বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

উৎসব আমেজে তারুণ্যের বৈশাখ

Author

মোফাজ্জল হোসেন , ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

প্রকাশ: ১১ এপ্রিল ২০২৬ পাঠ: ১৫ বার

শিক্ষাঙ্গনে বৈশাখের গুরুত্ব

পহেলা বৈশাখ কোনো সাধারণ উৎসব নয়, এটি বাঙালির সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের প্রকাশ এবং আত্মপরিচয়ের এক স্পষ্ট ঘোষণা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই পরিচয় কি আজও সমানভাবে টিকে আছে, নাকি আধুনিকতার চাপে ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাচ্ছে? ঠিক এই জায়গাতেই শিক্ষাঙ্গনে বৈশাখের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।
সম্রাট আকবর-এর সময় প্রবর্তিত বাংলা সন মূলত কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিকে সংগঠিত করার একটি বাস্তব উদ্যোগ ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি শুধু একটি ক্যালেন্ডার নয়, বরং বাঙালির জীবনযাপন, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির প্রতিফলনে পরিণত হয়েছে। অথচ আজকের শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ এই ইতিহাস, এই প্রেক্ষাপট সম্পর্কে প্রায় অজ্ঞ। ফলে তারা উৎসব দেখে, কিন্তু তার ভেতরের দর্শনটি বুঝতে পারে না।
গ্রামবাংলার ঐতিহ্য যেমন রথ, পালকি, ঢোল, কাঁসর কিংবা পান্তা ইলিশ ও বৈশাখী মেলা এখন ধীরে ধীরে প্রতীকী হয়ে যাচ্ছে। শহুরে আয়োজনের চকচকে উপস্থাপনার আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে প্রকৃত সংস্কৃতির গভীরতা। একইভাবে হালখাতা কিংবা কৃষকের নতুন ফসল ঘরে তোলার মতো বিষয়গুলোও এখন পাঠ্যজ্ঞান থেকে বিচ্ছিন্ন। এর ফলে নতুন প্রজন্ম তাদের সংস্কৃতিকে অনুভব করার বদলে কেবল প্রদর্শনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখছে।
এই বাস্তবতায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো যদি শুধু সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করেই দায় সারে, তবে তা হবে দায়িত্ব এড়ানোর আরেকটি অজুহাত মাত্র, বরং প্রয়োজন পাঠক্রমভিত্তিক আলোচনা, গবেষণা এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে বৈশাখকে তুলে ধরা।
ভিন্নধর্মী সংস্কৃতি ও অন্য জাতির নববর্ষে ডুবে থেকে নিজ দেশের ইতিহাস শিকড় ও ঐতিহ্যকে ভুলে গেলে তো হবে না,
কারণ সাংস্কৃতিক শিকড় সম্পর্কে জ্ঞান না থাকলে বৈশ্বিক নাগরিক হওয়ার দাবিও ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। যে জাতি নিজ দেশের ঐতিহ্য সংস্কৃতি শিকড় সম্পর্কে ধারণা রাখে না তার পরবর্তী প্রজন্ম থেকে ধীরে ধীরে তার বিলুপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।
তাই শিক্ষাঙ্গনে পহেলা বৈশাখের চর্চা শুধু ঐতিহ্য রক্ষার জন্য নয়, বরং একটি সচেতন, আত্মপরিচয়সম্পন্ন প্রজন্ম গড়ার জন্য অপরিহার্য। এখন প্রশ্ন একটাই, আমরা কি আমাদের সংস্কৃতিকে জানার চেষ্টা করব, নাকি শুধু একদিনের উৎসবে সীমাবদ্ধ রেখে ধীরে ধীরে ভুলে যাব?

ফিয়াদ নওশাদ ইয়ামিন
শিক্ষার্থী,কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

 

বৈশাখে পান্তা-ইলিশ :ঐতিহ্য না বিলাসিতা?

পহেলা বৈশাখ বাঙালি সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। অতীতের দুঃখ ভুলে নতুন করে জীবনকে সাজানোর অনুপ্রেরণা নিয়ে পহেলা বৈশাখ উদযাপিত হয়। পহেলা বৈশাখ উদযাপনের প্রসঙ্গ এলেই সবার আগে পান্তা-ইলিশের কথা আসে। কিন্তু ইতিহাসে পহেলা বৈশাখের সাথে পান্তা-ইলিশ খাওয়ার কোন সম্পর্ক নেই। ভাত প্রাচীনকাল থেকেই এদেশের মানুষের প্রধান খাদ্য এবং অতীতে ভাত সংরক্ষণের জন্য ভাতে জল দিয়ে পান্তা করা হত। দরিদ্র কৃষকেরা পরদিন সকালে সেই পান্তা খেয়েই কাজে বের হতেন। সে হিসেবে পান্তাভাত বাঙালির হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। কিন্তু পান্তার সঙ্গে ইলিশ খাওয়ার প্রচলন প্রাচীন বাংলা থেকে আসেনি। মূলত এই পান্তা ইলিশের প্রচলনের পিছনে রয়েছে ব্যবসায়ীক মনোবৃত্তি। একটা ব্যবসায়ীক মহল নিজেদের স্বার্থে পান্তা ইলিশ সংস্কৃতির প্রসার ঘটায়। তাছাড়া আশির দশকে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের সময় পহেলা বৈশাখে বর্ষবরণকে কেন্দ্র করে পান্তা-ইলিশের বিক্রি হয়। সেই আশির দশক থেকেই পান্তা-ইলিশ আরো জনপ্রিয় হয়ে উঠতে থাকে। সময়ের পরিক্রমায় পান্তা ইলিশ হয়ে দাঁড়ায় বাঙালিয়ানার অন্যতম অনুষঙ্গ। প্রথমদিকে ইলিশ মাছের দাম কম থাকায় অনেকেই খেতে পারতো। কিন্তু সময়ের সঙ্গে ইলিশ হয়ে উঠে সোনার হরিণ। যা মধ্যবিত্ত কিংবা নিম্নবিত্তের সাধ্যের বাইরে। কাজেই পান্তা-ইলিশে বর্ষবরণ কখনোই বাঙালি সংস্কৃতি নয়। বরং এটি সংস্কৃতিকে ঘিরে তৈরি ব্যবসায়িক বুদ্ধি। যা বর্তমানে বিলাসিতারই নামান্তর।

জাইমা নাজাহ
শিক্ষার্থী, ইডেন মহিলা কলেজ

 

বাঙালির সংস্কৃতিতে বৈশাখ কতটা সম্পৃক্ত

বাঙালির সংস্কৃতিতে বৈশাখ অবিচ্ছেদ্যভাবে সম্পৃক্ত। এটি শুধু একটি মাস বা নববর্ষের শুরু নয়, বরং বাঙালি জাতির ঐতিহ্য, অসাম্প্রদায়িক চেতনা, কৃষি-নির্ভর জীবন ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতীক।
বৈশাখের উৎপত্তি মুঘল সম্রাট আকবরের আমলে। কৃষকদের খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে তিনি সৌরভিত্তিক বাংলা সন প্রবর্তন করেন, যা ফসলি সন নামে পরিচিত হয়। জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফতেহউল্লাহ সিরাজির তত্ত্বাবধানে এই পঞ্জিকা তৈরি হয়। বাংলাদেশে ১৪ এপ্রিল এবং পশ্চিমবঙ্গে ১৫ এপ্রিল (পঞ্জিকা অনুসারে) পালিত হয় এই উৎসব।
বৈশাখ বাঙালি সংস্কৃতির অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক চেতনার বহিঃপ্রকাশ। এটি ধর্মীয় নয়, বরং লোকায়ত ঐতিহ্যের উৎসব। এই দিন বাঙালিরা নতুন পোশাকে সেজে ওঠে।খাবারের মধ্যে পান্তা ভাত, ইলিশ মাছ, শুঁটকি, বিভিন্ন ভর্তা ও মিষ্টান্নের আয়োজন থাকে। হালখাতা উৎসবের মাধ্যমে ব্যবসায়ীরা পুরনো হিসাব বন্ধ করে নতুন খাতা খোলেন, যা নতুন শুরুর প্রতীক।
বৈশাখ বাঙালির জীবনে নতুন আশা ও পুনর্জন্মের বার্তা বয়ে আনে। এটি অতীতের গ্লানি ভুলে নতুন করে শুরু করার সুযোগ দেয়। কৃষিপ্রধান বাংলায় বৈশাখ ফসল তোলার মৌসুমের সঙ্গে যুক্ত, তাই এর সঙ্গে জড়িত প্রকৃতি ও ঋতুর পরিবর্তন।
সার্বিকভাবে বলা যায়, বৈশাখ বাঙালির সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত-এটি আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও জীবনবোধের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

শহীদ মুনতাসীর
শিক্ষার্থী, মানারাত আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়

 

বৈশাখ; নব-জাগরণের আহ্বান

বৈশাখ বাঙালির জীবনে নবজাগরণের অমলিন প্রতীক। বাংলা সনের প্রথম মাস হিসেবে এটি আমাদের মনে জাগিয়ে তোলে নতুন সূচনার অনাবিল আনন্দ। পুরোনো বছরের সকল গ্লানি, দুঃখ ও ব্যর্থতাকে বিদায় জানিয়ে আমরা স্বাগত জানাই এক নির্মল ভবিষ্যৎকে। প্রকৃতিও যেন এ সময় নতুন রূপে সেজে ওঠে- ঝরা পাতার মাঝে জন্ম নেয় কচি সবুজ, আর সেই সজীবতার ছোঁয়া লাগে মানুষের মনেও।
পহেলা বৈশাখ উদযাপনের মাধ্যমে আমরা আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে গভীর বন্ধনে আবদ্ধ হই। এই দিনটি কেবল উৎসবের নয়, বরং আত্মপরিচয়েরও। গ্রামবাংলার বৈশাখী মেলা, হালখাতার রীতি, আর শহরের মঙ্গল শোভাযাত্রা- সব মিলিয়ে এটি হয়ে ওঠে সার্বজনীন মিলনমেলা। ধনী-গরিব, ছোট-বড়, সকল ভেদাভেদ ভুলে মানুষ একত্রিত হয় আনন্দের বন্ধনে।
বৈশাখ উদযাপনের মধ্যে লুকিয়ে আছে ঐক্যের শক্তি ও নবচেতনার আহ্বান। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—জীবন মানেই পরিবর্তন, আর প্রতিটি নতুন সূচনা নিয়ে আসে নতুন সম্ভাবনা। তাই বৈশাখ কেবল একটি মাস নয়, এটি বাঙালির প্রাণের স্পন্দন, আশা ও স্বপ্নের উজ্জ্বল প্রতীক।

নুর নাহার মিম
শিক্ষার্থী, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

 

বৈশাখ কেন আমরা উদযাপন করি

পহেলা বৈশাখ আমরা উদযাপন করি মূলত নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যেকে ধরে রাখতে এবং আনন্দ ভাগাভাগি করতে। বাংলা নববর্ষের প্রথম দিনে আমরা পুরোনো দুঃখ-কষ্ট ভুলে নতুনভাবে জীবন শুরু করার আকাঙ্ক্ষা তৈরি করি।
এটি আমাদের বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম বড় উৎসব। বাংলা বর্ষের এই প্রথম দিনে আমরা আমাদের ঐতিহ্যকে জীবিত রাখতে “মঙ্গল শোভাযাত্রা, বৈশাখী মেলা, লোকসংগীতে ধর্ম, বর্ণ বা শ্রেণি নির্বিশেষে সবাই এই উৎসবে অংশগ্রহণ করি।
সব চেয়ে মজার বিষয় হলো মুঘল আমলে রাজস্ব আদায়ের সুবিধার্থে বাংলা সনের প্রচলন শুরু হয়। তখন থেকেই বাঙ্গালী ব্যবসায়ীকরা পাওনা টাকা আদায়ের জন্য হালাখাতার মাধ্যমে নতুন বছরের হিসাব শুরু করতেন। আজও সেই ঐতিহ্য প্রচলন রয়েছে।
কৃষকদের জীবনেও এই দিনটি আনন্দময়ের। বাংলার কৃষকরা বাংলাসনের সময় ও ঋতুর মিল রেখে ফসল চাষাবাদ করে এবং এই বৈশাখ মাস থেকে শুরু করে, কৃষকের ঘরে সোনালী ফসলের আগমন। এই দিনটি গ্রাম বাংলার কৃষকরা মাঝে আনন্দ বহন করে।
যদিও বর্তমানের আধুনিকতার ছোয়ায় বৈশাখ উদযাপনের ধরনে ভিন্নতা দেখা যায়। কিন্তু এর মূল চেতনা- সংস্কৃতি ও ঐক্য- এখনো অটুট রয়েছে। বরং নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণে এটি আরও প্রানবন্ত হয়ে উঠছে।
সবশেষে, বৈশাখ শুধু একটি উৎসব নয়; এটি আমাদের আত্মপরিচয়ের অংশ। যা আমাদের শেখায় ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরে আধুনিকতার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে। বৈশাখ বাঙ্গালির জন্য চিরন্তন- নতুনের ডাক, আনন্দের উৎস এবং গর্ব।

রিয়াজ উদ্দিন ইফান
শিক্ষার্থী, ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি,বাংলাদেশ

 

পহেলা  বৈশাখ আমাদের কি বার্তা দেয়

ষড়ঋতুর দেশ বাংলাদেশ। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে আসা প্রখর রোদ আমাদের জানান দেয় প্রকৃতিতে বৈশাখের আগমনী বার্তা। ঝড়, বৃষ্টি আর তপ্ত রোদ নিয়ে বৈশাখের আগমন ঘটলেও বৈশাখের আমগন আমাদের মাঝে নিয়ে আসে নতুন বার্তা। পহেলা বৈশাখ আমাদের মনে করিয়ে দেয় বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসকে, যেখানে বাঙালিরা সকল বিভেদ ভুলে ঐক্য হতে শিখে। পহেলা বৈশাখ শুধু সকালে পান্তা ভাত আর ইলিশ মাছ খাওয়ায় সীমাবদ্ধ নেই বরং বাংলা বছরের শুরুতেই আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই অতীতের সকল গ্লানি মুছে নতুন উদ্যমে সামনে আগানোর। সকল অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের বার্তা নিয়ে আসে বাংলার নতুন বছর। পহেলা বৈশাখে চারদিকে উৎসব ও আনন্দমুখর পরিবেশের সাথে আমাদের মাঝে জাগে নতুন আশা। যে আশা আমাদের দেশ বদলাতে অনুপ্রেরণা জোগায়। আমরা এমন এক বৈশাখ দিয়ে বছর শুরু করতে চাই, যেখানে থাকবে না কোন বৈষম্য। যেখানে দেশ গড়ার ভিত্তি হবে স্বচ্ছতা আর জবাবদিহিতা।

নুসরাত সুলতানা
শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

লেখক: সভাপতি, সমন্বিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ১১ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে আমাদের সময় পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!