গল্প: ভালোবাসা রয়ে যায়

মাঝে মাঝে সময় কাটাই বকুলতলায়, কলেজের সেই চিরচেনা স্মৃতিবিজড়িত স্থান, যে জায়গাটা শুধু জায়গা নয়, যেটি গেঁথে গেছে হৃদয়ে। যেভাবে প্রতিদিন সূর্য উঠে, বকুলতলায় যাওয়াটাও যেন তেমনই। আজও বসে আছি একা, কেউ নেই পাশে। কখনো বইয়ের পাতা উল্টাই, কখনো-বা দেখি আশপাশ, আবার হাতে থাকা ঘড়িতে তাকিয়ে খানিকটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ি, খুলি মোবাইলের নোটপ্যাড যেখানে লেখা আছে কত কবিতা, যেখানে আছে ভালোবাসা আঁকা। ডায়েরির সাদা পাতার সঙ্গে কলমের ভালোবাসা মিশাতে এখন খুব একটা ভালো লাগে না, তবু সঙ্গে রাখি। কখন কী আসে মনে, ইচ্ছে হয় তুলে ফেলি ডায়েরিতে, যদি তখন সঙ্গে না থাকে ডায়েরি, হয়তো হারিয়ে যেতে পারে শব্দযুগল। তাই সঙ্গেই রাখি।
দুপুরের সূর্যটা মাঝ আকাশ থেকে পশ্চিমে হেলে পড়েছে সেটি স্পষ্ট। আমার এই স্থান ত্যাগের সময়ও ঘনিয়ে এসেছে, যেতে হবে গন্তব্যে। প্রস্তুতি নিচ্ছি উঠব বলে, তবে হঠাৎই সামনে এসে পড়ল একটি স্বচ্ছ সাদা কাগজ, কোনো লেখা নেই, নেই কোনো দাগ, যেন মাত্রই কাগজের কারখানা থেকে উড়ে এসে সে পড়ল আমার সম্মুখে, বাতাস তাকে যেন উড়িয়ে এনেছে আমার জন্য। যেন এসে বলছে লেখ, এ আমার স্বচ্ছতায় তুমি ভালোবাসা লেখ, লেখ কবিতা, গান। তার সাদা সেই শাড়ির সঙ্গে ছিল সাদা চুড়ি, ছিল কাঠগোলাপের মতো আকৃতির আংটি, এক পলকে সব এসে ধরা দিল আমার চোখে। গাঁদা ফুলে মোড়ানো ডান হাতের কব্জি আমার চোখ ধরে রেখেছে অনেকক্ষণ। তবে সাদায় মোড়ানো তার কাঁধে কালো ব্যাগ খুব একটা মানায়নি। কেন যে সে নিল এ ব্যাগটি! হয়তো সাজ শেষে তাড়াহুড়োয় বের হতে গিয়ে ঠিক ব্যাগটি নিতে পারেনি, হয়তো তার বান্ধবীগুলো ফোন দিচ্ছিল বারবার। এমন বিরক্ত তাকে না করলেও পারত তারা।
সামনে দিয়ে সে পার হয়ে যাচ্ছে। বেশ বিচক্ষণতা তার চোখে-মুখে। প্রতি পদক্ষেপের সব ধুলোবালি যেন সে হিসাব করে নিচ্ছে, হিসাব করে পা ফেলছে একটি পর আরেকটি। তাকিয়ে আছি, আমি তাকিয়ে আছি। আর তো কিছু করার নেই। তার চুলগুলো ছিল খোলা, দুয়েকটা উড়ছিল বাতাসে। তবে হয়তো খোঁপায় আরও ভালো লাগত তাকে, আলগা করা সেই খোঁপা, আমার পছন্দের, আমার ভালো লাগার। পার হয়ে গেল সে আমাকে ফেলে, কিছু বলতে পারিনি, আমি দেখিওনি, সে কি তাকিয়েছিল আমার দিকে? হয়তো না!
এভাবেই সেদিনও সে চলে গিয়েছিল আমাকে পেছনে ফেলে। বলতে পারিনি কিছু, চোখের জল ছিল না ঠিকই তবে যদি হৃদয়ের কান্নার জল দেখানো যেত তবে হয়তো পাশে থাকা বৃক্ষও সেদিন কাঁদত আমার ব্যথায়। এই সেই স্থান যেদিন মহিমাকে আমি প্রথম দেখেছিলাম, পড়েছিলাম তার প্রেমে। সেদিন তার এই শুভ্রতা ছিল না, ছিল না চোখেতে আলগা কাজল, ঠোঁটের রঙের কোনো কৃত্রিমতা সেদিন চোখে পড়েনি। শুধু চোখে পড়েছিল তাকে, আমি পড়েছিলাম তার মায়ায়। তার কেশের মসৃণ গন্ধ যেন এসে লেগেছিল আমার ইন্দ্রিয়ে, হয়ে উঠেছিলাম লোভী, তাকে পাওয়ার লোভ। তবে তাকে পাওয়া হলো না।
আজ আমি যে শুভ্রতায় ভালোবাসা খুঁজে পেলাম, এ ভালোবাসা নতুন নয়, বেশ পুরোনো। বোধ করি, পুরোনো বলাও ভুল হবে নিশ্চয়ই। প্রিয়তমার প্রতি ভালোবাসা পুরোনো হয় না, এ ভালোবাসা রয়ে যায় মনে, মনের গহীনে। তবে সেদিনও যেমন আটকে রাখতে পারিনি তাকে, আজও পারিনি। সে গিয়েছে চলে, যাক। আমার ভালোবাসা থেকে যাক মনে, কবিতায়, আমার গানে; থেকে যাক গল্প হয়ে কিংবা ডায়রিতে কলমের খোঁচায়।
লেখক: শিক্ষার্থী, ফেনী সরকারি কলেজ

