শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

স্বাধীনতার অর্ধশত পেরিয়ে

Author

শুভ কর্মকার , বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর

প্রকাশ: ২৫ মার্চ ২০২৬ পাঠ: ৩৫৮ বার

স্বাধীনতার অর্ধশত পেরিয়ে
স্বাধীনতার ইতিহাস বাংলাদেশের কমবেশি সকল মানুষ জানে। বাংলাদেশের সৃষ্টি হয়েছে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে। এই যুদ্ধের ইতিহাস, চেতনা একটি জাতিকে স্বাধীনভাবে গড়ে তুলতে সর্বদায় সাহায্য করে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সঠিক পথে পরিচালিত করার শক্তি জোগায়। ৩০ লক্ষ শহীদ এবং ২ লক্ষ মা বোনের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের বাংলাদেশ। এই ত্যাগের ইতিহাস শুধুমাত্র সংখ্যা নয়, বরং প্রতিটি সংখ্যার পেছনে লুকিয়ে আছে অসংখ্য স্বপ্ন, কষ্ট, ভালোবাসা এবং একটি স্বাধীন দেশের আকাঙ্ক্ষা। বাংলাদেশ নাম বলার সাথে সাথে ১৯৫২, ১৯৬৬, ১৯৬৯, ১৯৭১ এই সালগুলো সবার আগে আসে। এই সালগুলোর ইতিহাস আমাদের জানিয়ে দেয় একটি দেশ স্বাধীন করতে কত শত মানুষের নিরলস পরিশ্রম, সংগ্রাম এবং আত্মত্যাগ প্রয়োজন হয়। ভাষার জন্য জীবন দেওয়া দেশ পৃথিবীতে খুঁজে পাওয়া সত্যিই বিরল, আর সেই গৌরবের অধিকারী আমরা। শুধু ভাষা নয় সংস্কৃতি, বৈষম্য, অসাম্প্রদায়িকতা, শোষণ, শাসন সকল বিষয়ে নির্যাতিত ছিল এই দেশ এবং সেই নির্যাতনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েই জন্ম নিয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশ। এসব বিষয় চিন্তা করলেই অবাক লাগে, সেই সময়ের মানুষজন কত না কষ্ট সহ্য করেছে এই দেশ বিনির্মাণ করতে। তাদের স্বপ্ন ছিল একটি সুন্দর, বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে প্রতিটি মানুষ সমান অধিকার ভোগ করবে এবং স্বাধীনভাবে নিজের মতামত প্রকাশ করতে পারবে। কিন্তু স্বাধীনতার অর্ধশত বছর পেরিয়ে নিজের দেশের দিকে তাকালে একটি প্রশ্ন বারবার মনে আসে আমরা কি আসলেই পরিপূর্ণ স্বাধীন?যতদূর চোখ যায়, দেশ হিসেবে আমরা স্বাধীন কারণ আমাদের নিজস্ব ভূখণ্ড আছে, আমাদের পতাকা আছে, আমাদের ভাষা আছে, আমাদের জনসংখ্যা আছে এবং আমাদের সার্বভৌমত্বও আছে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আমরা একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃত। কিন্তু দেশের মানুষ কি তাদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা পুরোপুরি ভোগ করতে পারছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রেই মানুষ এখনো তার নিজস্ব স্বাধীনতা খুঁজে বেড়াচ্ছে। মত প্রকাশের সুযোগ কিছু কিছু জায়গায় থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে তা সীমাবদ্ধ। সুষ্ঠু পদক্ষেপের অভাব এবং মতের যথাযথ গুরুত্ব না পাওয়া আমাদের সমাজের একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যখন যে ক্ষমতায় থাকে, তখন সে-ই হয়ে ওঠে সর্বেসর্বা অন্যের মতামত শোনার বা মূল্যায়ন করার সময় যেন আর থাকে না। এমন মানসিকতা একটি গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য কখনোই কল্যাণকর হতে পারে না। প্রতিটি সেক্টরে নিজের পছন্দমতো লোক বসানোর প্রবণতা আমাদের সমাজে স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যায়। এর ফলে যোগ্যতার মূল্যায়ন কমে যায় এবং একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বারবার সুযোগ সুবিধা ভোগ করে। এতে করে সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা বাড়ে এবং তারা ধীরে ধীরে নিজেদের বঞ্চিত মনে করতে শুরু করে। ক্ষমতার রথ বদল হয়, কিন্তু ভাগ্য পরিবর্তন হয় কেবল গুটিকয়েক মানুষের এটাই বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।তাহলে সাধারণ মানুষ কবে প্রকৃত স্বাধীনতা পাবে? যে মানুষগুলো দেশের মূল শক্তি, যারা প্রতিদিন পরিশ্রম করে দেশের অর্থনীতি সচল রাখে, তারা কেন এখনো তাদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত থাকবে? যখন এমন একটি ধারণা তৈরি হয় যে ক্ষমতা হারালে অস্তিত্বও হারিয়ে যাবে, তখন সমাজের প্রতিটি স্তরে একটি অনিশ্চয়তা এবং ভয় কাজ করে। এই ভয় এবং অনিশ্চয়তা একটি স্বাধীন দেশের জন্য মোটেও কাম্য নয়। রাজনীতি মূলত ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে, যেখানে সাধারণ মানুষ অনেক সময়ই প্রান্তিক হয়ে যায়। অথচ সাধারণ মানুষ এসব কিছুর আগে বা পরে কোথাও নেই তারা শুধু চায় তাদের পরিবার নিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে বেঁচে থাকতে। তাদের চাওয়া খুবই সাধারণ, কিন্তু সেই সাধারণ চাওয়াগুলোই যেন সবচেয়ে কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাহলে তারা কোথায় তাদের মত প্রকাশ করবে? কবে তারা প্রকৃত অর্থে ক্ষমতায় অংশগ্রহণের সুযোগ পাবে? সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া গণআন্দোলন আমাদের নতুন করে স্বাধীনতার বার্তা দিয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে মানুষ এখনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারে এবং নিজেদের অধিকার আদায়ে সচেতন। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় এই আন্দোলনের পর আমরা কতটুকু পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছি? আমরা কি সত্যিই বৈষম্যহীন সমাজের দিকে এগিয়ে যেতে পারছি? যে কোটাব্যবস্থার বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন হয়েছে এবং যেখানে সকল শ্রেণির মানুষের অংশগ্রহণ ছিল, সেখানে কি সত্যিই সেই বৈষম্য দূর হয়েছে? নাকি এখনো একটি নির্দিষ্ট শ্রেণি সেই সুবিধা ভোগ করছে? যখন আন্দোলনে সবার অংশগ্রহণ থাকে, তখন তার সুফলও সবার মধ্যে সমানভাবে বণ্টিত হওয়া উচিত। কিন্তু বাস্তবে তা অনেক সময় দেখা যায় না, যা নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দেয়।স্বাধীনতার অর্ধশত বছর পেরিয়ে এসব বাস্তবতা আমাদের ভাবিয়ে তোলে। আমরা কি সত্যিই সেই স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়তে পেরেছি, যার জন্য আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা জীবন দিয়েছিলেন? তারা কি এমন একটি দেশের কথা ভেবেছিলেন, যেখানে বৈষম্য থাকবে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত থাকবে এবং সাধারণ মানুষ বঞ্চিত থাকবে? আমরা হয়তো ইতিহাস পড়ি, বিভিন্ন দিবসে বক্তৃতা দিই, সামাজিক মাধ্যমে দেশপ্রেমের কথা লিখি—কিন্তু সেই চেতনা কি আমরা সত্যিই আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ধারণ করতে পারি? বাস্তবে তার প্রতিফলন কতটুকু ঘটে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আমাদের নিজেদের কাছেই খুঁজতে হবে।স্বাধীনতা শুধুমাত্র একটি দেশের ভূখণ্ড বা পতাকা অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত স্বাধীনতা তখনই আসে, যখন দেশের প্রতিটি মানুষ সমান সুযোগ পায়, ন্যায়বিচার পায় এবং নিজের মতামত নির্ভয়ে প্রকাশ করতে পারে। সেই স্বাধীনতা অর্জন করা এখনো আমাদের জন্য একটি চলমান প্রক্রিয়া। যেদিন আমরা আমাদের দেশের ইতিহাস, চেতনা এবং মূল্যবোধ সত্যিকার অর্থে নিজের মধ্যে ধারণ করতে পারব, যেদিন আমরা ব্যক্তি স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সামষ্টিক কল্যাণের কথা ভাবতে পারব, সেদিনই আমরা একটি প্রকৃত স্বাধীন জাতি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারব। ততদিন পর্যন্ত স্বাধীনতার এই যাত্রা চলমান থাকবে প্রশ্ন থাকবে, আশা থাকবে, আর থাকবে একটি সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন।

লেখক: সম্পাদকীয় পর্ষদ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!