প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড বনাম আধুনিক আইন: আবেগের বিপরীতে বাস্তবতা
সাম্প্রতিক সময়ে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের মতো জঘন্য অপরাধের শাস্তিস্বরূপ অপরাধীকে প্রকাশ্যে ফাঁসি দেওয়ার দাবি জোরালো হচ্ছে। সাধারণ মানুষের এই দাবির পেছনে রয়েছে গভীর ক্ষোভ এবং দ্রুত বিচার পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। অনেকেই মনে করেন, জনসমক্ষে এমন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হলে তা সমাজে ভীতি তৈরি করবে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধের মাত্রা কমিয়ে আনবে।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড একসময় অত্যন্ত সাধারণ একটি বিষয় ছিল। ফরাসি বিপ্লবের সময় ‘গিলোটিন’ বা মধ্যযুগীয় ইউরোপ এবং প্রাচীন রোমে প্রকাশ্য ফাঁসি বা মৃত্যুদণ্ড ছিল শাসকদের ক্ষমতা প্রদর্শন এবং জনগণকে সতর্ক করার প্রধান হাতিয়ার। অপরাধীকে জনসমক্ষে শাস্তি দেওয়ার মাধ্যমে রাষ্ট্র তার কঠোর অবস্থান পরিষ্কার করত। কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও সমাজবিজ্ঞান এই ধারণাকে পেছনে ফেলে অনেকটা এগিয়ে এসেছে।
আধুনিক আইনের জটিলতা মূলত মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের জায়গা থেকে তৈরি হয়েছে। জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্র অনুযায়ী, যেকোনো নিষ্ঠুর বা অমানবিক শাস্তি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আধুনিক বিচার ব্যবস্থা ‘প্রতিহিংসামূলক’ নয়, বরং ‘সংশোধনমূলক’ নীতির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। প্রকাশ্যে ফাঁসি দিলে তা সমাজকে সংবেদনশীল করার বদলে মনস্তাত্ত্বিকভাবে আরও বেশি সহিংস ও নিষ্ঠুর করে তুলতে পারে বলে অপরাধবিজ্ঞানীরা মনে করেন। এছাড়া, বিচারিক ভুলের কারণে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তির ফাঁসি হয়ে গেলে তা আর ফেরানোর উপায় থাকে না।
জনগণের ক্ষোভ এবং হতাশা সম্পূর্ণ যৌক্তিক। তবে মধ্যযুগীয় শাস্তির দিকে না ঝুঁকে, আমাদের উচিত বিচারিক দীর্ঘসূত্রিতা কমানো, আইনের ফাঁকফোকর বন্ধ করা এবং দ্রুততম সময়ে শাস্তির প্রয়োগ নিশ্চিত করা।
