মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন
হোম / ফিচার / নিবন্ধ

নীরবতা ও শান্তি ফিরে পায় শ্মশান ঘাটে

Author

প্রজ্ঞাজ্যোতি বড়ুয়া , হাজী এম এ কালাম সরকারি কলেজ

প্রকাশ: ১৪ মার্চ ২০২৬ পাঠ: ২৮৬ বার

  1. কোলাহলময় এই নশ্বর পৃথিবীতে মানুষের জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন হলো নীরবতা ও শান্তি। আমরা প্রতিনিয়ত জাগতিক মোহ আর প্রাপ্তির মোহে হন্যে হয়ে ছুটে চলি, কিন্তু জীবনের প্রকৃত নির্যাস লুকিয়ে আছে শান্ত সমাহিত হৃদয়ে। শ্মশান ঘাটের সেই চিরন্তন স্তব্ধতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সকল দৌড়ঝাঁপ শেষে প্রশান্তিই মানুষের সবচেয়ে বড় পাওনা। এই নীরবতাই মানুষের হৃদয়ে জ্বালিয়ে দেয় প্রকৃত ‘মানুষ’ হওয়ার সঠিক ‘নিধিশিখা’ এবং উন্মোচন করে সুখ ও সমৃদ্ধির শাশ্বত পথ।

    ​শ্মশান: এক দার্শনিক দর্পণ
    ​শ্মশান ঘাট কেবল নশ্বর দেহের অন্তিম গন্তব্য নয়, এটি জীবন দর্শনের এক মহাতীর্থ। যেখানে পৃথিবীর সমস্ত আভিজাত্য, অহংকার আর বৈষম্য চিতার আগুনে ভস্মীভূত হয়ে বাতাসে মিশে যায়।
    ​অসারতার বোধ: শ্মশানের জ্বলন্ত চিতা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, পার্থিব ধন-সম্পদ বা ক্ষমতা কতই না তুচ্ছ।
    ​সমতার পরম সত্য: এখানে এসে রাজা আর প্রজা, ধনী আর নির্ধন একই সমান্তরালে দাঁড়িয়ে পড়ে। এই চরম সত্যটি যখন মানুষের হৃদয়ে শান্তিপাত করে, তখনই জাগতিক অস্থিরতা থেকে মুক্তি মেলে।
    ​নীরবতা ও শান্তির ঐশ্বর্য
    ​নীরবতা মানে নিছক নিঃশব্দতা নয়, বরং এটি আত্মার এক গভীর উচ্চারণ। যখন বাইরের জগতের কোলাহল থেমে যায়, তখনই ভেতরের মানুষের সাথে প্রকৃত পরিচয় ঘটে।
    ​সুখ ও সমৃদ্ধির সোপান: প্রকৃত সুখ বাইরের বস্তুতে নয়, বরং মনের গহীনে থাকা স্থিরতায় নিহিত। শান্ত মন কখনো ভুল পথে পরিচালিত হয় না। নীরবতার গভীরে যে প্রশান্তি লুকিয়ে আছে, তা-ই মানুষকে সঠিক ও সৃজনশীল সিদ্ধান্ত নিতে উদ্বুদ্ধ করে—যা জীবনের প্রকৃত সমৃদ্ধি।
    ​সংযম ও আত্মশুদ্ধি: শ্মশানের নির্জনতা আমাদের শেখায় কীভাবে অপ্রয়োজনীয় সংঘাত থেকে দূরে থাকতে হয়। এই নীরব সাধনা মানুষের অন্তরাত্মাকে পবিত্র করে এবং তাকে জীবনের প্রকৃত লক্ষ্যের দিকে ধাবিত করে।
    ​মনুষ্যত্বের ‘নিধিশিখা’ বা চেতনার আলো
    ​মানুষ হওয়া আর মানবিক হওয়া এক কথা নয়। পশুর স্তর থেকে উঠে এসে প্রকৃত মানুষ হয়ে ওঠার জন্য প্রয়োজন বিবেকের জাগরণ।
    ​নিধিশিখার দীপ্তি: শ্মশানের সেই বৈরাগ্যময় নীরবতা আমাদের হৃদয়ে জ্ঞানের প্রদীপ বা ‘নিধিশিখা’ জ্বালিয়ে দেয়। এই আলোতেই মানুষ নিজের দোষ-ত্রুটি দেখতে পায় এবং ক্ষমাশীল হতে শেখে।
    ​সহমর্মিতার শিক্ষা: জীবনের শেষ পরিণতি উপলব্ধি করলে মানুষের প্রতি মানুষের মমত্ববোধ বেড়ে যায়। তখন অন্যের দুঃখে প্রাণ কাঁদে এবং পরার্থপরতাই জীবনের মূল মন্ত্র হয়ে দাঁড়ায়।
    ​পরিশেষে বলা যায়, শ্মশান ঘাট আমাদের জীবনের সেই দর্পণ, যেখানে তাকালে মোহমুক্ত এক শান্ত প্রতিচ্ছবি দেখা যায়। জীবনের সব দৌড়ঝাঁপ শেষে যেখানে মানুষ নীরবতা ও শান্তি ফিরে পায়, সেখানেই লুকিয়ে আছে বেঁচে থাকার পরম সার্থকতা। এই শান্তিই আমাদের শেখায় ঘৃণা ও বিবাদ ভুলে ভালোবাসার চাদরে বিশ্বকে জড়িয়ে ধরতে। শ্মশানের এই শাশ্বত শিক্ষাই হোক আমাদের আগামীর পথ চলার পাথেয়, তবেই বিকশিত হবে প্রকৃত মনুষ্যত্ব।

লেখক: সাধারণ সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!