যদিকে মেয়েরা টুকটাক করে অন্য কাজগুলো সারছিল। রান্নার মূল আইটেম গুলো শেষ হতেই আমাদের চড়ুইভাতিতে অতিথিদের আগমন ঘটলো। অতিথিদের মধ্যে ছিলেন আমাদের ডিপার্টমেন্টের প্রতিষ্ঠাতা শ্রদ্ধেয় ড. কামাল স্যার। সাথে ছিলেন আমাদের ডিপার্টমেন্টের শিক্ষার্থীবান্ধব ড. সোহেল রানা স্যার, ড. সাজ্জাদ হোসেন স্যার ও আমাদের সবার প্রিয় সুমন বিশ্বাস স্যার। স্যারদের আগমনে আমাদের চড়ুইভাতি আরো আনন্দঘন হয় উঠেছিলো। হাসি মজা আর ফটোসেশনে চড়ুইভাতি খুবই উপভোগ্য লাগছিলো। পরবর্তীতে খাওয়া-দাওয়া, খোশগল্প শেষে স্যাররা বিদায় নেয়।
এর পরই ঘটলো বিপত্তি। হঠাৎ করেই মাথার উপর কোথা থেকে একদল কালো মেঘ উড়ে এলো । সাথে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। এদিকে অনেকের তখনো খাওয়া হয়নি। তার উপর সবকিছুই বাইরে। কারণ হঠাৎ চড়ুইভাতির আয়োজন করাই সবকিছু একটু অনাড়ম্বর ছিল, খুব সাদামাটা আয়োজন, কোন প্যান্ডেল করা হয়নি। যার ফলে সকলের চিন্তা তখন একটাই ,” এখন কি হবে?” যাই হোক ঐইভাবেই গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পরতেই থাকলো। সিদ্ধান্ত হলো কোন রকমে সবার খাওয়া শেষ করতে হবে। তারপর না হয় বৃষ্টিতে ভিজা হবে। কিন্তু যখন সবাই খেতে বসবে ঠিক সেই সময় একচাপট ঝুম বৃষ্টি নামলো। কেউ খাবার ঢাকতে গেলো, কেউবা বৃষ্টি থেকে বাঁচতে লেকের ছাতার নিচে দাঁড়ালো, কেউ আবার গাছের নিচে। এর মধ্যে কিছু মানুষ দৌড়ে বসার জন্য যে চাটাই (ত্রিপল) আনা হয়েছিলো ঐটাই উল্টো করে তার নিচে আশ্রয় নিলো। যার ফলে ঐই পরিস্থিতিতেও একটু হ্যাসরসের সৃষ্টি হলো যা সবাই অনেক উপভোগ করেছিলাম।
বেশ কিছুক্ষণ পর বৃষ্টি কমে গিয়ে হুট করে আবার রোদের দেখা মিললো। সেই সুযোগে সবাই খেয়ে নিলো। তারপর সবাই মিলে গোল হয়ে বসে একসাথে কিছুক্ষণ আড্ডা দেওয়া হলো। কেউ কেউ খালি গলায় সবাইকে গান শোনালো। বিশেষ করে তায়েবার গলায় কিছু মানুষ মরে যায় পঁচিশে গানটি খুবই প্রাণবন্ত ছিল। বৃষ্টির পরের রৌদ্র উজ্জ্বল, হালকা ঠান্ডা পরিবেশে এই আড্ডা বড়োই আনন্দময় লাগছিলো। তার উপর মীর মুগ্ধ সরোবরের মনোমুগ্ধকর পরিবেশ, গাছপালা, লতাপাতার সৌন্দর্য মনে অন্য রকম এক আবেগ অনুভূতি তৈরি করছিল। হঠাৎ সবার চোখ আকাশের দিকে গেলে সবাই আশ্চর্য হয়ে চেয়ে থাকলো। বৃষ্টির পর রৌদ্রোজ্জ্বল আলোর কারণে আকাশে রংধনু উঠেছে। দেখতে বড্ড মনোমুগ্ধকর লাগছিল। রংধনুর সাত রং চারিদিকে অন্যরকম এক সোভা ছাড়াচ্ছিল। সবাই হা করে কিছুক্ষণ ঐদিকেই চেয়ে থাকলো। এর মাধ্যেই আবার আকাশটা কালো মেঘে ছেয়ে গেল। মনে হচ্ছিল ঝুম বৃষ্টি হবে। তাতে কি আসে যায়? সবাই মনে মনে বৃষ্টিতে ভেজার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। হঠাৎ করে বৃষ্টিও নামলো। অনেকে দুহাত ছড়িয়ে অনেকটা ফিল্মি স্টাইলে ভিজতে লাগলো। অনেকে ভিজতে ভিজতে হলে কিংবা মেসে চলে গেল।আর এভাবেই আকস্মিক চড়ুইভাতি আকস্মিক বৃষ্টির মধ্যে দিয়ে শেষ হলো।
এক চড়ুইভাতিতে একসাথে প্রকৃতি মানুষের এই যোগসূত্র, হাসি-মজা, ফটোসেশন, আলো আঁধারের খেলা আসলেই আমাদের চড়ুইভাতিকে অনন্য এক মাত্রা দিয়েছিলো। যা হয়তো স্মৃতির পাতায় থেকে যাবে যুগের পর যুগ। কোন একদিন হয়তো এসব ভেবে মৃদু হাসি ফুটে উঠবে ঠোঁটের কোনায়। হৃদয় হয়তো চাইবে আকস্মিক অনাড়ম্বর চড়ুইভাতির আকস্মিক বৃষ্টিতে আবার সেই চাটাইয়ের নিচে স্থান নিতে কিংবা মুক্ত পাখির মতো ভিজতে। কিন্তু জীবন হয়তো তখন বড্ড কৃত্রিমতায় ছেয়ে যাবে শুধু স্মৃতিতে রবে আকস্মিক চড়ুইভাতির আকস্মিক বৃষ্টি।

