ঈদের আগে শ্রমিকের পাওনা নিশ্চিত করুন

ঈদের আগে শ্রমিকের পাওনা নিশ্চিত করুন
-উৎসবের আলো সবার ঘরে পৌঁছাক-
ঈদুল ফিতর আসে আনন্দের বার্তা নিয়ে। রমজানের দীর্ঘ সিয়াম সাধনার পর ঈদের দিনটি শুধু আনন্দের নয়, এটি একটি সামাজিক উৎসব যেখানে সমাজের সকল স্তরের মানুষ একসাথে উদযাপনের অধিকার রাখেন। কিন্তু প্রতি বছর ঈদের আগে একটি পরিচিত এবং বেদনাদায়ক চিত্র দেখা যায় হাজার হাজার শ্রমিক তাঁদের ন্যায্য বেতন ও উৎসব বোনাস না পেয়ে পথে পথে ঘুরছেন, বিক্ষোভ করছেন, কাঁদছেন। এই দৃশ্য আমাদের উৎসবের আনন্দকে প্রতি বছর প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়।
বাংলাদেশ একটি শ্রমনির্ভর অর্থনীতির দেশ। এ দেশের পোশাক শিল্প, নির্মাণ খাত, পরিবহন, হোটেল-রেস্তোরাঁ, গৃহস্থালি সেবা সব ক্ষেত্রেই লাখ লাখ শ্রমিকের ঘাম ও পরিশ্রমে টিকে আছে আমাদের অর্থনীতির চাকা। তবু প্রতি ঈদে দেখা যায়, এই মানুষগুলোরই ঈদ হয় সবচেয়ে কষ্টের। মালিকের অবহেলায়, কখনো ইচ্ছাকৃত দেরিতে, কখনো আর্থিক অজুহাতে শ্রমিকের ঈদের আনন্দ কেড়ে নেওয়া হয়।
শ্রমিকের বেতন-বোনাস: একটি অধিকার, অনুগ্রহ নয়
অনেক মালিকপক্ষ মনে করেন, শ্রমিককে বোনাস দেওয়া একটি ‘সদয় অনুদান’। এই মানসিকতাটাই সমস্যার মূল। বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ (সংশোধিত ২০১৮) অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানের লাভজনক পরিচালনার ক্ষেত্রে শ্রমিকরা উৎসব বোনাসের আইনি অধিকারী। এটি কোনো দয়াদাক্ষিণ্যের বিষয় নয় এটি আইনের কথা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রতি বছরই এই আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে অসংখ্য মালিক তাঁদের শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা আটকে রাখেন।
একজন শ্রমিক সারা বছর অমানুষিক পরিশ্রম করেন। রোজার মাসেও তিনি ক্লান্ত শরীরে কাজ করেন কারণ তাঁর সংসার আছে, সন্তান আছে, বাড়ি ফেরার স্বপ্ন আছে। ঈদের আগে মাত্র কটা দিনের ছুটি নিয়ে গ্রামে যাওয়ার আশায় তিনি অপেক্ষায় থাকেন। কিন্তু সেই বেতন বা বোনাস যখন সময়মতো পাওয়া যায় না, তখন সেই স্বপ্ন ভেঙে পড়ে বাচ্চার জন্য নতুন জামা কেনা হয় না, গ্রামের বৃদ্ধ বাবা-মায়ের কাছে কিছু পাঠানো হয় না। এই বেদনার দায় কে নেবে?
শ্রম আইনে বলা আছে, ঈদের আগে অন্তত সাত দিন বেতন এবং উৎসব বোনাস পরিশোধ করতে হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, ঈদের মাত্র একদিন বা দুইদিন আগে বেতন দেওয়া হয় যখন গ্রামে যাওয়ার টিকিট পাওয়া যায় না, বাজারে ভিড় এত বেশি যে কিছু কেনার উপায় নেই। এই কৌশলগত দেরি করাটাও একটি অবিচার, যা আইনের চোখে হয়তো ধরা পড়ে না কিন্তু নৈতিকতার মাপকাঠিতে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।
যে কষ্ট দেখা যায় না
রাজধানীর একটি গার্মেন্টস কারখানার কথা ভাবুন। ভোরবেলা অন্ধকার থাকতে উঠে বাস ধরে কাজে আসেন রহিম মিয়া । সারাদিন মেশিনের পাশে দাঁড়িয়ে, একই ভঙ্গিতে কাজ করে বাড়ি ফেরেন রাতে। মাসে মাসে টাকা পাঠান বরিশালের গ্রামে স্ত্রীর ওষুধ, ছেলের স্কুলের বেতন, শ্বশুরের চাল-ডাল। রমজানে রোজা রাখেন, কিন্তু সেহেরিতে কী খান তা নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় নেই। ঈদের সপ্তাহে মনে একটাই প্রশ্ন এবার কি সময়মতো বেতনটা পাবেন?
এই প্রশ্নটা শুধু রহিম মিয়ার নয়। ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রামের লক্ষ লক্ষ শ্রমিকের একই উদ্বেগ। পরিবারের কাছে ফেরার টিকিট কিনবেন কখন? ছেলেমেয়ের জামা কিনবেন কখন? কিন্তু কারখানার নোটিশ বোর্ডে কোনো তারিখ নেই। অফিসে জিজ্ঞেস করলে এড়িয়ে যাওয়া হয়। এই অনিশ্চয়তাটা একটা নীরব নির্যাতন যা কেউ দেখে না, কেউ হিসেব করে না।
শুধু পোশাক শ্রমিক নন নির্মাণ ভবন নির্মাণ শ্রমিক যিনি মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ছয়তলা বিল্ডিং গড়েছেন, রিকশাচালক যিনি রোদে-বৃষ্টিতে মানুষ বহন করেছেন, হোটেলের বাবুর্চি যিনি রমজানে সারারাত জেগে ইফতার রান্না করেছেন তাঁরাও একই প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে থাকেন। এই মানুষগুলোর কষ্টের কোনো পরিমাপ নেই, কারণ এই কষ্ট কোনো পত্রিকার শিরোনাম হয় না।
একটি কথা মাথায় রাখা দরকার যখন একজন শ্রমিক ঈদের বোনাস না পেয়ে রাস্তায় বিক্ষোভ করেন, তিনি শুধু টাকা চাইছেন না। তিনি সম্মান চাইছেন। তিনি বলতে চাইছেন আমার পরিশ্রমের মূল্য আছে, আমিও মানুষ, আমারও উৎসব পালনের অধিকার আছে। এই ন্যূনতম মানবিক দাবিটুকু যখন পূরণ হয় না, তখন সমাজের ভেতরে একটা নীরব ক্ষত তৈরি হয় যা দেখা যায় না, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সমাজের বন্ধনকে দুর্বল করে দেয়।
তথ্য ও পরিসংখ্যান যা চোখ খুলে দেয়
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিআইএলএস) এবং গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি ঈদের মৌসুমে দেশের বিভিন্ন কলকারখানায় বেতন-বোনাস বিলম্ব বা অপ্রদানের অভিযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। ২০২৩ সালের ঈদুল ফিতরের আগে শুধুমাত্র ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরেই অন্তত ৫০টিরও বেশি কারখানায় শ্রমিক বিক্ষোভ হয়েছিল। আর ২০২২ সালে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের হিসাবে, ঈদের আগে বেতন-বোনাস না পেয়ে বিক্ষোভকারী শ্রমিকের সংখ্যা ছিল প্রায় দুই লক্ষের বেশি।
এই বিক্ষোভগুলো প্রায়ই সহিংস রূপ নেয় পুলিশের সাথে সংঘর্ষ হয়, শ্রমিকরা আহত হন, অনেককে গ্রেফতারও করা হয়। অর্থাৎ যে শ্রমিক তাঁর নিজের ন্যায্য পাওনা চাইতে রাস্তায় নামেন, তিনিই উল্টো আইনের মুখোমুখি হন। এই বিকৃত বাস্তবতাটা আমাদের ব্যবস্থার সবচেয়ে লজ্জাজনক দিক।
একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বেতন-বোনাস বিলম্বের কারণে প্রতি ঈদে বাংলাদেশে ভোক্তা ব্যয়ের উপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। শ্রমিকরা সময়মতো বেতন পেলে ঈদ বাজারে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতেন, তা স্থানীয় অর্থনীতিকে সক্রিয় রাখত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কাপড়ের দোকানদার, মিষ্টি বিক্রেতা সকলেই উপকৃত হতেন। অর্থাৎ শ্রমিকের ন্যায্য পাওনা নিশ্চিত করা শুধু মানবিকতার প্রশ্ন নয়, এটি অর্থনৈতিক বিচক্ষণতারও প্রশ্ন।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশে মোট কর্মজীবী মানুষের সংখ্যা সাত কোটিরও বেশি। এর মধ্যে প্রায় ৮৫ শতাংশই অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মরত যারা কার্যত শ্রম আইনের বাইরে। এই বিপুল সংখ্যক মানুষের বেতন, বোনাস বা অন্য কোনো সুবিধা নিশ্চিত করার কোনো কাঠামোগত ব্যবস্থা আজও গড়ে ওঠেনি।
তৈরি পোশাক শিল্পে বিজিএমইএ-এর সদস্যভুক্ত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা চার হাজারেরও বেশি। এই কারখানাগুলোতে কর্মরত প্রায় ৪০ লক্ষ শ্রমিকের মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশই নারী। এই নারী শ্রমিকরা প্রায়ই দ্বিগুণ বঞ্চনার শিকার একদিকে কর্মক্ষেত্রে নিম্ন মজুরি, অন্যদিকে ঘরেও সংসারের সকল দায়িত্ব। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মরত শ্রমিকদের ৯০ শতাংশেরও বেশি কোনো ধরনের সামাজিক সুরক্ষা পান না।
পোশাক শিল্প: গর্বের আড়ালে কষ্টের চিত্র
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৪ শতাংশ সরবরাহ করে। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে এই খাতের অবদান অপরিসীম। সরকার গর্বিত, মালিকরা আন্তর্জাতিক মঞ্চে বক্তব্য দেন, বিদেশি ক্রেতারা ‘কমপ্লায়েন্ট ফ্যাক্টরি’-র সনদ দেন। কিন্তু এই চকচকে ছবির পেছনে যে মানুষগুলো আছেন, তাঁদের জীবন কতটা কঠিন সেটা কি আমরা সত্যিই জানি?
একজন পোশাক শ্রমিকের মাসিক নূন্যতম মজুরি বর্তমানে ১২,৫০০ টাকা নির্ধারিত হয়েছে যদিও শ্রমিকরা দাবি করেছিলেন ২৩,০০০ টাকার বেশি। এই মজুরিতে ঢাকায় বাসা ভাড়া, খাওয়া, যাতায়াত মেটানোর পরে গ্রামে টাকা পাঠানো প্রায় অসম্ভব। তবু তাঁরা পাঠান নিজেরা না খেয়ে, বাসে ঝুলে, রোদে পুড়ে।
আন্তর্জাতিক ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশ থেকে কোটি কোটি টাকার পোশাক কিনে নেয়, কিন্তু মূল্যের একটা ক্ষুদ্র অংশই শ্রমিকের মজুরিতে যায়। এই অসমানুপাতিক বণ্টন শুধু দেশীয় মালিকদের সমস্যা নয় বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনের কাঠামোগত সমস্যাও বটে। তবু দেশের মধ্যে যতটুকু ন্যায়বিচার করা সম্ভব, অন্তত সেটুকু নিশ্চিত করার দায়িত্ব আমাদেরই।
ঈদের আগে অনেক কারখানা হঠাৎ বন্ধ ঘোষণা করে দেয়। মালিক ‘পালিয়ে যান’, ফোন ধরেন না। শ্রমিকরা কারখানার সামনে দাঁড়িয়ে থাকেন, কিন্তু ভেতরে ঢুকতে পারেন না। গত কয়েক বছরে এ ধরনের ঘটনা একাধিকবার ঘটেছে বিশেষত ছোট ও মাঝারি আকারের কারখানায়। ঈদের আগে কারখানা বন্ধ করে দেওয়া শ্রমিকের প্রতি একটি চরম বিশ্বাসঘাতকতা।
রাষ্ট্রের ব্যর্থতা: প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তবতা
প্রতি বছর ঈদের আগে শ্রম মন্ত্রণালয় থেকে সংবাদ সম্মেলন হয়, বিজ্ঞপ্তি জারি হয় ‘ঈদের আগেই বেতন-বোনাস পরিশোধ করতে হবে।’ বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ-ও প্রতিশ্রুতি দেয়। পত্রিকায় খবর আসে। কিন্তু পরদিনই দেখা যায়, কারখানার সামনে শ্রমিকদের বিক্ষোভ। গত এক দশকে এই চিত্র একটুও বদলায়নি শুধু প্রতিশ্রুতি আর বিবৃতি বছর বছর পুনরাবৃত্তি হয়।
শ্রম অধিদফতরের তদারকি ব্যবস্থা কতটা দুর্বল, তা একটি সংখ্যাই বলে দেয় সারা দেশে মাত্র কয়েকশো শ্রম পরিদর্শক দিয়ে হাজার হাজার কারখানার তদারকি করা কার্যত অসম্ভব। ফলে আইন লঙ্ঘন হলেও তা প্রায়ই দৃষ্টির বাইরে থেকে যায়।
শ্রম আদালতের চিত্রও হতাশাজনক। একটি শ্রম মামলা নিষ্পত্তিতে গড়ে তিন থেকে পাঁচ বছর লেগে যায়। ততদিনে শ্রমিক হয়তো সেই প্রতিষ্ঠান ছেড়ে চলে গেছেন, হয়তো হতাশ হয়ে মামলা তুলে নিয়েছেন। এই দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়া মূলত মালিকপক্ষেরই সুবিধা করে দেয়।
২০১৩ সালের রানা প্লাজা ধসের পরে সারা বিশ্ব বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের নিরাপত্তা ও শ্রমিক অধিকার নিয়ে সোচ্চার হয়েছিল। সেই ট্র্যাজেডিতে প্রাণ হারান ১,১৩৪ জন শ্রমিক। আন্তর্জাতিক চাপে কিছু সংস্কার হয়েছে, কিছু কারখানায় নিরাপত্তা উন্নত হয়েছে। কিন্তু মজুরি ও বোনাস নিশ্চিতের প্রশ্নে অগ্রগতি এখনো অপ্রতুল। রানা প্লাজার কথা ভুলে যাওয়া মানে, সেই ১,১৩৪ জনের জীবনের মূল্যকে অস্বীকার করা।
রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের কাছে একটিই প্রশ্ন বছরের পর বছর একই ঘটনা ঘটছে, একই বিবৃতি দেওয়া হচ্ছে তাহলে পরিবর্তন হচ্ছে না কেন? উত্তর একটাই রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব এবং শ্রমিকদের ভোট-রাজনীতিতে উপেক্ষিত থাকা। যেদিন শ্রমিকরা সংগঠিত হয়ে তাঁদের ভোটশক্তি ব্যবহার করতে পারবেন, সেদিন হয়তো পরিস্থিতি বদলাবে।
এ বিষয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া যায়। শ্রীলঙ্কায় উৎসব বোনাস না দেওয়া মালিকদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবসা পরিচালনার অনুমতি বাতিলের বিধান আছে। নেপালেও শ্রমিকের বেতন নির্দিষ্ট তারিখের মধ্যে না দিলে প্রতিদিন জরিমানার ব্যবস্থা রয়েছে। বাংলাদেশে এ ধরনের দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়ার সময় এখনই।
মালিকপক্ষের অজুহাত ও তার জবাব
মালিকপক্ষ সবচেয়ে বেশি যে অজুহাত দেন তা হলো ‘ব্যাংক ঋণ’, ‘রপ্তানি আদেশ না পাওয়া’, ‘বায়ার পেমেন্ট দেরি করছে’ ইত্যাদি। এই অজুহাতগুলোর কিছুটা বাস্তবসম্মত হলেও, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে একই সময়ে মালিকের ব্যক্তিগত জীবনমান, বিদেশ ভ্রমণ বা নতুন বিনিয়োগে কোনো ঘাটতি নেই। অর্থাৎ সমস্যাটা সত্যিকারের আর্থিক নয়, বরং এটি একটি অগ্রাধিকারের সংকট।
একটি ব্যবসার সবচেয়ে প্রথম দায়বদ্ধতা হলো তার কর্মীদের পারিশ্রমিক নিশ্চিত করা। এটি ব্যবসার নৈতিক ভিত্তি এর উপর দাঁড়িয়ে না থাকলে কোনো ব্যবসাই টেকসই হতে পারে না।
উল্লেখ্য যে, পৃথিবীর অনেক দেশেই শ্রমিকের বেতন বিলম্ব করলে সুদসহ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা আছে। ভারতে ‘পেমেন্ট অব ওয়েজেস অ্যাক্ট’ অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বেতন না দিলে জরিমানার পাশাপাশি ক্ষতিপূরণ দিতে হয়। বাংলাদেশে এ ধরনের কঠোর বিধান প্রবর্তন করা এখন সময়ের দাবি।
গৃহশ্রমিক: অদৃশ্য মানুষদের ঈদ
গৃহপরিচারিকা বা বাসাবাড়িতে কাজ করা মানুষগুলোর কথা আমরা প্রায়ই ভুলে যাই। তাঁরা বাংলাদেশ শ্রম আইনের সরাসরি সুরক্ষা পান না কারণ গৃহশ্রমিক নীতিমালা এখনো পরিপূর্ণভাবে কার্যকর হয়নি। একটি জরিপে দেখা গেছে, শহরাঞ্চলের গৃহশ্রমিকদের ৪০ শতাংশেরও বেশি ঈদ বোনাস পান না বা সামান্য পান।
এই মানুষটি সারাদিন আপনার ঘর পরিষ্কার করেন, আপনার সন্তানকে দেখেন, রান্না করেন তাঁর একটি ঈদ বোনাস আপনার কাছে হয়তো সামান্য, কিন্তু তাঁর কাছে সেটা সন্তানের একটি নতুন পোশাক, বাড়ি ফেরার বাস ভাড়া। একটু মানবিক হন। তাঁকে সময়মতো বেতন দিন, বোনাস দিন, ছুটি দিন।
ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি: শ্রমিকের প্রাপ্য
ঈদ যেহেতু ইসলামি উৎসব, তাই এই প্রসঙ্গে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গিটাও স্মরণ করা জরুরি। “রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগেই তার মজুরি দিয়ে দাও” এই হাদিসটি শুধু একটি ধর্মীয় নির্দেশ নয়, এটি একটি গভীর মানবিক নীতির প্রতিফলন। যে মালিক রমজানে রোজা রাখেন, নামাজ পড়েন, কিন্তু তাঁর শ্রমিককে ঈদের আগে বেতন-বোনাস দেন না তিনি কি সত্যিকারের ঈদের আনন্দ পেতে পারেন?
ইসলামে জুলুম বা অন্যায়কে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একজন শ্রমিককে তাঁর ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করা নৈতিক ও ধর্মীয় দিক থেকেও একটি গুরুতর অন্যায়। ঈদের দিন যখন আমরা নতুন পোশাক পরে নামাজে যাই, তখন একবার মনে করি এই পোশাকটা কে তৈরি করেছেন। তাঁর ঈদ হচ্ছে কি? এই ছোট্ট প্রশ্নটা যদি আমাদের বিবেকে নাড়া দেয়, তাহলেই হয়তো একটু একটু করে পরিবর্তন আসবে।
এখনই সময়: আমাদের সম্মিলিত করণীয়
সমাধানের পথ জটিল নয়, যদি সদিচ্ছা থাকে। সরকারের উচিত ঈদের নির্ধারিত সময়সীমার আগে বেতন-বোনাস পরিশোধ না করলে তাৎক্ষণিকভাবে ট্রেড লাইসেন্স স্থগিত, ব্যাংক হিসাব তদন্ত এবং মালিকের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলার ব্যবস্থা রাখা। একমাত্র কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা থাকলেই মালিকরা আইন মানতে বাধ্য হবেন।
ডিজিটাল পদ্ধতিতে বেতন প্রদান নিশ্চিত করাটাও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। মোবাইল ব্যাংকিং বা ব্যাংক ট্রান্সফারের মাধ্যমে বেতন দেওয়া হলে নথিভুক্ত থাকে গোপনে পরিশোধ না করার সুযোগ কমে যায়। সরকারের উচিত সকল প্রতিষ্ঠানের জন্য এটি বাধ্যতামূলক করা।
শ্রমিক সংগঠনগুলোকে আরও সংগঠিত ও সক্রিয় হতে হবে। ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। মিডিয়ার উচিত যেসব প্রতিষ্ঠান বারবার শ্রমিকের বেতন আটকে রাখে, তাদের নাম প্রকাশ করা কারণ সুনামের ক্ষতি অনেক সময় আইনের চেয়েও বেশি কার্যকর।
আমরা সাধারণ নাগরিকরাও দায়িত্বমুক্ত নই। আমাদের আশেপাশে যদি কোনো শ্রমিক বেতন না পেয়ে থাকেন, তাঁকে সহায়তা করুন শ্রম অধিদফতরে অভিযোগ জানাতে, মিডিয়ায় জানাতে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছাতে। আমরা যে পণ্য কিনি তার পেছনে একজন শ্রমিকের ঘাম আছে এই বোধটুকু জিইয়ে রাখা দরকার।
সিভিল সোসাইটি সংগঠন, মানবাধিকার কমিশন এবং সংসদ সদস্যদেরও এ বিষয়ে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। শুধু ঈদের মৌসুমে নয়, সারা বছর ধরে শ্রমিকের অধিকারের পক্ষে সোচ্চার থাকাটাই আসল পরিবর্তনের পথ। একটি টেকসই, ন্যায্য ও মানবিক শ্রমবাজার গড়ে তোলাই হোক আমাদের লক্ষ্য।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শ্রম অধিকার ও নৈতিক ব্যবসাচর্চার শিক্ষা দেওয়া দরকার। আজকের শিক্ষার্থী আগামীর উদ্যোক্তা তাঁরা যদি শুরু থেকেই জানেন যে শ্রমিকের সাথে ন্যায়সঙ্গত আচরণ করা শুধু আইনি বাধ্যবাধকতা নয়, একটি ভালো ব্যবসার শর্তও বটে তাহলে দীর্ঘমেয়াদে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব।
পরিশেষে সকলের ঈদ হোক আনন্দের
ঈদ মানে সমতা, ঈদ মানে ভ্রাতৃত্ব। কিন্তু যে সমাজে শ্রমিক তাঁর ন্যায্য পাওনা পান না, সেই সমাজের ঈদ আসলে সকলের হয় না কেউ আনন্দে উদ্বেলিত হন, কেউ নীরবে চোখের জল মোছেন। এই বৈষম্য আমাদের উৎসবকে অসম্পূর্ণ করে দেয়।
আমাদের দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড যাঁরা পোশাক শ্রমিক থেকে শুরু করে দিনমজুর, রিকশাচালক থেকে গৃহপরিচারিকা এঁরা প্রত্যেকেই এই দেশের নাগরিক। সংবিধান তাঁদেরও সমান অধিকার দিয়েছে। সেই অধিকার যদি শুধু কাগজেই থাকে, বাস্তবে না আসে তাহলে আমাদের উন্নয়নের গল্প অসম্পূর্ণ।
প্রতিটি শ্রমিকের পেছনে একটি পরিবার আছে। সেই পরিবারের ছোট ছেলেটা হয়তো বাবার অপেক্ষায় বসে আছে কখন বাবা ফিরবেন, নতুন জামা আনবেন, ঈদের দিন একসাথে নামাজে যাবেন। সেই শিশুর মুখের হাসিটুকু নিশ্চিত করার দায়িত্ব শুধু বাবার নয় এই সমাজের, এই রাষ্ট্রের, আমাদের সকলের।
রহিম মিয়ার মতো লাখো শ্রমিক এই ঈদেও অপেক্ষায় আছেন সময়মতো বেতনের, একটু সম্মানের, ছুটির দিনটায় ঘরে ফেরার। তাঁদের এই ন্যূনতম প্রত্যাশা পূরণ করা আমাদের সামর্থ্যের মধ্যেই আছে।
তাই আসুন এই ঈদে প্রতিজ্ঞা করি। মালিক হলে সময়মতো বেতন-বোনাস দিন। নিয়োগকর্তা হলে আপনার কর্মীর কথা ভাবুন। নাগরিক হলে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলুন। আর রাষ্ট্রের কাছে দাবি জানান শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত করার ব্যর্থতা যেন আর চলতে না পারে।
ঈদের আনন্দ তখনই পরিপূর্ণ, যখন তা সকলের।
লেখক-
নাম: মোঃ তায়ীম খান
গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
E-mail :taiyemkhanofficial@gmail.com

