বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

বিচারহীনতার সংস্কৃতি: আবরার ফাহাদ থেকে ওসমান হাদী

Author

মোঃ মাহমুদুর রেজা রোশান , পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ২২ ডিসেম্বর ২০২৫ পাঠ: ১৫৬ বার

২০১৯ সালের অক্টোবরে বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে নৃশংসভাবে পিটিয়ে হত্যার ঘটনাটি বাংলাদেশের বিচারহীনতার সংস্কৃতির এক চরম দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২১ সালে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল ২০ জনকে মৃত্যুদণ্ড ও ৫ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিলেও ২০২৫ সালের মার্চে হাইকোর্ট সেই রায় বহাল রাখা পর্যন্ত বিচার প্রক্রিয়ায় কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি লক্ষ্য করা যায়নি। আইন অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের সুপ্রিম কোর্টে আপিল করার অধিকার থাকলেও অন্তত ১০ জন আসামি এই আইনি সুযোগ নিয়ে বছরের পর বছর ফাঁসি কার্যকর করার প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করছে। এই দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের উদাহরণ হিসেবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এস তাহের আহমেদ হত্যা মামলার কথা উল্লেখ করা যায়। ২০০৬ সালে সংঘটিত সেই হত্যাকাণ্ডের বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ করে দুই আসামির ফাঁসি কার্যকর করতে রাষ্ট্রের সময় লেগেছিল দীর্ঘ ১৭ বছর। ড. তাহেরের সহকর্মী ও ছাত্র মিয়াজিউদ্দিনের প্রত্যক্ষ মদদে সেই হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছিল, যা ছিল মূলত পেশাগত হিংসা ও ক্ষমতার দাপট। আবরার হত্যাকাণ্ডের বিচারও যদি ড. তাহেরের মামলার মতো দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ঝুলে থাকে, তবে তা পরিবারের জন্য অসহনীয় কষ্টের এবং সাধারণ মানুষের জন্য চরম হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। আবরার হত্যা মামলায় বিচারিক দীর্ঘসূত্রতার পাশাপাশি প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার চরম অবহেলা জনমনে আস্থার সংকটকে আরো ঘনীভূত করেছে। রায়ের চার বছর পরও চারজন আসামি এখনো পলাতক এবং তাদের গ্রেপ্তারে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর তৎপরতা দেখা যায়নি। সবচেয়ে বিস্ময়কর ও লজ্জাজনক ঘটনাটি ঘটে ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট, যখন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মনতাসির আল জেমি কাশিমপুর কারাগার থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। দেশের সর্বোচ্চ নিরাপত্তার দাবি করা একটি কারাগার থেকে একজন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামির পলায়ন শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, বরং এর পেছনে কোনো শক্তিশালী চক্রের প্রভাব বা গভীর যোগসাজশ থাকার ইঙ্গিত দেয়। এই ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁঁকি ও জবাবদিহির অভাব প্রমাণ করে যে, আলোচিত মামলার বিচার যেখানে বিশৃঙ্খলায় ভরা, সেখানে সাধারণ মামলার ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার পাওয়া আরো দুষ্কর হয়ে পড়ছে। মানুষ এখন ভাবতে বাধ্য হচ্ছে যে, অপরাধীরা কারাগার থেকে পালিয়ে গিয়ে বা প্রশাসনের ছত্রছায়ায় থেকে আইনের হাত থেকে অনায়াসেই রেহাই পেয়ে যেতে পারে।

বর্তমানে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান হাদিকে হত্যার ঘটনাটি আবরার ফাহাদ মামলার সেই অমীমাংসিত ক্ষত ও সংশয়কেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে। ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর ঢাকার পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট রোডে হাদিকে মাথায় গুলি করার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু এবং বর্তমানে চলমান নির্বাচনী অস্থিরতার প্রেক্ষাপট একটি ভীতিকর অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। হাদির ক্ষেত্রে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে- প্রথমে কি সেই সন্ত্রাসীদের আদৌ ধরা সম্ভব হবে? কারণ প্রকাশ্যে গুলি করা সত্ত্বেও মূল পরিকল্পনাকারীরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। যদি কোনোভাবে তাদের ধরাও যায়, তবে কি তাদের শাস্তি নিশ্চিত হবে, নাকি আবরার মামলার আসামিদের মতো যুগ যুগ ধরে আপিল ও আইনি মারপ্যাঁচে সময় পার করা হবে? মানুষের মনে এই গভীর শঙ্কা দানা বেঁধেছে যে, একদিন হয়তো এই খুনিরাও কারাগার থেকে পালিয়ে যাবে অথবা কোনো কুখ্যাত রাজনৈতিক চালে তাদের সাধারণ ক্ষমা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হবে। যদি রাজনৈতিক সমঝোতা বা কৌশলের কারণে অপরাধীরা মুক্তি পেয়ে যায়, তবে দেশে আইনের শাসন বলে কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।

পরিশেষে, আবরার ফাহাদ ও শরীফ ওসমান হাদির মতো হত্যাকাণ্ডগুলো কেবল একক কোনো অপরাধ নয়, বরং এগুলো ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সন্ত্রাসী আচরণের রাজনৈতিক বহিঃপ্রকাশ। অপরাধীরা যদি দিনের পর দিন রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকে এবং রাষ্ট্র তাদের শাস্তি দিতে ব্যর্থ হয়, তবে সাধারণ মানুষের কাছে রাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থান ধ্বংস হয়ে যাবে। হাদি হত্যাকাণ্ডের তদন্তে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং আবরার হত্যা মামলার জেল পালানো ও পলাতক আসামিদের অবিলম্বে আইনের আওতায় আনার মাধ্যমেই কেবল রাষ্ট্র প্রমাণ করতে পারে যে, ন্যায়বিচার কেবল কাগুজে দলিলে সীমাবদ্ধ নয়। যদি খুনিরা একের পর এক রাজনৈতিক চালে বা প্রশাসনিক অবহেলায় বেঁচে যায়, তবে এই রাষ্ট্র ও বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের বিন্দুমাত্র আস্থা থাকবে না। সমাজ ও দেশ সঠিকভাবে চলতে হলে প্রতিটি খুনের বিচার হতে হবে দ্রুত, নিশ্চিত এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত; অন্যথায় বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি দেশকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিবে।

লেখক: সাধারণ সদস্য, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ২২ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে খোলা কাগজ পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!