বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন
হোম / ফিচার / নিবন্ধ

হাজার পাওয়ারি রং”-এর মতো শৈশবের পহেলা বৈশাখ

Author

শুভ কর্মকার , বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর

প্রকাশ: ১৫ এপ্রিল ২০২৬ পাঠ: ৪৯ বার

 

জীবনে আমরা যা ফেলে আসি, সবই একদিন স্মৃতি হয়ে যায়। আর সেই স্মৃতিগুলোর মধ্যে কিছু বিশেষ দিনের স্মৃতি মনে পড়লে সত্যিই অন্যরকম ভালো লাগে। মনে হয় ইশ! যদি আবার সেই দিনগুলোতে ফিরে যেতে পারতাম। কিন্তু তা তো আর সম্ভব নয়। আমার কাছে যেগুলো আজও ভালো লাগার স্মৃতি, অন্য কারো কাছে হয়তো সেগুলো শুধুই ছোটবেলার পাগলামি। এখন সবাই ব্যস্ত কেউ কাজে, কেউ পড়াশোনায়, কেউ সংসারে। এসব বিশেষ দিনের কথা ভাবার সময় যেন কারোই নেই। তবুও আমার কাছে সেই এলাকার বৈশাখের দিনগুলো এখনো স্পষ্ট। জীবনে ২২টা পহেলা বৈশাখ কাটালেও, সেই ছোটবেলার এলাকার উদযাপনটাই ছিল সেরা। মনে পড়ে, তখন হয়তো ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ি। এলাকার কিছু বড় ভাইদের উদ্যোগে পহেলা বৈশাখ উদযাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। কী যে আয়োজন! শোভাযাত্রা, “যেমন খুশি তেমন সাজো”, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আরও কত কী! সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়লে আজও অবাক লাগে সত্যিই কি এমন হতো আমাদের এলাকায়? এখন সবকিছু যেন মরুভূমির মতো নির্জন। নেই কোনো আয়োজন, নেই খেলাধুলা, নেই সেই ভ্রাতৃত্ববোধ। আছে শুধু লোক দেখানো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পোস্ট, মোবাইল গেম, ঘোরাঘুরি আর ছবি তোলার প্রতিযোগিতা। প্রযুক্তি যত উন্নত হয়েছে, মানুষ যেন ততটাই দূরে সরে গেছে একে অপরের কাছ থেকে।
কোথায় গেল সেই সকালের উৎসব, রাতের আনন্দ, খাওয়া দাওয়ার আয়োজন? সবই এখন স্মৃতির এক কোণে জমে আছে। মাঝে মাঝে সেই সময়ের মানুষগুলোর সাথে এসব নিয়ে কথা বললে মনে হয় সবকিছু যেন চোখের সামনে আবার ভেসে উঠছে।
আমাদের সময় পহেলা বৈশাখ উদযাপন হতো দুই দিন। একদিন বাংলা তারিখ অনুযায়ী, আরেকদিন পঞ্জিকা মতে। দ্বিতীয় দিন বাসায় গণেশ পূজা হতো নতুন বছর যেন ভালোভাবে শুরু হয়, সকল দুঃখ-কষ্ট দূর হয়ে নতুন উদ্যমে জীবন এগিয়ে যায় এই প্রার্থনায়। পহেলা বৈশাখের দিনের কথা তো বলাই হয়নি! আগের রাতেই ঘড়িতে অ্যালার্ম দিয়ে রাখতাম সকাল ৬টায় উঠবো। কিন্তু উত্তেজনায় তার আগেই ঘুম ভেঙে যেত। দৌড়ে চলে যেতাম মোড়ে দেখি কেউ এখনো আসেনি! তারপর একে একে সবাইকে ডাকাডাকি করে জড়ো করা হতো।ছোটদের বলা হতো, সবাই যেন নিজের বাড়ি থেকে সেজে আসে কারণ ছেলেদের তো এসব সাজগোজে ধৈর্য নেই! তারপর শুরু হতো রং খেলা। কী ভয়ংকর রং ২-৩ দিনেও উঠতো না! আমরা একে বলতাম “হাজার পাওয়ারি রং”। কেউ কেউ স্প্রে মেশিন দিয়ে রং ছিটাতো। শেষে এমন অবস্থা হতো যে, সবার চেহারা ভূতের মতো কাউকে চিনে নেওয়ার উপায়ই থাকতো না! এরপর শুরু হতো শোভাযাত্রা। সেই শোভাযাত্রার আনন্দ যে কতটা ছিল, তা বলে বোঝানো কঠিন। চারপাশে ঢাকের শব্দ, রঙিন সাজ, হাসি-আনন্দ সব মিলিয়ে এক অন্যরকম পরিবেশ। শোভাযাত্রা শেষে শুরু হতো খেলাধুলা সাঁতার, দৌড়, লাফ, বিভিন্ন প্রতিযোগিতা দিনটা যেন থামতেই চাইতো না। সকালের পর্ব শেষে বিকেলের জন্য থাকতো নতুন উত্তেজনা ক্রিকেট খেলা। কে কোন দলে খেলবে, কখন খেলা শুরু হবে এসব নিয়ে আলোচনা চলতো জোরেশোরে। খেলা শেষে থাকতো ঠান্ডা পানীয় বা “ঠান্ডা বাজি” যা সেই ক্লান্ত শরীরে এনে দিতো এক অদ্ভুত তৃপ্তি। সত্যি বলতে, শৈশবের সেই দিনগুলো ছিল অমূল্য। কিছু ছোটখাটো আক্ষেপ হয়তো ছিল, কিন্তু সেগুলো না থাকলে হয়তো সুখের মূল্যটাই বোঝা যেত না। তবুও মনে হয় সেই সময়টাতে আমি ছিলাম পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষের একজন। পরের দিন নতুন পোশাক পরে বাসায় নববর্ষ উদযাপন পরিবারের সাধ্যমতো কত আয়োজন! সবার বিশ্বাস ছিল, বছরের প্রথম দিন ভালো কাটলে পুরো বছরটাই ভালো যাবে। তাই সেদিন বাসায় কোনো দুষ্টুমি বা ভুল করলেও তেমন বকা দেওয়া হতো না এটাই ছিল সবচেয়ে ভালো লাগার বিষয়গুলোর একটি।নববর্ষের সকালে বাবার সাথে দোকানে যাওয়াও ছিল বিশেষ একটি দায়িত্ব। দোকান পরিষ্কার করা, জিনিসপত্র ধোয়া এসব কাজ করতাম খুব আনন্দ নিয়ে, যদিও বছরের অন্য সময়ে তেমন সাহায্য করা হতো না! কাজ শেষে তাড়াতাড়ি স্নান করে প্রস্তুত হতাম পূজার জন্য পুরোহিত দাদা আসবেন, অঞ্জলি দিতে হবে। গণেশ ঠাকুরের কাছে প্রার্থনা করতাম নতুন বছর যেন ভালো কাটে, সবার জীবনে সুখ-শান্তি আসে। এই প্রার্থনার মধ্যেই যেন লুকিয়ে থাকতো এক নতুন শুরুর আশাবাদ। আসলে এসব খুব বেশি পুরোনো স্মৃতি নয়, তবুও মনে হয় যেন বহু আগের কথা। সময় বদলেছে, মানুষ বদলেছে, বদলে গেছে উদযাপনের ধরনও। এখন অনেক কিছুই আছে, কিন্তু সেই অনুভূতিটা যেন আর নেই।আজকের নববর্ষ যেন অনেকটাই অনুভূতিহীন একটু লোকদেখানো, একটু আনুষ্ঠানিক। কিন্তু আমার কাছে শৈশবের সেই বৈশাখ আজও রঙিন ঠিক সেই “হাজার পাওয়ারি রং”-এর মতো, যা সময়ের স্রোতেও মুছে যায় না।

লেখক: সম্পাদকীয় পর্ষদ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!