বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

স্বাধীনতার চেতনা ও বর্তমান বাস্তবতা

Author

মোঃ তায়ীম খান , Gopalgonj Science and Technology University, Gopalgonj

প্রকাশ: ২৫ মার্চ ২০২৬ পাঠ: ২৬৪ বার

স্বাধীনতার চেতনা ও বর্তমান বাস্তবতা: একটি তরুণের জিজ্ঞাসা

প্রতি বছর ২৬ মার্চ আসে। লাল-সবুজ পতাকা উড়ে। রাস্তায় র‍্যালি হয়, স্কুলে অনুষ্ঠান হয়, টেলিভিশনে মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র দেখানো হয়। কিন্তু একটি প্রশ্ন বারবার মনের ভেতরে কড়া নাড়ে যে স্বাধীনতার জন্য ত্রিশ লক্ষ মানুষ প্রাণ দিয়েছিলেন, সেই স্বাধীনতার চেতনা কি আজও আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজে প্রবহমান? নাকি শুধু আনুষ্ঠানিকতার মোড়কে সেটি কোথাও হারিয়ে গেছে?
প্রশ্নটি নতুন নয়। প্রতিটি প্রজন্মকেই এই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে। কিন্তু আজকের প্রজন্মের জন্য এটি বিশেষভাবে জরুরি কারণ আমরা স্বাধীনতার সাক্ষী নই, আমরা সেই স্বাধীনতার ফল ভোগ করছি। এই ফল যদি সুমিষ্ট হয়, তার কৃতিত্ব যাদের প্রাপ্য তাদের। কিন্তু যদি কোথাও তিক্ততা থাকে, যদি কোথাও অপ্রাপ্তি থাকে তার দায় এড়ানোর সুযোগ আমাদের নেই।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ কেবল একটি ভূখণ্ড অর্জনের সংগ্রাম ছিল না। এটি ছিল একটি স্বপ্নের যুদ্ধ সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের স্বপ্ন। মুক্তিযোদ্ধারা যখন যুদ্ধে গিয়েছিলেন, তখন তাদের মনে শুধু পাকিস্তানি শাসকদের বিতাড়নের কথা ছিল না তাদের চোখে ছিল এমন একটি বাংলাদেশের স্বপ্ন যেখানে কোনো মানুষ অনাহারে থাকবে না, কোনো শিশু শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হবে না, কোনো নাগরিক তার অধিকার থেকে বিচ্যুত হবে না। পঞ্চাশের বেশি বছর পরে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করতে হয় সেই স্বপ্নের কতটুকু বাস্তবে রূপ নিয়েছে?
চেতনার কথা বলি, বাস্তবতার কথাও বলি
স্বাধীনতার চেতনার কথা বলতে গেলে প্রথমেই আসে সাম্যের প্রসঙ্গ। কিন্তু আমাদের সমাজে কি সত্যিকারের সাম্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে? পরিসংখ্যান বলে ভিন্ন কথা। দেশের মোট সম্পদের বড় অংশ আজও মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত। গ্রামের একজন প্রান্তিক কৃষক যখন ঋণের ভারে নুয়ে পড়েন, শহরের একটি পরিবার যখন তাদের সন্তানের উচ্চশিক্ষার খরচ যোগাতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে যায় সে সময় ‘সোনার বাংলা’র স্বপ্নটি বড্ড ম্লান মনে হয়।
আবার অন্যদিকে তাকালে দেখা যায় অনেক অর্জনও। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মাথাপিছু আয়ের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। নারীর ক্ষমতায়নে, শিশুমৃত্যু হ্রাসে, গড় আয়ু বৃদ্ধিতে বাংলাদেশ বিশ্বে প্রশংসিত হয়েছে। কিন্তু এই অর্জনগুলোকে সামনে রেখে সীমাবদ্ধতাগুলো অস্বীকার করলে তা হবে আত্মপ্রতারণা। একটি জাতি তখনই সত্যিকার অর্থে এগিয়ে যায় যখন সে নিজের সাফল্য উদযাপনের পাশাপাশি নিজের ব্যর্থতাও স্বীকার করতে পারে।
মানবিক মর্যাদা: কতটুকু নিশ্চিত হয়েছে?
মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম মূল চেতনা ছিল প্রতিটি মানুষের মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করা। কিন্তু আজকের বাংলাদেশে কি প্রতিটি নাগরিক তার মর্যাদা নিয়ে বাঁচতে পারছে? রাস্তার পাশে ঘুমানো একজন ছিন্নমূল মানুষ, গার্মেন্টসে অমানবিক পরিশ্রম করা একজন শ্রমিক, কিংবা বিচার না পেয়ে দরজায় দরজায় ঘুরে বেড়ানো একজন নিরীহ মানুষ এরা কি সেই মানবিক মর্যাদার অংশীদার?
প্রশ্নটি কাউকে আঘাত করার জন্য নয়, বরং এটি একটি জাতীয় আত্মজিজ্ঞাসা। মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্ম যখন অস্ত্র হাতে মাঠে নেমেছিলেন, তখন তারা জানতেন এই যুদ্ধ কেবল পাকিস্তানের বিরুদ্ধে নয়, এটি সব ধরনের শোষণ, বৈষম্য ও অবিচারের বিরুদ্ধে। তাহলে কি আমরা সেই শোষণের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছি? নাকি নতুন রূপে পুরনো শোষণকেই মেনে নিচ্ছি?

আমরা যারা স্বাধীনতার পরের প্রজন্ম, তারা মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি। আমরা পড়েছি বইয়ে, শুনেছি বড়দের কাছে, দেখেছি চলচ্চিত্রে। কিন্তু এই যুদ্ধের চেতনা আমাদের রক্তে আছে কি? নাকি ২৬ মার্চ আর ১৬ ডিসেম্বর এই দুটি দিনেই আমাদের দেশপ্রেম সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে?
তরুণ প্রজন্মের সামনে আজ অনেক সংকট। বেকারত্ব, শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন, দুর্নীতির মাকড়সাজাল, পরিবেশ বিপর্যয় এই সমস্যাগুলো সমাধান না করলে স্বাধীনতার চেতনা কেবল কাগজে-কলমে থাকবে। কিন্তু আমি নিরাশাবাদী নই। কারণ এই তরুণ প্রজন্মই পারে পরিবর্তনের সূচনা করতে। ইতিহাস সাক্ষী, বাংলাদেশের প্রতিটি সংকটে তরুণরাই এগিয়ে এসেছে।
আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুদের দিকে তাকাই। তারা স্বপ্ন দেখে একটি ন্যায্য সমাজের। তারা চায় মেধার মূল্যায়ন হোক, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন গড়ে উঠুক, প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষেরাও সমান সুযোগ পাক। এই স্বপ্ন কি মুক্তিযোদ্ধাদের স্বপ্নের চেয়ে ভিন্ন? মোটেও না। এটাই সেই অসমাপ্ত বিপ্লব যা আমাদের প্রজন্মকে সম্পন্ন করতে হবে।

স্বাধীনতার চেতনাকে বারবার রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে এটি একটি তিক্ত সত্য। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে দলীয় স্বার্থ হাসিল করা, ভিন্নমতকে দমন করা, বা জাতীয় ঐক্যকে বিভক্ত করা এসবই মূলত সেই চেতনার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা। স্বাধীনতার চেতনা কোনো একটি দল বা গোষ্ঠীর একচেটিয়া সম্পত্তি নয়। এটি সমগ্র জাতির উত্তরাধিকার।
স্বাধীনতার প্রকৃত চেতনা হলো কোনো নাগরিককে তার মত প্রকাশের কারণে ভয়ে থাকতে হবে না, বিচার চাইতে গিয়ে হেনস্তা হতে হবে না, সৎভাবে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতে পারবে। এই চেতনা পুনরুদ্ধার করতে হলে সবার আগে দরকার একটি সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি, যেখানে সমালোচনাকে দেশদ্রোহ না বলে সংশোধনের সুযোগ হিসেবে দেখা হবে।

​নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদঅমর্ত্য সেন স্বাধীনতার সংজ্ঞাকে অর্থনৈতিক সক্ষমতার সাথে যুক্ত করেছেন
তার মতে-
“প্রকৃত স্বাধীনতা মানে কেবল ভোট দেওয়ার অধিকার নয়, বরং দারিদ্র্য, অশিক্ষা এবং অর্থনৈতিক সুযোগের অভাব থেকে মুক্তি পাওয়া। এই সক্ষমতাগুলো ছাড়া রাজনৈতিক অধিকারগুলো অর্থহীন হয়ে পড়ে।”
অর্থনীতির ছাত্র হিসেবে যখন দেশের আয়বৈষম্যের পরিসংখ্যান দেখি, তখন মনে হয় সেই কথাটি আজও সমান প্রাসঙ্গিক। দেশের একটি বড় অংশ এখনও দারিদ্র্যসীমার কাছাকাছি বা নিচে বাস করে। প্রান্তিক কৃষক, দিনমজুর, রিকশাচালক তাদের জীবনে স্বাধীনতার উপকার কতটুকু পৌঁছেছে, সেই প্রশ্নটি সৎভাবে করা দরকার।
তবে এটাও সত্য যে বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে অর্থনৈতিকভাবে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। রপ্তানি আয় বেড়েছে, রেমিট্যান্স প্রবাহ শক্তিশালী হয়েছে, গ্রামীণ অবকাঠামোর উন্নয়ন হয়েছে। কিন্তু এই প্রবৃদ্ধি যদি সমতাভিত্তিক না হয়, যদি শুধু উপরের তলার মানুষেরাই এর সুফল পায়, তাহলে সেটি মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্নের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
আমাদের করণীয় কী?
সমালোচনা করা সহজ। কিন্তু সমাধানের পথ বাতলানো কঠিন। তবু কিছু কথা বলা দরকার।
প্রথমত, স্বাধীনতার চেতনাকে আনুষ্ঠানিকতার বাইরে নিয়ে আসতে হবে। প্রতিটি পরিবারে, প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ সাম্য, ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা এই বিষয়গুলো নিয়ে সত্যিকারের আলোচনা হওয়া দরকার।
দ্বিতীয়ত, তরুণদের সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। শুধু সোশ্যাল মিডিয়ায় স্ট্যাটাস দিলে চলবে না, সমাজের প্রতিটি স্তরে ন্যায়ের পক্ষে কথা বলতে হবে। স্থানীয় সমস্যায় সাড়া দিতে হবে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। তৃতীয়ত, রাজনৈতিক নেতৃত্বকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। গণতন্ত্র কেবল ভোটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া যেখানে নাগরিকের প্রতিনিয়ত সজাগ থাকতে হয়।
চতুর্থত, শিক্ষাকে সত্যিকারের মানবিক শিক্ষায় পরিণত করতে হবে। পরীক্ষায় পাশ করা আর সার্টিফিকেট অর্জন করাই শিক্ষার লক্ষ্য হতে পারে না। শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানবতাবোধ, সমাজসচেতনতা ও ন্যায়বিচারের প্রতি অঙ্গীকার তৈরি করতে পারলেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে বেঁচে থাকবে।

স্বাধীনতা কোনো গন্তব্য নয়, এটি একটি চলমান যাত্রা। ১৯৭১ সালে যে পতাকা উঠেছিল, সেটি কেবল একটি শুরু ছিল। সেই যাত্রার প্রতিটি প্রজন্মকে নতুন করে অবদান রাখতে হয়। মুক্তিযোদ্ধারা তাদের অবদান রেখেছেন অস্ত্র হাতে। আমাদের প্রজন্মকে অবদান রাখতে হবে মেধায়, নৈতিকতায়, সততায় এবং মানবতার প্রতি অবিচল অঙ্গীকারে।
২৬ মার্চ যখন আসে, আমি শুধু উৎসব দেখি না। আমি দেখি একটি জাতির অঙ্গীকারের দিন। সেই অঙ্গীকার পূরণ করতে হলে শুধু পতাকা উড়ালে চলবে না সমাজের প্রতিটি কোণে ন্যায়বিচার, সাম্য ও মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে যেতে হবে। এটাই হবে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি আমাদের প্রকৃত শ্রদ্ধা, প্রকৃত কৃতজ্ঞতা।
স্বাধীনতার চেতনা মরে না শুধু আমরা যদি তাকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করি। সেই চেষ্টাই হোক এই স্বাধীনতা দিবসে আমাদের সবচেয়ে বড় প্রতিজ্ঞা।
গ্রামের মানুষের চোখে স্বাধীনতা
আমি হাওরাঞ্চলের সন্তান। প্রতি বছর বর্ষায় আমাদের গ্রামের মাঠ-ঘাট পানিতে ডুবে যায়। কৃষক বাবারা ফসল হারান, মাছ ধরে জীবিকা চালান। তাদের জীবনে স্বাধীনতা দিবস আসে ঠিকই, কিন্তু সেই দিনের উচ্ছ্বাস বেশিক্ষণ টেকে না। পরদিনই আবার সেই একই সংগ্রাম কীভাবে সংসার চলবে, ছেলেমেয়েকে পড়াশোনা করানো যাবে কি না, অসুখ হলে হাসপাতালে যাওয়ার সামর্থ্য আছে কি না।
এই মানুষগুলোর কাছে স্বাধীনতার মানে অনেক সরল নিরাপদে থাকা, পেট ভরে খাওয়া, সন্তানকে একটু ভালো ভবিষ্যৎ দেওয়া। এই সামান্য চাওয়াটুকুও যদি আমরা পূরণ করতে না পারি, তাহলে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করে কী লাভ? উন্নয়নের ঢাক বাজানোর আগে এই প্রশ্নটির উত্তর খোঁজা দরকার। রাজধানীর চকচকে আলো যতক্ষণ না প্রত্যন্ত গ্রামের অন্ধকার ঘরে পৌঁছায়, ততক্ষণ এই উন্নয়ন অসম্পূর্ণ।
তবু গ্রামের মানুষের অসাধারণ একটি গুণ আছে তারা হার মানে না। বন্যায় ফসল নষ্ট হলে পরের মৌসুমে আবার বীজ বোনে। এই মনোবলই মুক্তিযুদ্ধের আসল চালিকাশক্তি ছিল। সেই শক্তি এখনও গ্রামে-গঞ্জে বেঁচে আছে। রাষ্ট্রকে শুধু এটুকু করতে হবে সেই শক্তিকে সঠিক সুযোগ ও সম্পদ দিয়ে সহায়তা করতে।
মেধার অপচয়: জাতির সবচেয়ে বড় ক্ষতি
একটি স্বাধীন দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার মানুষ, বিশেষত তার মেধাবী তরুণ প্রজন্ম। কিন্তু প্রতি বছর হাজার হাজার মেধাবী শিক্ষার্থী দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে। কারণ কী? কারণ এই দেশে মেধার যথাযথ মূল্যায়ন নেই, গবেষণার সুযোগ নেই, স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া নেই। একজন মেধাবী ছাত্র যখন দেখে যোগ্যতার চেয়ে তদবির বেশি কাজে আসে, তখন সে হতাশ হয়ে পড়ে। এই হতাশা একটি ব্যক্তির ব্যর্থতা নয়, এটি রাষ্ট্রের ব্যর্থতা।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী একটি রাষ্ট্র কখনো তার সন্তানদের বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়াকে স্বাভাবিক মনে করতে পারে না। বরং তার দায়িত্ব হলো এমন পরিবেশ তৈরি করা যেখানে মেধাবীরা দেশেই থেকে দেশের কাজ করতে পারবে, উদ্ভাবন করতে পারবে, স্বপ্ন দেখতে পারবে। মস্তিষ্ক পাচার বন্ধ করতে হলে আগে মস্তিষ্কের কদর করতে শিখতে হবে।

মুক্তিযুদ্ধে নারীরা শুধু নির্যাতনের শিকার হননি, তারা সক্রিয়ভাবে যুদ্ধেও অংশ নিয়েছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়েছেন, খাবার দিয়েছেন, তথ্য সংগ্রহ করেছেন। অথচ স্বাধীনতার পরের দশকগুলোতে নারীর অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আমরা কতটুকু এগিয়েছি?
সত্য হলো, নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় অনেক ক্ষেত্রে এগিয়ে। প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, বিরোধীদলীয় নেতা রাজনীতির শীর্ষে নারীর অবস্থান এই অঞ্চলে বিরল। শিক্ষায় মেয়েদের অংশগ্রহণ বেড়েছে, কর্মক্ষেত্রে নারীর উপস্থিতি বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু একইসাথে ঘরে-বাইরে নারীর প্রতি সহিংসতা, যৌন হয়রানি, এবং বৈষম্য এখনও গভীর সমস্যা হয়ে আছে। একটি সত্যিকারের স্বাধীন দেশে নারী কেবল পরিসংখ্যানের সংখ্যা নয়, সে একজন পূর্ণ নাগরিক এই সত্যটি আমাদের সমাজের প্রতিটি স্তরে প্রতিষ্ঠিত হওয়া দরকার।

স্বাধীনতার চেতনায় কেবল বর্তমান প্রজন্মের কথা নেই, আছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথাও। কিন্তু আমরা কি সেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য দেশ রেখে যাচ্ছি? নদী দখল, বন উজাড়, শিল্পবর্জ্যে জলাশয় দূষণ, অপরিকল্পিত নগরায়ন — এগুলো কেবল পরিবেশের সমস্যা নয়, এগুলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকার হরণ। জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় শিকার যে দেশগুলো, বাংলাদেশ তাদের মধ্যে একটি। এই বাস্তবতায় পরিবেশ রক্ষা এখন আর ঐচ্ছিক বিষয় নয়, এটি জাতীয় অস্তিত্বের প্রশ্ন।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় যদি সত্যিই বিশ্বাস করি, তাহলে আমাদের এই মাটি, এই নদী, এই আকাশকে রক্ষা করতে হবে। কারণ এই ভূমির জন্যই তো লড়াই হয়েছিল। সেই ভূমিকে ধ্বংস করে দেওয়া মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সাথে সংগতিপূর্ণ নয়।
গণতন্ত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা
স্বাধীনতার মূল চেতনার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। একাত্তরে আমরা লড়েছিলাম কারণ পাকিস্তানি শাসকরা আমাদের ভাষা কেড়ে নিতে চেয়েছিল, আমাদের কথা বলার অধিকার কেড়ে নিতে চেয়েছিল। সেই রক্তের বিনিময়ে পাওয়া স্বাধীনতায় প্রতিটি নাগরিকের কথা বলার, লেখার, সমালোচনা করার অধিকার নিশ্চিত থাকা উচিত।
গণতন্ত্র কেবল নির্বাচনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একটি সুস্থ গণতন্ত্রে সংবাদমাধ্যম স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে, বিরোধী দল নির্ভয়ে মত প্রকাশ করতে পারে, সাধারণ নাগরিক সরকারের সমালোচনা করতে পারে। যেখানে ভয় আছে, যেখানে সমালোচনাকে শত্রুতা মনে করা হয় সেখানে গণতন্ত্র কেবল নামেই থাকে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করাই হওয়া উচিত আমাদের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য।
বিভেদ নয়, ঐক্যই পারে পরিবর্তন আনতে
১৯৭১ সালে জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল বলেই আমরা জয়ী হয়েছিলাম। হিন্দু-মুসলিম, বাঙালি-ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, শহর-গ্রাম সব পরিচয় ছাপিয়ে সেদিন একটাই পরিচয় ছিল: আমরা বাংলাদেশী। সেই ঐক্যই ছিল আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।
কিন্তু আজকের বাংলাদেশে বিভেদের রাজনীতি প্রবল। ধর্ম, বর্ণ, অঞ্চল, দল এই পরিচয়গুলো দিয়ে মানুষকে বিভক্ত করা হচ্ছে। এই বিভেদ কেবল সমাজকে দুর্বল করে না, এটি মুক্তিযুদ্ধের সেই ঐক্যের চেতনাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। আমাদের মনে রাখতে হবে আমরা যত বেশি বিভক্ত হব, ততই ক্ষমতাবানদের সুবিধা হবে, সাধারণ মানুষের ক্ষতি হবে।
স্বাধীনতা দিবস আমাদের সেই ঐক্যের কথা মনে করিয়ে দেওয়ার দিন। রাজনৈতিক পার্থক্য থাকবে, মতের ভিন্নতা থাকবে কিন্তু একটি সুন্দর, ন্যায্য, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নে আমরা সবাই এক। এই মিলনবিন্দুটি যদি আমরা ধরে রাখতে পারি, তাহলে আর কোনো শক্তি আমাদের থামাতে পারবে না।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কেবল বীরত্বের গল্প নয়, এটি একটি জাতির আত্মজাগরণের গল্প। সেই জাগরণ যদি আজও আমাদের মধ্যে অনুভব করতে পারি, যদি অন্যায় দেখলে ভেতরটা তোলপাড় হয়, যদি বঞ্চিত মানুষের কষ্টে হৃদয় ব্যথিত হয় তাহলে বুঝতে হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এখনও বেঁচে আছে। এই অনুভূতিকে কাজে পরিণত করাই হলো আমাদের এই প্রজন্মের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
এত সমালোচনার পরেও আমি হতাশ নই। কারণ এই দেশের মানুষ বারবার প্রমাণ করেছে তারা পারে। ১৯৭১ সালে যখন পুরো বিশ্ব সন্দেহ করেছিল, তখনও আমরা পেরেছিলাম। ১৯৯৮ সালের ভয়াবহ বন্যায় যখন দেশ ডুবে যাচ্ছিল, মানুষ একে অপরের পাশে দাঁড়িয়েছিল। করোনা মহামারির সময়েও দেখা গেছে বাংলাদেশের মানুষের অদম্য মনোবল। প্রতিটি সংকটে বাংলাদেশ উঠে দাঁড়িয়েছে, এবার উঠে দাঁড়াবে তার নিজস্ব অসঙ্গতি ও অসাম্যের বিরুদ্ধেও।
স্বাধীনতার চেতনা কোনো জাদুর কাঠি নয় যা একদিনে সব সমস্যা সমাধান করে দেবে। এটি একটি দিকনির্দেশনা, একটি নৈতিক কম্পাস। প্রতিটি সংকটে, প্রতিটি সিদ্ধান্তে যদি আমরা সেই কম্পাসের দিকে তাকাই ন্যায্য কি? সমতার পথে কি? মানবিক কি? তাহলে ধীরে ধীরে হলেও আমরা সঠিক গন্তব্যে পৌঁছাব। পথ দীর্ঘ, কিন্তু অসম্ভব নয়।
২৬ মার্চ তাই শুধু অতীতের স্মরণ নয়, এটি ভবিষ্যতের অঙ্গীকার। লাল-সবুজ পতাকা যে স্বপ্ন বুকে ধরে আছে, সেই স্বপ্ন পূরণ করার দায়িত্ব আমাদের প্রত্যেকের রাজনীতিবিদের, শিক্ষকের, শিক্ষার্থীর, কৃষকের, শ্রমিকের, সাংবাদিকের, লেখকের। ব্যক্তিগতভাবে প্রতিটি মানুষ যদি তার নিজের জায়গায় সৎ থাকে, ন্যায্য থাকে, মানবিক থাকে তাহলে সামগ্রিকভাবে দেশটা বদলে যাবে। স্বাধীনতার চেতনা মরে না শুধু আমরা যদি তাকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করি, প্রতিদিন, প্রতিটি কাজে, প্রতিটি সিদ্ধান্তে। এটাই হোক এই স্বাধীনতা দিবসে আমাদের সবচেয়ে বড় প্রতিজ্ঞা।

লেখক
নাম: মোঃ তায়ীম খান 
গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
E-mail :taiyemkhanofficial@gmail.com

লেখক: ছাত্র, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!