বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

আমরা এমন একটি বাংলাদেশ দেখতে চাই

Author

তারেক আল মুনতাছির , কক্সবাজার সরকারি কলেজ

প্রকাশ: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পাঠ: ৭০৭ বার

 

তারেক আল মুনতাছির ▷

একটি দেশের ভাগ্য ললাটে কী লেখা আছে, তা বোঝা যায় সেই দেশের সাধারণ মানুষের চোখের দিকে তাকালে। আমাদের মতো নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে প্রতিটি সাধারণ নির্বাচনের পর জনগণের মধ্যে এক বিশাল আশার সঞ্চার হয়। মানুষ স্বপ্ন দেখে একটি স্বচ্ছ, দুর্নীতিমুক্ত, বৈষম্যহীন এবং বাসযোগ্য সুন্দর বাংলাদেশের। আমরা এমন একটি রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখি যেখানে প্রতিটি নাগরিকের অধিকার সুরক্ষিত থাকবে, যেখানে শিক্ষা হবে জাতির মেরুদণ্ড আর মেধা হবে অগ্রগতির একমাত্র মাপকাঠি। আমাদের এই প্রত্যাশাগুলো আকাশকুসুম কোনো গল্প নয়। নাগরিক হিসেবে আমাদের ন্যূনতম অধিকার। আজ সময় এসেছে সেই অধিকার ও প্রত্যাশাগুলোকে একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোয় এনে নীতিনির্ধারকদের সামনে তুলে ধরার।

নির্বাচনের সময় আমাদের দেশের হাজার হাজার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। উৎসবমুখর পরিবেশে মানুষ সেখানে গিয়ে তাদের রায় দিয়ে আসে। কিন্তু আক্ষেপের বিষয় হলো, নির্বাচনের ডামাডোল শেষ হলে সেই স্কুলগুলোর ভগ্নদশা আর কেউ দেখে না। অনেক এলাকায় দেখা যায় স্কুলের ছাদ দিয়ে পানি পড়ছে, বেঞ্চ নেই, কিংবা জরাজীর্ণ ভবনে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শিশুরা ক্লাস করছে। আমাদের প্রথম দাবি হলো নির্বাচন পরবর্তী সময়ে প্রতিটি নির্বাচনী এলাকার স্কুলগুলোকে মেরামত করতে হবে। যেখানে প্রয়োজন সেখানে নতুন ভবন নির্মাণ করতে হবে। ডিজিটাল ল্যাব থেকে শুরু করে আধুনিক স্যানিটেশন ব্যবস্থা সবই থাকতে হবে এই স্কুলগুলোতে। কারণ, পরিবেশ সুন্দর না হলে মানসম্মত শিক্ষা কখনো সম্ভব নয়।

ভবন থাকলেই শিক্ষা হয় না, শিক্ষার প্রাণ হলো শিক্ষক। বর্তমানে আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম বড় দুর্বলতা হলো তীব্র শিক্ষক সংকট। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে এমন অনেক স্কুল আছে যেখানে মাত্র দুই একজন শিক্ষক দিয়ে পুরো স্কুল চালানো হচ্ছে। এটি মুঠেও কাম্য নয়। আমরা চাই দ্রুততম সময়ে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় শিক্ষক নিয়োগ সম্পন্ন করা হোক। ​একইসাথে প্রাথমিক শিক্ষকদের জন্য ‘অ্যাডভান্সড ট্রেনিং’ বা উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। মনে রাখতে হবে, একটি শিশু শৈশবে যা শেখে, তা-ই তার সারাজীবনের পাথেয় হয়। শিক্ষকরা যদি আধুনিক পাঠদান পদ্ধতি, শিশু মনস্তত্ত্ব এবং তথ্যপ্রযুক্তি সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান না রাখেন, তবে তারা আগামী প্রজন্মকে সঠিক দিশা দিতে পারবেন না। উন্নত বিশ্বের মতো আমাদের শিক্ষকদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক মর্যাদা বৃদ্ধি করতে হবে যাতে মেধাবীরা এই পেশায় আসতে আগ্রহী হয়। পাশাপাশি, প্রতি বছর বাজেটে শিক্ষা খাতকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। আমরা চাই শিক্ষা খাতে জাতীয় বাজেটের একটি বড় অংশ বরাদ্দ করা হোক। গবেষণাগার তৈরি, লাইব্রেরি সমৃদ্ধ করা এবং দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির আওতা বাড়াতে এই অর্থ ব্যয় হওয়া প্রয়োজন।​ পাশাপাশি একটি কঠিন কিন্তু জরুরি সিদ্ধান্ত নিতে হবে তা হলো ‘স্কুল রাজনীতি বর্জন’। কোমলমতি শিশুদের পাঠ্যবই ছেড়ে মিছিলে বা দলীয় কর্মসূচিতে ব্যবহার করা একটি জাতির জন্য আত্মঘাতী। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হোক কেবলই জ্ঞানচর্চা এবং মেধার বিকাশের জায়গা। দলীয় রাজনীতির লেজুড়বৃত্তি থেকে স্কুলগুলোকে মুক্ত রাখা গেলে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরে আসবে।

একটি সুস্থ ও কার্যকর গণতন্ত্রের জন্য মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অপরিহার্য। মানুষ যখন ভয়হীনভাবে নিজের কথা বলতে পারে এবং গণমাধ্যম যখন কোনো চাপ ছাড়াই রাষ্ট্রের ভুলত্রুটি বা দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরতে পারে, তখনই রাষ্ট্র সঠিক পথে চলে। কোনো বিশেষ আইন বা অদৃশ্য ভয়ে যদি সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ করা হয়, তবে সমাজে অন্ধকারের রাজত্ব কায়েম হয়। আমরা চাই এমন এক বাংলাদেশ, যেখানে গঠনমূলক সমালোচনাকে শত্রুতা হিসেবে দেখা হবে না। গণমাধ্যম হবে সরকারের আয়না, যা ভুলগুলো সংশোধন করে রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।

বিগত বছরগুলোর অব্যবস্থাপনার লাল দশা কাটাতে সংসদ সদস্যদের পেশাগত দক্ষতা অনুযায়ী দায়িত্ব দেওয়া জরুরি। একজন ডাক্তারকে স্বাস্থ্য, প্রকৌশলীকে অবকাঠামো বা অর্থনীতিবিদকে অর্থ খাতের দায়িত্ব দিলে কাজের গতি ও স্বচ্ছতা বাড়বে। সঠিক মানুষ সঠিক জায়গায় থাকলে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমে এবং জনসেবা নিশ্চিত হয়। নির্বাচনী ইশতেহার কেবল ভোটের প্রচারতে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। এটি জনগণের সাথে একটি চুক্তি। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ করার স্বাধীন পরিবেশ ও প্রয়োজনীয় বরাদ্দ দিতে হবে। ইশতেহার অনুযায়ী কাজ করার সুযোগ থাকলে উন্নয়ন টেকসই হবে এবং রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা তৈরি হবে।

দুর্নীতি আমাদের উন্নয়নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা। সরকারি প্রতিটি দপ্তরে সাধারণ মানুষ যেন হয়রানি ছাড়া সেবা পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা থাকা জরুরি। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জনগণের সেবক, মালিক নন এই মানসিকতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা (Zero Tolerance) প্রমাণ করতে হবে। বড় বড় রাঘববোয়াল থেকে শুরু করে তৃণমূলের অনিয়ম সবকিছুর বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। আমাদের তরুণ প্রজন্মের সবচেয়ে বড় আক্ষেপের জায়গা হলো নিয়োগ প্রক্রিয়া। বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম করেও অনেক মেধাবী তরুণ বেকার থাকছে, কারণ তাদের কোনো ‘প্রভাবশালী আত্মীয় মামা – চাচা – খালু বা রাজনৈতিক সুপারিশ নেই। এই ‘মামা-চাচা-খালুর’ তদবির সংস্কৃতি মেধাবীদের দেশত্যাগে বাধ্য করছে। আমরা চাই, রাষ্ট্র নিশ্চিত করুক যে প্রতিটি চাকরি হবে কেবল মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে। মেধাভিত্তিক নিয়োগ ও পদোন্নতি নিশ্চিত করা গেলে প্রশাসনে যেমন গতি ফিরবে, তেমনি তরুণদের মধ্যে রাষ্ট্রপ্রেম বৃদ্ধি পাবে। আমাদের বিশাশ জনগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের কেবল সার্টিফিকেটধারী শিক্ষিত বেকার না বানিয়ে তাদের জন্য জেলা-উপজেলা পর্যায়ে দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। ফ্রিল্যান্সিং, কারিগরি কাজ, আধুনিক কৃষি বা প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তরুণদের স্বাবলম্বী করতে হবে। তরুণরা যখন কাজ পাবে এবং সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখবে, তখনই তাদের মাদক ও অপরাধের অন্ধকার জগত থেকে দূরে রাখা সম্ভব হবে। আবার পাড়া-মহল্লায় মাদকের বিস্তার বন্ধ করতে হলে কেবল সেবনকারী নয়, মূল সরবরাহকারীদের ধরতে হবে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে কোনো রাজনৈতিক প্রভাব ছাড়াই স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে। অপরাধী যে দলেরই হোক, তার পরিচয় যেন হয় কেবল ‘অপরাধী’। জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সন্ত্রাসমুক্ত সমাজ গড়া সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত বলে মনে করি।

আমাদের দেশে দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গা সমস্যা আমাদের কাঁধে চেপে আছে। মানবিক কারণে আমরা তাদের আশ্রয় দিয়েছি ঠিকই, কিন্তু এর ফলে আমাদের অর্থনীতি, পরিবেশ এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে। এই সমস্যার সমাধানে সরকারকে আন্তর্জাতিক মহলে আরও জোরালো ও তৎপর কূটনৈতিক ভূমিকা পালন করতে হবে। দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। বিশ্ব সম্প্রদায়ের ওপর এমন চাপ সৃষ্টি করতে হবে যাতে মিয়ানমার তাদের নাগরিকদের ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়।

শহরমুখী মানুষের চাপ কমাতে গ্রামীণ পর্যায়ে চিকিৎসা সুবিধা সম্প্রসারণ করতে হবে। যেসব উপজেলাতে ২৫, ৫০ কিংবা ১০০ শয্যা বিশিষ্ট সেগুলোকে ২৫০ শয্যা করে পূর্ণ সেবা দিতে হবে। প্রতিটি উপজেলা ও ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যেন প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম এবং ডাক্তার থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে। গ্রামের দরিদ্র মানুষ যেন সামান্য চিকিৎসার জন্য জেলা বা বিভাগীয় শহরে দৌড়াতে না হয়। অন্যদিকে, আমাদের রেমিট্যান্স যোদ্ধারা বিদেশের মাটিতে কঠোর পরিশ্রম করেন। তাদের আইনি সুরক্ষা এবং বিদেশের দূতাবাসে যেন তারা সম্মান ও সহযোগিতা পান, সেটি সরকারকে গুরুত্বের সাথে দেখতে হবে। বিমানবন্দরে তাদের হয়রানি বন্ধ করে প্রকৃত ভিআইপি মর্যাদা দিতে হবে। আইনের শাসন এমন হতে হবে যেন উঁচু-নিচু নির্বিশেষে সকল নাগরিক সমান বিচার পায়। প্রভাবশালীদের জন্য এক আইন আর গরিবের জন্য অন্য আইন এমন বৈষম্য একটি রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়। বিচার বিভাগকে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে। মানুষ যেন মনে করে যে শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে সে আদালতে গিয়ে ন্যায়বিচার পাবে।

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি হলো অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। একটি সরকারের মেয়াদের শেষে যেন অত্যন্ত স্বচ্ছভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে মানুষ কোনো ভয়ভীতি ছাড়াই তার পছন্দের প্রতিনিধিকে ভোট দিতে পারবে। ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমেই নাগরিকরা রাষ্ট্রের অংশীদার হয়ে ওঠে। ​আমরা যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি, তা কোনো একক দলের বা গোষ্ঠীর নয়, তা ১৬ কোটি মানুষের। উন্নয়ন আর সুশাসন যদি হাত ধরাধরি করে চলে, তবেই আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সার্থক হবে। আমরা চাই মেধার মূল্যায়ন, দুর্নীতির অবসান এবং একটি সুন্দর আগামীর নিশ্চয়তা। সরকার যদি জনগণের এই নাড়ির স্পন্দন বুঝতে পারে, তবেই দেশ সত্যিকারের সোনার বাংলায় পরিণত হবে।

লেখক: সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!