বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

যে ভোটে মিশে আছে জুলাইয়ের কান্না আর আগামীর স্বপ্ন

Author

আব্দুল্লাহ আল নাঈম , চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পাঠ: ৮৩ বার

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক বাতাসে নতুন স্পন্দন। দীর্ঘ অপেক্ষার শেষে ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। যেখানে ভোট শুধু একটি প্রক্রিয়া নয়, বরং ভবিষ্যৎ নির্ধারণের পদ্ধতি। দলগুলো ইশতাহারে তুলে ধরছে উন্নয়ন ও রাষ্ট্রচিন্তার রূপরেখা, আর সেই আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে তরুণদের প্রত্যাশা। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের চোখে এই নির্বাচন গণতন্ত্রের মানদণ্ড নির্ধারণ করবে।

এই প্রেক্ষাপটে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫ নারী শিক্ষার্থী, যারা একই সঙ্গে চাকসু নির্বাচনে বিজয়ী প্রতিনিধি, তাদের ভাবনা ও প্রত্যাশা তুলে ধরেছেন। শিক্ষা, গণতন্ত্র ও উন্নয়নকে ঘিরে একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্রের কাছে তাদের চাওয়া স্পষ্ট ও দৃঢ়। আগামীর বাংলাদেশ কেমন হওয়া উচিত, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই এই লেখা। পাঠকের সামনে সেই কণ্ঠগুলোই তুলে ধরেছেন আব্দুল্লাহ আল নাঈম।

১. সহিংসতা সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে বড় বাধা

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন হওয়া উচিত পরিবর্তনের পক্ষে একটি গণতান্ত্রিক ও সুরক্ষিত প্রক্রিয়া। কোনো ক্ষমতার দাপটে দেশের শান্তি ও শৃঙ্খলা বিনষ্ট করার মাধ্যম নয়। নির্বাচনের পুরো সময়জুড়ে নাগরিকের জীবন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ভোটাধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব।

বর্তমানে ক্রমবর্ধমান খুন, সহিংসতা ও অরাজকতা সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে বড়ো বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভোটার যেন কোনো ভয়, হুমকি কিংবা প্রলোভন ছাড়াই স্বাধীনভাবে নিজের মত প্রকাশ করতে পারেন, এটি নিশ্চিত করা একটি কার্যকর গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত। কিন্তু নির্বাচনি সহিংসতা, গুজব, ডিজিটাল হয়রানি ও প্রশাসনিক পক্ষপাত নির্বাচন প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলছে। এই প্রেক্ষাপটে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরপেক্ষতা, নির্বাচন কমিশনের সক্রিয় ও কার্যকর ভূমিকা এবং শক্তিশালী বিচারিক জবাবদিহিতা অপরিহার্য। এসবের সমন্বিত প্রয়াসই আগামী নির্বাচনকে ফলপ্রসূ করবে এবং নাগরিকের গণতান্ত্রিক অধিকার সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

লেখিকা: নাহিমা আক্তার দ্বীপা, ছাত্রীকল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক, চাকসু।

 

২. নারীর ক্ষমতায়ন বনাম ডিজিটাল হুমকি

রাজনীতিতে নারীর উপস্থিতি নিয়ে বহুদিন ধরে একটি স্বস্তিদায়ক মিথ প্রচলিত—সংরক্ষিত আসন ও কোটা থাকলেই নাকি ক্ষমতায়ন সম্পন্ন। বাস্তবে এসব ব্যবস্থা নারীর রাজনৈতিক সক্ষমতাকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্র থেকে দূরে রাখে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর বদলে যাওয়া বাস্তবতায় নতুন প্রজন্ম স্পষ্টভাবে প্রশ্ন তুলছে, যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কেন নারী সাধারণ আসনে লড়াইয়ের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হবেন, কেন নেতৃত্ব মানেই উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া ক্ষমতা। এই প্রশ্ন এখন আর কেবল আলোচনায় সীমাবদ্ধ নয়, রাজপথে উচ্চারিত হচ্ছে।

তবে নারীরা সামনে এলে পরিকল্পিত ডিজিটাল সহিংসতা শুরু হয়—সাইবার বুলিং, চরিত্রহনন ও হুমকি দিয়ে তাদের দমিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলে। নির্বাচনকালীন সময়ে নারীর সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়, এটি গণতন্ত্র রক্ষার শর্ত। নারীকে প্রতীক নয়, সমান অংশীদার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েই ন্যায্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি গড়ে উঠতে পারে।

লেখিকা: তাহসিনা রহমান, সমাজসেবা ও পরিবেশ সম্পাদক, চাকসু।

 

৩. গণতন্ত্রের পথে একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর মানুষ গণতন্ত্রের পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন নিয়ে নতুনভাবে আশাবাদী হয়েছে। সেই বাস্তবতায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কোনো সাধারণ ঘটনা নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। এবার গণভোটের অন্তর্ভুক্তি নির্বাচনকে আরও অর্থবহ করেছে। গণভোট জনগণের নিজস্ব সিদ্ধান্ত জানানোর সুযোগ, যা ভয়, বিভ্রান্তি ও চাপের বাইরে থেকে প্রয়োগ করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী হিসেবে আমি মনে করি, এটি আমাদের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বড়ো পরীক্ষা।

কিন্তু দুঃখজনকভাবে নারীদের অংশগ্রহণ এখনও প্রত্যাশিত নয়। কিছু রাজনৈতিক দল নারী মনোনয়নই দেয়নি, যা অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। সর্বোপরি, ঘুস, ভয় ও গুজবের ঊর্ধ্বে উঠে সত্যকে সামনে আনার সঠিক সময় এখনই। যাকে ভোট দেব, তার কাজ, কথা ও চরিত্র বিচার করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমাদের সচেতন অংশগ্রহণই পারবে একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্র গড়ে তুলতে।

লেখিকা: জান্নাতুল ফেরদাউস রিতা, সহ-ছাত্রী কল্যাণ সম্পাদক, চাকসু।

 

৪. জুলাইয়ের রক্তে পাওয়া ভোটাধিকার

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সাধারণ কোনো নির্বাচন নয়। দীর্ঘ পনেরো বছর পর মানুষ তার ভোটাধিকার ফিরে পেতে যাচ্ছে। যে গণতান্ত্রিক পরিবেশ আজ দৃশ্যমান, তা এসেছে জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার রক্তের দামে, হাজারো আত্মত্যাগের বিনিময়ে। তাই এই নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকারের প্রতি জনগণের প্রত্যাশা স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেশি। মানুষ চায় এমন একটি সংসদ, যেখানে প্রতিনিধিরা জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে সততা ও দায়বদ্ধতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবেন।

একই সঙ্গে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বলে জনগণ রাষ্ট্রের মালিকানা নিজেদের হাতে তুলে নেবে, আর কোনো স্বৈরাচারকে ফিরে আসার সুযোগ দেবে না। দুর্নীতি, অবিচার ও জুলুমমুক্ত একটি বাংলাদেশ গড়তে হলে যোগ্য ও সৎ মানুষদেরকেই সংসদে পাঠাতে হবে। এই নির্বাচন সেই ঐতিহাসিক দায়িত্বেরই পরীক্ষা।

লেখিকা: জান্নাতুল আদন নুসরাত, সহ-দপ্তর সম্পাদক, চাকসু।

 

৫. ব্যালটের শক্তিতেই রচিত হবে আগামীর বাংলাদেশ

১২ ফেব্রুয়ারি আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আমাদের জন্য শুধু একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়—এটি ভবিষ্যৎ গঠনের এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হল সংসদের একজন ভিপি হিসেবে আমি বিশ্বাস করি, ভোট মানে কেবল অধিকার নয়, এটি এক মজবুত দায়িত্ব।

গণভোটের চেতনাকে সম্মান করে আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে বিবেক, জ্ঞান ও দেশের স্বার্থকে সামনে রেখে। আবেগ নয়, যুক্তি ও তথ্যের আলোয় পথ বেছে নেওয়াই আজ সবচেয়ে জরুরি। তরুণদের অংশগ্রহণই পারে দুর্নীতি, বৈষম্য ও হতাশার বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে।

আমরা যদি প্রশ্ন করতে শিখি, দাবি তুলতে শিখি, তবে নেতৃত্বও হবে জবাবদিহিমূলক। শান্তিপূর্ণ ও সচেতন অংশগ্রহণই গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে। আগামীর বাংলাদেশ গড়তে হলে ভোটকে ভয় নয়, আশা হিসেবে দেখতে হবে। দায়িত্বশীল নাগরিকত্বই পারে দেশকে এগিয়ে নিতে। আজকের সিদ্ধান্তই লিখবে আগামীর ইতিহাস।

লেখিকা: ফাইরোজ ফেরদৌস। ভিপি, শামসুন নাহার হল সংসদ, চাকসু।

লেখক: সম্পাদকীয় পর্ষদ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে অনলাইন গণমাধ্যম পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!