বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

অসম অর্থনীতি, ঈদের আনন্দ সার্বজনীন হবে কবে?

Author

মোঃ তায়ীম খান , Gopalgonj Science and Technology University, Gopalgonj

প্রকাশ: ১৭ মার্চ ২০২৬ পাঠ: ১৮৫ বার

অসম অর্থনীতি, ঈদের আনন্দ সার্বজনীন হবে কবে?

ঈদ মানে আনন্দ। ঈদ মানে নতুন পোশাক, সেমাই-পায়েসের গন্ধ, আত্মীয়ের বাড়ি যাওয়া, শিশুর হাসি। কিন্তু এই আনন্দ কি সত্যিই সবার? রাজধানীর কোনো শপিং মলে যখন লক্ষ টাকার শাড়ি বিক্রি হয় ঘণ্টার মধ্যে,  কোনো গার্মেন্টস শ্রমিক হিসাব কষছেন  এই মাসের বাসাভাড়া দেবেন, না ছেলের জন্য একটা নতুন জামা কিনবেন না মায়ের জন্য একটা শাড়ী বয়স্ক বাবার জন্য একটা পাঞ্জাবী না কিনলেই নয় । এগুলো একসাথে সম্ভব নয়। এই দুই চিত্রের মাঝখানে যে গভীর খাদ, সেটাই আজকের বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা।

ঈদ এসেছিল খুশি এবং সাম্যের বার্তা নিয়ে। ধনী-গরিব, উঁচু-নিচু ঈদের ময়দানে সবাই এক কাতারে দাঁড়ায়, এটাই তার আদর্শ। কিন্তু নামাজের কাতার শেষ হলেই বাস্তবতা ফিরে আসে। একজন কারখানার শ্রমিক আর মালিক  উভয়েই একই ঈদগাহে নামাজ পড়লেন, কিন্তু ঘরে ফেরার পথে তাদের জগৎ আলাদা হয়ে যায়। একজন যাচ্ছেন ভাড়া করা মাইক্রোবাসে, অন্যজন হাঁটছেন পায়ে কারণ রিকশাভাড়াটুকুও এখন বিলাসিতা।

উৎসবের বাজারে যার ঘাম, তার কপালে নেই উৎসব

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যে জামাকাপড় পরে মানুষ ঈদ উদযাপন করে, তার বড় একটি অংশ তৈরি হয় বাংলাদেশে ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ আর চট্টগ্রামের গার্মেন্টস কারখানায়। এই শিল্পে কাজ করেন প্রায় ৪০ লাখের বেশি শ্রমিক, যাঁদের বিরাট অংশ নারী, গ্রাম থেকে আসা, স্বজন ছেড়ে শহরে পেটের দায়ে এসেছেন। তাঁদের হাতের সেলাইয়ে তৈরি পোশাক বিদেশে রপ্তানি হয়, দেশের মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তের আলমারিতে ওঠে  কিন্তু সেই শ্রমিকের নিজের শরীরে নতুন পোশাক ওঠে কিনা, সেটা নিয়ে কেউ প্রশ্ন তোলে না।

বাংলাদেশে গার্মেন্টস শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি এখন ১২,৫০০ টাকা, যা ২০২৩ সালে নির্ধারিত হয়েছে দীর্ঘ আন্দোলন আর রক্তের বিনিময়ে। কিন্তু ঢাকায় একটি ছোট ঘরের ভাড়া ৫,০০০ থেকে ৮,০০০ টাকা, বাজারে চাল-ডাল-তেলের দাম যেভাবে লাফিয়ে বেড়েছে গত কয়েক বছরে, তাতে এই মজুরিতে সংসার চালানো প্রায় অসম্ভব। ঈদের সময় বাড়তি একটু খুশির জন্য হাত বাড়ানো তো দূরের কথা।

ঈদের সকালে একটি শিশুর মুখে হাসি দেখার চেয়ে সুন্দর দৃশ্য কমই আছে। নতুন জামা পরে, আতর মেখে, সেমাই খেয়ে সে যখন মুরব্বিদের সালাম করে ঘুরে বেড়ায় এটাই ঈদের প্রাণ। কিন্তু এই সৌভাগ্য কি সব শিশুর?

বাংলাদেশে এখনও লক্ষাধিক শিশু শ্রমে নিয়োজিত। চা বাগানে, ইটভাটায়, গৃহকর্মে, রাস্তার ধারের চায়ের দোকানে ঈদের দিনেও যাদের কাজ থামে না। এই শিশুদের জন্য ঈদ মানে হয়তো একটু ভালো খাবার, হয়তো মালিকের দেওয়া পুরনো পোশাক। নতুন জামার স্বপ্ন তাদের কাছে বিলাসিতা।

গ্রামের ঈদ: আনন্দের মোড়কে লুকানো কষ্ট
শহরের এই চিত্র থেকে গ্রাম কি আলাদা? মোটেও না বরং অনেক জায়গায় পরিস্থিতি আরও কঠিন।
কৃষিজীবী পরিবারে ঈদের বাড়তি খরচ মেটাতে অনেককে মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিতে হয়। সেই ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে পরের মৌসুমে আবার সংকট।  ঈদ আসে, ঈদ যায়  কিন্তু দেনার বোঝা থেকে যায়।

প্রবাসীর ঈদ: দূরত্বের যন্ত্রণা

বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর সহ বিশ্বের নানা দেশে কাজ করেন। তাঁরা দেশে টাকা পাঠান, পরিবারের মুখে হাসি ফোটান  কিন্তু নিজেরা থাকেন হাজার মাইল দূরে।এই প্রবাসী শ্রমিকদের অনেকে নিজেদের থাকার জায়গায় ঈদের দিন রান্না করেন একটু ভালো খাবার, নামাজ পড়েন দলবেঁধে কিন্তু মনে থাকে বাড়ির কথা। রিক্রুটিং এজেন্সিকে দেওয়া ঋণ এখনো শোধ হয়নি, ফলে ঈদের আনন্দের ভেতরেও একটা চাপা উদ্বেগ থাকে সবসময়।

মধ্যবিত্তের ঈদ: দেখানোর চাপে নীরব যন্ত্রণা

একটু ভিন্ন সংকটে আছেন মধ্যবিত্ত শ্রেণি। তাঁরা না পারছেন দারিদ্র্য স্বীকার করতে, না পারছেন ঠিকমতো উৎসব করতে। সামাজিক চাপ, আত্মীয়ের বাড়িতে গিয়ে “মুখ রক্ষা” করার চাপ, সন্তানের পোশাক ও উপহারের চাপ  এই মানসিক চাপ অনেক পরিবারে ঈদকে আনন্দের বদলে উদ্বেগের উৎসবে পরিণত করেছে।

গত কয়েক বছরে নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি মধ্যবিত্তকে বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। সরকারি চাকরিজীবী, ছোট ব্যবসায়ী, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী এই শ্রেণির মানুষেরা ঈদে পরিবার -সমাজের চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে।

সকল ক্ষেত্রে পরিলক্ষিত এই বৈষম্যটা অনুভূতির নয়, বরং পরিসংখ্যানের। বিশ্বব্যাংক(WB) ও সানেম ( SANEM =South Asian Network on Economic Modeling)এর গবেষণা বারবার দেখিয়েছে, বাংলাদেশে আয়বৈষম্য ক্রমশ বাড়ছে। গিনি কোএফিশিয়েন্ট অর্থনৈতিক বৈষম্য মাপার আন্তর্জাতিক সূচক  বাংলাদেশে উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে।

আমরা যদি এই সমস্যা গুলোর কারণ উদঘাটন ও নিরোসনের দিকে যাই তাহলে,

প্রথমত, ন্যায্য মজুরির প্রশ্নটি শুধু রাজনীতি বা অর্থনীতির নয়, এটি মানবিক মর্যাদার প্রশ্ন। একজন মানুষ সারাদিন খেটে যদি পরিবারকে দুবেলা খাবার তুলে দিতে না পারেন, তাহলে সেই শ্রমব্যবস্থা টেকসই নয় নৈতিকভাবেও নয়, অর্থনৈতিকভাবেও নয়।
গার্মেন্টস সহ সব খাতে শ্রমিকের মজুরি জীবনযাত্রার প্রকৃত ব্যয়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া দরকার।

দ্বিতীয়ত, গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।কৃষক যখন ফসল ফলান, তখন বাজারে ন্যায্য মূল্য না পেলে সেই পরিশ্রম অর্থহীন হয়ে যায়। মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্যে কৃষকের ঘরে আসে সামান্য, আর মুনাফা যায় শহরের গুদামঘরে।

তৃতীয়ত, কর্পোরেট দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে। যে শিল্প প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকের ঘামে মুনাফা হচ্ছে, সেই প্রতিষ্ঠানকে শুধু ঈদ বোনাসেই দায়িত্ব শেষ করলে চলবে না। আবাসন সুবিধা, সন্তানের শিক্ষা সহায়তা, স্বাস্থ্যসেবা এই বিষয়গুলোতে কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রকৃত প্রয়োগ দরকার।

চতুর্থত, বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের সক্রিয় ভূমিকা দরকার। ঈদের আগে বাজার মনিটরিং শুধু ঘোষণায় নয়, মাঠপর্যায়ে কার্যকর করতে হবে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে যাতে মুনাফাখোর ব্যবসায়ীরা সাধারণ মানুষের উৎসবকে পুঁজি বানাতে না পারে।

পরিশেষে একটা কথাই, “ঈদ হোক সবার “শুধু স্লোগানে নয়, বাস্তবে

“ঈদ মোবারক” বলার সময় আমরা কি একবার ভাবি, যে মানুষটিকে বলছি তার কাছে এই মোবারকি পৌঁছাচ্ছে কিনা? আমরা প্রায়ই বলি  “ঈদের আনন্দ ভাগ করে নাও।” কিন্তু ভাগ করে নেওয়ার আগে প্রশ্ন করতে হবে কেন একজনের কাছে ভাগ করার মতো এত আনন্দ, আর আরেকজনের কাছে কিছুই নেই? তাহলেই, কারণ উদঘাটন সম্ভব হবে।
একটি সমাজের সভ্যতা পরিমাপ হয় সে সমাজ তার সবচেয়ে প্রান্তিক মানুষটিকে কতটা মর্যাদা দেয়, তা দিয়ে। ঈদের আনন্দ তখনই সত্যিকারের সার্বজনীন হবে।সেই দিনটির জন্য শুধু অপেক্ষা নয়, সেই দিনটি তৈরি করার দায়িত্ব আমাদের সবার।
“ঈদ মোবারক”সবার জন্য, সত্যিকার অর্থে এটাই কাম্য।

লেখক: ছাত্র, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!