বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

অতিরিক্ত ভাড়া: নৈতিক ব্যর্থতা নাকি রাষ্ট্রীয় উদাসীনতা?

Author

মোঃ তায়ীম খান , Gopalgonj Science and Technology University, Gopalgonj

প্রকাশ: ১৮ মার্চ ২০২৬ পাঠ: ৪১৫ বার

অতিরিক্ত ভাড়া: নৈতিক ব্যর্থতা নাকি রাষ্ট্রীয় উদাসীনতা?

২০২৬ সালের ঈদুল ফিতরের মাত্র চার দিন আগের কথা। কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে ভোর পাঁচটা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন রফিকুল ইসলাম। গার্মেন্টসকর্মী, থাকেন মিরপুরে পরিবার সহ তাঁর বৃদ্ধা মা আছেন, ছোট দুটো ছেলেমেয়ে আছে একটু আরামে যাওয়ার জন্য আসলেন ট্রেনের টিকিট কাটতে । সারা বছর একটু একটু করে জমানো টাকায় ঈদের নতুন জামা কিনেছেন, এখন শুধু বাড়ি ফেরার পালা পরিবার নিয়ে।
কাউন্টারে পৌঁছে শুনলেন টিকিট নেই। অনলাইনেও নেই। কিন্তু স্টেশনের বাইরে একদল লোক ঠিকই ফিসফিস করছে: ‘টিকিট লাগবে? আছে তবে একটু বেশি পড়বে।’ সরকার নির্ধারিত ২১৫ টাকার টিকিট দালালের কাছে ১০০০ টাকা। রফিকুল কিনলেন। কারণ বিকল্প নেই। বাড়ি তো যেতেই হবে পরিবার নিয়ে। রফিকুল একা নন। প্রতি ঈদে লাখো মানুষ এই একই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। বাস, লঞ্চ, ট্রেন সব পথেই চলে একই লুট। প্রশ্নটা সহজ এই অবস্থার জন্য দায়ী কে? পরিবহন মালিক ও দালালদের লোভ, নাকি রাষ্ট্রের নির্লজ্জ উদাসীনতা?

ঈদযাত্রা: আনন্দের পথে চাপের পাহাড়
ঈদুল ফিতর বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় উৎসব। প্রতি বছর এক কোটিরও বেশি মানুষ ঢাকা ছেড়ে ছুটে যান গ্রামের বাড়িতে মা-বাবার কাছে, সন্তানের কাছে, শেকড়ের কাছে। এই ফেরাটা শুধু যাত্রা নয়, এটা একটা আবেগ, একটা পরিচয়।
কিন্তু সেই আবেগকে পুঁজি করে প্রতি বছর চলে নির্মম ব্যবসা। BRTA নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা থাকে, কিন্তু তা মানার বালাই নেই। ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে সরকার নির্ধারিত বাসভাড়া যেখানে ৫৫০ টাকা, ঈদের আগে সেই টিকিটই বিক্রি হয় ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকায়। ‘ঈদের সময় একটু বেশি লাগে ভাই’ এই একটি বাক্যেই শেষ হয়ে যায় যাত্রীর প্রতিবাদের সুযোগ।
লঞ্চে ডেক ভাড়া রাতারাতি দ্বিগুণ হয়, কেবিনের দাম আকাশছোঁয়া। কিন্তু সবচেয়ে বেহাল অবস্থা ট্রেনের। কারণ মানুষ ট্রেনকে তুলনামূলক সাশ্রয়ী ও নিরাপদ মনে করে চাপটাও তাই সেখানে সবচেয়ে বেশি। আর সেই চাপকে কাজে লাগিয়ে যে লুটপাট চলে, সেটা বাস বা লঞ্চের চেয়েও ভয়াবহ।
ট্রেনের টিকিট: কাউন্টারে নেই, দালালের হাতে আছে
কমলাপুর, বিমানবন্দর, ক্যান্টনমেন্ট ঈদের আগে এই স্টেশনগুলোতে গেলে একটি পরিচিত দৃশ্য চোখে পড়ে। কাউন্টারের সামনে লম্বা লাইন, আর লাইনের শেষে একটাই উত্তর ‘টিকিট নেই।’ অনলাইন পোর্টালে ঢুকলেও দেখা যায়, বিক্রি শুরুর মিনিটের মধ্যে সব আসন শেষ। অথচ স্টেশনের আশেপাশে ঘুরঘুর করা দালালরা অনায়াসে টিকিট দিচ্ছে দুই থেকে পাঁচগুণ দামে।
এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্নটা আসে দালালদের হাতে এত টিকিট যাচ্ছে কীভাবে? উত্তর অনেকেই জানেন, কিন্তু জোরে বলার সাহস নেই। রেলওয়ের একটি অংশের কর্মী, টিকিট পরীক্ষক (টিটি) এবং বাইরের দালাল চক্রের মধ্যে একটি সুগঠিত নেটওয়ার্ক সক্রিয়। অনলাইন সিস্টেমে বট ব্যবহার করে মুহূর্তের মধ্যে বড় অংশের টিকিট কিনে নেওয়া হয়, পরে চড়া দামে বিক্রি হয়। কাউন্টার থেকেও নানা কৌশলে টিকিট সরিয়ে ফেলা হয়।
আর টিটিরা তো আছেনই বিনা টিকিটে বা কম ক্লাসের টিকিটে ট্রেনে তুলে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার বিনিময়ে ‘নগদ ব্যবস্থাপনা’ অনেক পুরনো রীতি। প্রতি ঈদে এই নিয়ে সংবাদ হয়, তদন্ত কমিটি হয়, দু-একজন দালাল ধরা পড়ে। কিন্তু মূল সিন্ডিকেলে হাত দেওয়া হয় না। রেলওয়ের ভেতরের যে অংশ এই চক্রের সাথে যুক্ত, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার নজির অত্যন্ত বিরল। এটা দুর্নীতি নয় শুধু এটা একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভেতর থেকে সাধারণ মানুষকে ঠকানোর সংগঠিত ব্যবস্থা।
পরিবহন সিন্ডিকেট: রাজনীতির ছায়ায় লুকানো লুট
শুধু ট্রেন নয়, বাস ও লঞ্চ সেক্টরেও একই কাহিনি তবে দুর্নীতির চেহারাটা একটু ভিন্ন। এখানে কাজ করে পরিবহন সিন্ডিকেট।
বাংলাদেশে পরিবহন মালিক সমিতিগুলো অত্যন্ত শক্তিশালী। তাদের রাজনৈতিক সংযোগ আছে, স্থানীয় প্রশাসনের সাথে ‘বোঝাপড়া’ আছে, এবং অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলের সক্রিয় নেতারাই এই সমিতির কর্তাব্যক্তি। ফলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া কার্যত কঠিন হয়ে পড়ে।
ঈদের আগে সমিতির সিদ্ধান্তেই নির্ধারিত হয় ‘অনানুষ্ঠানিক ভাড়া’। কোন রুটে কত নেওয়া হবে, কাউন্টারে কোন দাম দেখানো হবে আর যাত্রীর কাছ থেকে কত নেওয়া হবে এই পুরো ব্যবস্থাটা অলিখিত নিয়মে চলে। কেউ বেঁকে বসলে চাপ আসে সমিতির তরফ থেকে। এই সিন্ডিকেটের গায়ে রাজনৈতিক বর্ম আছে যতদিন সেই বর্ম না খোলা হবে, ততদিন ঈদের আগে ভাড়া বাড়তেই থাকবে।
নীরব সহ্য: প্রতিবাদ করেন না কেন মানুষ?
এই পুরো চিত্রের একটা দিক আলোচনায় কম আসে সাধারণ মানুষ কেন চুপ করে সহ্য করেন? কেন প্রতিবাদ হয় না?
প্রথমত, মানুষ জানেন যে প্রতিবাদ করলে ফল নেই। অভিযোগ করার জায়গা আছে কাগজে, কিন্তু সেখানে গেলে কেউ শোনে না। হেল্পলাইনে ফোন করলে ধরে না, ধরলেও কিছু হয় না। দ্বিতীয়ত, সময়ের চাপ। ঈদের আগে মানুষ শুধু বাড়ি পৌঁছাতে চান সেই মুহূর্তে অভিযোগ করতে বসলে হয়তো ট্রেন মিস হবে, এই ভয় থাকে।
তৃতীয়ত, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটা দীর্ঘদিনের মানসিক পরাজয়। বছরের পর বছর ধরে একই অবস্থা দেখতে দেখতে মানুষ মেনে নিয়েছেন যে এটাই স্বাভাবিক। ‘ঈদের সময় এমনই হয়’ এই বাক্যটা এখন কেউ প্রশ্ন করে না, বরং নিজেই বলেন। ক্ষোভ আছে, কিন্তু প্রতিবাদের ভাষা নেই। আর এই নীরব সহ্যই সিস্টেমকে টিকিয়ে রাখে যত মানুষ মেনে নেবেন, তত দালাল ও সিন্ডিকেটের সাহস বাড়বে।
অন্য দেশে কী হয়?
বাংলাদেশের পরিস্থিতিকে অনিবার্য মনে হতে পারে, কিন্তু তা নয়। ভারতে উৎসবের মৌসুমে বিশেষ ট্রেন (‘ফেস্টিভ স্পেশাল’) চালু করা হয়, এবং রেলওয়ের অ্যাপ-ভিত্তিক টিকিটিং ব্যবস্থায় কালোবাজারি নিয়ন্ত্রণে তুলনামূলকভাবে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। পাকিস্তানেও ঈদ মৌসুমে অতিরিক্ত পরিবহন সেবা যোগ করার নীতি আছে। এই দেশগুলো নিখুঁত নয়, তবে তারা অন্তত স্বীকার করে যে উৎসবের সময় পরিবহন চাহিদা বাড়ে এবং সেই অনুযায়ী পরিকল্পনা নেয়। বাংলাদেশে এই দূরদর্শিতার অভাব প্রতি বছর বারবার প্রমাণিত হয়।
রাষ্ট্রের ভূমিকা: আইন আছে, প্রয়োগ নেই
বাংলাদেশে পরিবহন ভাড়া নিয়ন্ত্রণের আইন আছে। BRTA নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা প্রকাশ করে। কাগজে-কলমে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় অবৈধ। তাহলে প্রতি বছর ঈদে একই চিত্র কেন? কারণটা সবাই জানেন প্রয়োগ নেই।
ভ্রাম্যমাণ আদালত মাঝেমধ্যে অভিযান চালায়, কিছু জরিমানা হয়, দু-একটি সংবাদ হয়। কিন্তু মূল চিত্র বদলায় না। কারণ সিন্ডিকেটের গোড়ায় হাত দেওয়া হয় না, রেলওয়ের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতির বিচার হয় না, দালাল চক্রের মাথারা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যায়।
রাষ্ট্র যদি আইন করে কিন্তু তা প্রয়োগ না করে, তাহলে সেই আইন সাধারণ মানুষের জন্য নয় সেটা শুধু কাগজের আশ্বাস। আর যখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভেতরের লোকই দুর্নীতিতে অংশ নেয়, তখন সেটা আর শুধু উদাসীনতা নয় সেটা সহযোগিতা।

সমাধান কোথায়?
সমস্যা চিহ্নিত করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। কিছু বাস্তব পদক্ষেপ অবিলম্বে নেওয়া সম্ভব।
প্রথমত, রেলওয়ের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে টিকিট কালোবাজারির সাথে জড়িত রেলকর্মী ও টিটিদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং বট-বিরোধী প্রযুক্তিগত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সব বাস ও লঞ্চে ডিজিটাল টিকিটিং বাধ্যতামূলক করতে হবে রেকর্ড থাকলে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় কঠিন হয়। তৃতীয়ত, ঈদ মৌসুমে বিশেষ ট্রেন ও লঞ্চ সার্ভিস বাড়াতে হবে এবং হেল্পলাইনকে সত্যিকার অর্থে সক্রিয় করতে হবে।
কিন্তু সবচেয়ে জরুরি যে কাজটা পরিবহন  সিন্ডিকেটের রাজনৈতিক বর্ম খুলতে হবে। শুধু ডিজিটাল টিকিট বা মোবাইল কোর্ট দিয়ে কিছু হবে না, যদি যে মানুষগুলো এই লুটের পৃষ্ঠপোষক, তারা রাজনৈতিক ছাদের নিচে নিরাপদ থাকেন।
পরিশেষে একটা কথা দায়টা কার?
তাহলে দায়টা কার পরিবহন মালিক ও দালালের, নাকি রাষ্ট্রের? সৎ উত্তর হলো: দুজনেরই। পরিবহন মালিক ও দালাল চক্র মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে মুনাফা করছে এটা তাদের নৈতিক ব্যর্থতা। আর রাষ্ট্র আইন করে তা প্রয়োগ না করে, ভেতরের দুর্নীতি দেখেও চোখ বন্ধ রেখে বসে আছে এটা রাষ্ট্রীয় উদাসীনতা, কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরাসরি সহযোগিতা।
তবে দুটির মধ্যে বেছে নিতে হলে বলব রাষ্ট্রীয় উদাসীনতাই বেশি বিপজ্জনক। কারণ ব্যক্তির লোভ নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব রাষ্ট্রের। রাষ্ট্র সেই দায়িত্ব না নিলে লোভের কোনো সীমা থাকে না।
রফিকুল ইসলাম এবার বাড়ি গেছেন কিন্তু পকেটের অনেকটা খালি করে। তাঁর সেই কষ্টার্জিত টাকা চলে গেছে দালালের পকেটে, সিন্ডিকেটের তহবিলে। আর রাষ্ট্র দূর থেকে দেখেছে, কিছু বলেনি।
বাড়ি ফেরার আবেগ অদম্য এটা এই দেশের মানুষ প্রতি ঈদে প্রমাণ করেন। কিন্তু সেই আবেগকে বারবার পুঁজি করে শোষণ করা হবে, রাষ্ট্র নীরব দর্শক হয়ে থাকবে এটা মেনে নেওয়া যায় না।

ঘরে ফেরার পথ বোঝা হয়ে উঠলে, সে পথে আর আনন্দ থাকে না থাকে শুধু বেঁচে থাকার লড়াই। একটি রাষ্ট্র যদি তার নাগরিকের উৎসবের দিনেও এই লড়াই থেকে মুক্তি না দিতে পারে, তাহলে সে রাষ্ট্র তার সবচেয়ে মৌলিক দায়িত্বে ব্যর্থ।

মোঃ তায়ীম খান
গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
E-mail :taiyemkhanofficial@gmail.com

লেখক: ছাত্র, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!