সময় বদলালেই কি বদলায় বাংলাদেশ?

তারেক আল মুনতাছির ▷
বিদায়ী বছর কি সত্যিই ভালো গেল? এই প্রশ্নের উত্তর এককথায় দেওয়া কঠিন। কারও কাছে বছরটি ছিল প্রাপ্তির, আবার অনেকের কাছে হতাশা, ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তার। তবুও সময়ের নিয়মে একটি বছর বিদায় নেয়, আর নতুন বছর কড়া নাড়ে সম্ভাবনার দুয়ারে। ২০২৬ সাল আমাদের সামনে হাজির হতে যাচ্ছে নতুন স্বপ্ন, নতুন প্রত্যাশা এবং নতুন দায়িত্ব নিয়ে। নতুন বছরের শুরুতেই হতে চলেছে বহু প্রত্যাশিত জাতীয় নির্বাচন। এটি জাতির ভবিষ্যৎ পথচলার দিকনির্দেশ নির্ধারণের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। নতুন বছরে আমরা চাই অপূর্ণতার ঝুলি ভরে উঠুক পূর্ণতায়। তবে সেই পূর্ণতা কেবল আশা করলেই আসে না। সত্যিকারের নতুন দিন আনতে হলে নিজেকেও বদলাতে হয়, সংগ্রাম করতে হয়। সততা, শ্রম ও আন্তরিকতা এই তিনটি গুণ ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি স্তরে কার্যকর হলে বদলে যেতে পারে সমাজের চিত্র। ২০২৬-কে আমরা দেখতে চাই ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য শান্তি, সম্প্রীতি ও সমৃদ্ধির বছর হিসেবে, যেখানে বিভাজনের রাজনীতি নয়, মানবিকতা ও ন্যায়ের রাজনীতি প্রাধান্য পাবে।
দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান জনগণের পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাকে নতুনভাবে সামনে এনে দেয়। অনেকেই এটিকে কেবল ক্ষমতার পালাবদল হিসেবে দেখেননি, দেখেছেন নতুন সম্ভবনার প্রতীক গিসেবে। সাধারণ মানুষ আশা করেছিল এবার স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠিত হবে, জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে এবং নৈতিক নেতৃত্ব রাজনীতিতে জায়গা করে নেবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, পুরোনো কাঠামো ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক মানসিকতা এখনো রাজনীতির ভেতরে দৃঢ়ভাবে বিদ্যমান। পরিবর্তনের পথ তাই সহজ হয়নি। রাজনীতির সমালোচনা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার একটি অপরিহার্য উপাদান। সমালোচনার মাধ্যমে শাসকগোষ্ঠীর সিদ্ধান্ত, নীতি ও কার্যক্রম জনসমক্ষে প্রশ্নের মুখে পড়ে। এতে ক্ষমতার অপব্যবহার কমে এবং জনগণের অধিকার রক্ষার পথ সুগম হয়। সমালোচনা দমন করা হলে রাজনীতি একমুখী ও কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠে, যা রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর। একই সঙ্গে একটি শক্তিশালী ও কার্যকর বিরোধী দল ছাড়া সুস্থ রাজনীতি কল্পনা করা যায় না। বিরোধী দল সরকারের ভুল-ত্রুটি তুলে ধরে, বিকল্প নীতি প্রস্তাব করে এবং সংসদ ও রাজপথে জনগণের কণ্ঠস্বর হিসেবে ভূমিকা রাখে। শক্তিশালী বিরোধী উপস্থিত থাকলে সরকার আরও দায়িত্বশীল হয় এবং গণতন্ত্র টিকে থাকে শক্ত ভিত্তির ওপর।
আবার, শিক্ষাব্যবস্থা যদি কেবল পরীক্ষার নম্বর তৈরির কারখানা হয়ে থাকে, তবে আমরা সচেতন নাগরিক পাব না। স্বাস্থ্যব্যবস্থা যদি বৈষম্যপূর্ণ হয়, তবে উন্নয়ন কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে। সংস্কৃতি যদি সংকীর্ণতা ও বিদ্বেষের শিকার হয়, তবে জাতির আত্মা দুর্বল হয়ে পড়বে। তাই ২০২৬ সালে আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে শিক্ষা মানুষ গড়বে, স্বাস্থ্যসেবা হবে অধিকার, আর সংস্কৃতি হবে মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক।
রাজনীতির বাইরে বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু অবহেলিত বিষয় হলো মানসিক স্বাস্থ্য ও জীবনের ভারসাম্য। অতিরিক্ত প্রতিযোগিতা, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ ও সামাজিক চাপ মানুষকে ধীরে ধীরে মানসিকভাবে ক্লান্ত করে তুলছে। এই ক্লান্তি অনেক সময় হতাশা, ক্ষোভ ও নীরব ভাঙনের জন্ম দেয়, যা পরিবার ও সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই মানসিক স্বাস্থ্যকে দুর্বলতা হিসেবে না দেখে সচেতনতার অংশ হিসেবে দেখা প্রয়োজন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে কাউন্সেলিং ও সহায়ক পরিবেশ গড়ে তোলা জরুরি। পরিবারে কথা বলার সুযোগ, শোনার মানসিকতা ও সহানুভূতির চর্চা বাড়াতে হবে।রমানুষ যদি মানসিকভাবে সুস্থ থাকে, তবে সে দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে পারে। একটি সুস্থ মনই পারে একটি স্থিতিশীল ও মানবিক বাংলাদেশ নির্মাণ করতে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে জনগণের কথা প্রায়ই বলা হয়, কিন্তু বাস্তবে তাদের ভূমিকা অনেক সময় উপেক্ষিত থেকে যায়। রাজনীতি এখনো অনেকাংশে ক্ষমতা দখল ও প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় সীমাবদ্ধ। জনগণ ভোটার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও নীতিনির্ধারণে তাদের অংশগ্রহণ সীমিত। এর ফলে রাজনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়, যা গণতন্ত্রের জন্য উদ্বেগজনক। তবুও আশার জায়গা রয়ে গেছে। মানুষ এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি সচেতন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, নাগরিক আন্দোলন ও তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ রাজনীতিতে নতুন প্রশ্ন তুলছে। তরুণ প্রজন্ম বুঝতে শুরু করেছে রাজনীতি কেবল কিছু নেতার একচেটিয়ার বিষয় নয়। এটি প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্বও বটে। তারা জবাবদিহিতা চায়, ন্যায়বিচার চায় এবং স্বচ্ছ রাষ্ট্রব্যবস্থার স্বপ্ন দেখে।
২০২৬ সালে আমরা এমন একটি বাংলাদেশ দেখতে চাই, যেখানে নীতিনিষ্ঠ নেতৃত্ব, স্বচ্ছ প্রশাসন এবং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে। দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দেশ ও মানুষের কল্যাণ রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হবে। নির্বাচন হবে অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক। মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে নিরাপদ। আইনের শাসন হবে বাস্তব ও কার্যকর। ২০২৪ সালের জুলাই আমাদের মনে করিয়ে দেয় স্থায়ী পরিবর্তন কখনো ওপর থেকে চাপিয়ে আসে না। তা আসে জনগণের সচেতনতা, চাপ ও সক্রিয় অংশগ্রহণ থেকে। যদি রাজনীতি সত্যিই জনকল্যাণের পথে ফিরে আসে, তবে ২০২৬ সাল সমাজগঠনের সূচনা হিসেবে ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

