বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

চীনের বাঁধ প্রকল্প ও বাটারফ্লাই ইফেক্ট।

Author

মোহাম্মদ নাঈম মিজি , University of Chittagong

প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০২৫ পাঠ: ৩৭ বার

ছবি : কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।


 

মহাবিশ্বের জন্ম থেকে বড় বড় সবকিছুতে চেন রিয়েকশনে উপস্থিতি লক্ষণীয়। অর্থাৎ একটি ঘটনা তার পরবর্তী ঘটনার জন্য দায়ী। আর সেখানেই আলোচনায় আসে বাটারফ্লাই ইফেক্ট। পরাশক্তি হবার দৌড়ে চীনের উদ্যোগ মানুষের ধারণাকে ছাড়িয়ে যায়। তবে, তার নেতিবাচক প্রভাব দ্রুতই মানুষের অস্তিত্বে ধাক্কা মারে।


কোনো একটা সিস্টেমের মধ্যে ছোট পরিবর্তন পরবর্তীতে একটা বিরাট পরিবর্তন ঘটাতে পারে। যা ‘বাটারফ্লাই ইফেক্ট’-এর মূল ধারণা হিসেবে পরিচিত। যাকে চিত্রায়িত করা হয় এভাবে, পৃথিবীর একপ্রান্তে যদি একটি প্রজাপতি ডানা ঝাপটায় তাহলে তা অন্যপ্রান্তে হ্যারিকেনের জন্ম দিতে পারে! এই যদি হয় অবস্থা তাহলে ইয়ারলাং জেংবো নদীর গ্রেট বেন্ডে চীনের বাঁধ প্রকল্প দক্ষিণ এশিয়ার জন্য কতটা আত্মঘাতী সেই ভাবনার কূল-কিনারা মিলানো দায়। গত মাসের ১৯ জুলাই চীন তিব্বতে উৎপত্তি ব্রহ্মপুত্র (ইয়ারলাং জেংব) নদে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাঁধ তৈরির প্রকল্পের কাজ শুরু করেন এবং একই সঙ্গে এটা ইতিহাসের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প হতে যাচ্ছে। চীনা সরকারের ভাষ্যমতে- যা এ অঞ্চলের পরিবেশ ও রূপতত্ত্বের জন্য উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ।

ভূ-ভাগের ২.৫ শতাংশ অঞ্চলজুড়ে বিস্তীর্ণ ৩৬টি বায়োডাইভারসিটি অঞ্চল, যা অনন্য সব প্রাণী, উদ্ভিদ ধারণ করে ৮০০ কোটি মানুষের টিকে থাকার শক্তি জোগায়, তার দুটি অঞ্চল ব্রহ্মপুত্র নদের অববাহিকায় গড়ে উঠেছে- হিমালয় ও ইন্দো-বার্মা জীববৈচিত্র অঞ্চল। এ ছাড়াও চীন, ভারত, বাংলাদেশ ও ভুটান মিলে প্রায় ১১৪ মিলিয়ন মানুষ জল, বিদ্যুৎ, খাদ্য, কৃষি এবং মাছ ধরার জন্য ব্রহ্মপুত্র নদের অববাহিকার ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশে ৫৮ মিলিয়ন, ভারতে ৩৯ মিলিয়ন, চীনে ১৬ মিলিয়ন এবং ভুটানে ৭০০ হাজার মানুষ। ভারতের ৩০ শতাংশ বিশুদ্ধ পানির বাহক এই নদ। বাংলাদেশে যমুনা নদীর তীরবর্তী মানুষ বর্ষা মৌসুমে কৃষির জন্য যমুনার নদীর ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এমনি এক আন্তঃসীমান্ত ও বিশ্ব জীববৈচিত্র্যের বাহক নদীতে চীনের একতরফা বাঁধ প্রকল্প নিঃসন্দেহে ‘চরম ভূ-খণ্ডগত সার্বভৌমত্ব’ নীতির অনুসরণ।

তিব্বতের হিমালয়ের পাদদেশ থেকে উৎপত্তি হওয়া নদীর শক্তিশালী প্রবাহে (Great Bend) Yarlung Zangbo Hydropower Project-এর আওতায় একে একে পাঁচটি বাঁধ তৈরির মাধ্যমে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। ১৬৭.১ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে এই বাঁধটি চীন ও ভারতের বিতর্কিত সীমান্তে ভারত থেকে ৩০ কিমি দূরে নির্মিত হবে। ৬০ গিগাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন জল বিদ্যুৎকেন্দ্র, যা বার্ষিক প্রায় ৩০০ মিলিয়ন মেগাওয়াট ঘণ্টা (MWh) বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। অর্থাৎ, প্রকল্পিত পাঁচটি জল বিদ্যুৎকেন্দ্র বছরের প্রায় ৫৭ শতাংশ সময় চলমান থাকবে। চীনা সরকার ও মিডিয়া এই প্রকল্পকে ‘উইন উইন সল্যুশন’ হিসেবে প্রচার করছে কারণ এই প্রকল্পের ফলে একদিকে যেমন পরিবেশ দূষণ হ্রাস পাবে, অন্যদিকে গ্রামীণ তিব্বতে বিদ্যুৎ সরবরাহ হবে গ্রিন এনার্জির মাধ্যমে। অধিকন্তু, এর রাজনৈতিক ফায়দাও বিশাল। অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক থিংক ট্যাঙ্ক ২০২০ সালে জানিয়েছে, ব্রহ্মপুত্র নদীর নিয়ন্ত্রণ নেওয়া চীনের জন্য ভারতের অর্থনীতির পিছন থেকে গলা চেপে ধরার মতো।

বলা বাহুল্য, একটি জল বিদ্যুৎকেন্দ্রের কী পরিমাণ সময়, কতটুকু জল স্টোরেজ করে রাখার সক্ষমতা থাকলে তা বছরে ৩০০ মিলিয়ন মেগাওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে তা অনুমান যোগ্য। ফলশ্রুতিতে, এই বাঁধ প্রকল্প, উন্নয়ন কাজ ও জলবায়ু পরিবর্তনের দরুন নিম্ন অববাহিকার দেশে বন্যা ও খরার প্রবণতা বৃদ্ধি পাবে সন্দেহাতীতভাবে। এমনকি নিম্ন অববাহিকার দেশে নদীর গতিপথ পাল্টে যেতে পারে। যা দেশগুলোর অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেবার জন্য যথেষ্ট। হিমালয় ও ইন্দো-বার্মা বিশ্বের অন্য জীববৈচিত্র্য অঞ্চল থেকে সর্বাধিক প্রাণী ও মানুষের ধারক হিসেবে পরিচিত। হিমালয়ের ফলে উত্তরের শীতল বাতাস ইন্দো প্যাসিফিকে প্রবেশে বাঁধা প্রাপ্ত হয় ও মেঘ আটকে রেখে খরা থেকে রক্ষা করতেই এর গুরুত্বের ইতিটানা সম্ভব হয় না অধিকন্তু, প্রবল বৃষ্টির কারণেন এই প্যাসিফিক কৃষির ভূ-স্বর্গে পরিণত হয়েছে। একদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলের হিমালয়ের বরফ গলে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বাড়াচ্ছ, অন্যদিকে, চীনের যুগান্তকারী বাঁধ প্রকল্প মানুষকে চিন্তিত করছে। প্রকৃতির স্বাভাবিক স্বভাবে কৃত্রিম পরিবর্তন সর্বদা বিরূপ ফল বয়ে আনে।

মহাবিশ্বের জন্ম থেকে বড় বড় সবকিছুতে চেন রিয়েকশনে উপস্থিতি লক্ষণীয়। অর্থাৎ একটি ঘটনা তার পরবর্তী ঘটনার জন্য দায়ী। আর সেখানেই আলোচনায় আসে বাটারফ্লাই ইফেক্ট। পরাশক্তি হবার দৌড়ে চীনের উদ্যোগ মানুষের ধারণাকে ছাড়িয়ে যায়। তবে, তার নেতিবাচক প্রভাব দ্রুতই মানুষের অস্তিত্বে ধাক্কা মারে।

পরিবেশ রক্ষার আড়ালে গ্রিন এনার্জি উৎপাদনের নামে নদীতে বাঁধ প্রকল্প হয়তোবা জীববৈচিত্র ধ্বংসের কারণ হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অতিরিক্ত বরফ গলা থেকে শুরু করে উচ্চ ভূমিকম্প প্রবণ অঞ্চল হিসেবে পরিচিত তিব্বত ও গ্রেট বেন্ড-এ বাঁধ প্রকল্প ‘বাটারফ্লাই ইফেক্টে’ রূপ নিয়ে এই অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য ও অর্থনীতি ধ্বংস করে দেবার মতো যথেষ্ট সামর্থ্য রাখে। হতাশার বিষয় হলো এই যে, চায়না এনার্জি হাঙরি রাষ্ট্র হওয়ায় সন্দেহাতীতভাবে এই বাঁধ প্রকল্প গ্রিন এনার্জি উৎপাদন করে পরিবেশ দূষণ হ্রাস করবে। কিন্তু এই বাঁধ ধীরে ধীরে ব্রহ্মপুত্র নদের স্বাভাবিক প্রবাহ নষ্ট করে এই অঞ্চলের জীব বৈচিত্র্য ধ্বংস করবে অথবা দক্ষিণ এশিয়া একটি ভয়াবহ বিপর্যয়ের সন্ধিক্ষণে অবস্থান করছে ।


 *Mohammad Nayem | Mizee |

লেখক: Secretary for Literature and Publication, University of Chittagong || সাহিত্য ও প্রকাশনা বিষয়ক সম্পাদক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ২৩ আগস্ট ২০২৫ তারিখে প্রতিদিনের সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!