আনন্দে ভরা শৈশবের রমজান
আনন্দে ভরা শৈশবের রমজ
রমজান মাস এলেই মনে পড়ে যায় শৈশবের সেই সরল, নির্মল আর আনন্দে ভরা দিনগুলোর কথা। তখন রোজার প্রকৃত তাৎপর্য হয়তো পুরোপুরি বুঝতাম না, কিন্তু রমজান এলেই মনে হতো যেন ঘরে ঘরে এক বিশেষ আনন্দের আবহ তৈরি হয়েছে। চারদিকে ভিন্নরকম এক পবিত্রতা আর উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ত, যা শৈশবের মনে দারুণ আনন্দ জাগাত।
ভোররাতে সেহরির সময় ছিল শৈশবের রমজানের অন্যতম মজার মুহূর্ত। মায়ের স্নেহভরা ডাকে ঘুম ভাঙা, আধো ঘুমে উঠে বসা আর পরিবারের সবার সঙ্গে একসাথে সেহরি খাওয়ার সেই স্মৃতি আজও হৃদয়ে গেঁথে আছে। অনেক সময় পুরো রোজা রাখতে না পারলেও সেহরিতে উঠে বসার আনন্দটাই ছিল আলাদা। তখন মনে হতো আমরাও বড়দের মতো রোজা রাখার এক বিশেষ দায়িত্ব পালন করছি।
দিনভর স্কুল, খেলাধুলা আর বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাতে কাটাতে কখন যে বিকেল হয়ে যেত, তা টেরই পাওয়া যেত না। বিকেলের দিকে শুরু হতো ইফতারের প্রস্তুতি। ঘরের ভেতর ভেসে আসত নানা রকম খাবারের সুগন্ধ। ছোলা, পেঁয়াজু, বেগুনি, মুড়ি, খেজুর, শরবত কিংবা মিষ্টি জাতীয় খাবার—সব মিলিয়ে ইফতারের টেবিল হয়ে উঠত আকর্ষণীয়। আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতাম কখন মুয়াজ্জিন মাগরিবের আজান দিবে।
আজানের ধ্বনি শোনার সঙ্গে সঙ্গেই সবাই মিলে ইফতার করার সেই মুহূর্তে ছিল এক অনন্য আনন্দ ও প্রশান্তি। পরিবারের সবাই একসাথে বসে খাওয়ার মধ্যে ছিল ভালোবাসা আর আন্তরিকতার এক সুন্দর বন্ধন। ইফতারের পর বাবা-ভাইদের সাথে মসজিদে দিকে রওনা দিতাম, তারাবির নামাজ পড়তে। কখনো নামাজে দাঁড়াতাম, আবার কখনো বন্ধুদের সঙ্গে মসজিদের আঙিনায় খেলাধুলা করতাম। সেই সময়টুকু ছিল মুক্ত আনন্দের এক আলাদা জগৎ।
রমজানের রাতগুলোও ছিল খুবই প্রাণবন্ত। চারদিকে মানুষের চলাফেরা, মসজিদের আলো, কোরআন তিলাওয়াতের ধ্বনি—সব মিলিয়ে এক পবিত্র পরিবেশ তৈরি হতো। আমাদের কাছে এটি ছিল নতুন এক অভিজ্ঞতা, যা হৃদয়ে গভীর ছাপ রেখে যেত।
সময়ের সাথে সাথে মানুষ বড় হয়, দায়িত্ব বাড়ে, জীবনের ব্যস্ততাও বেড়ে যায়। কিন্তু শৈশবের সেই রমজানের স্মৃতিগুলো কখনো মুছে যায় না। সেই সরল আনন্দ, পরিবারের সান্নিধ্য আর বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলো আজও মনে করিয়ে দেয়—শৈশব কতটা সুন্দর ছিল।
আসলে শৈশবের রমজান শুধু একটি মাসের স্মৃতি নয়, এটি আমাদের জীবনের এক অমূল্য অধ্যায়। সেই দিনগুলোর সরলতা, ভালোবাসা আর আনন্দ আজও মনে এক ধরনের প্রশান্তি এনে দেয়। তাই যত সময়ই পেরিয়ে যাক না কেন, শৈশবের রমজান আমাদের হৃদয়ের গভীরে চিরকাল আনন্দের আলো হয়ে জ্বলতে থাকবে।
লেখক: সাধারণ সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।

