Orientalism: ঔপনিবেশিক ধারণা থেকে ডিজিটাল যুগের স্টেরিওটাইপ
বিশ্বায়নের যুগে পৃথিবী যেন ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে। ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বৈশ্বিক সংস্কৃতির বিস্তারের ফলে মানুষ একে অপরের সম্পর্কে আগের চেয়ে অনেক বেশি জানার সুযোগ পাচ্ছে। কিন্তু এই জানার প্রক্রিয়া কি সবসময় নিরপেক্ষ? নাকি আজও কিছু পুরোনো ধারণা ও ক্ষমতার কাঠামো আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে ফিরে যেতে হয় ‘Orientalism’ বা প্রাচ্যবাদ ধারণার কাছে।
১৯৭৮ সালে ফিলিস্তিনি-মার্কিন বুদ্ধিজীবী এডওয়ার্ড সাঈদ তাঁর আলোড়ন সৃষ্টিকারী গ্রন্থ Orientalism এ দেখান যে, পশ্চিমা জ্ঞানচর্চা, সাহিত্য, শিল্প ও রাজনীতিতে প্রাচ্যকে রহস্যময়, অযৌক্তিক, পশ্চাৎপদ, স্বৈরাচারপ্রবণ, কামুক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে অন্যদিকে পশ্চিমাকে দেখানো হয়েছে যুক্তিবাদী, আধুনিক, সভ্য, প্রগতিশীল, উন্নত সভ্যতা হিসেবে। অথচ বীজগণিতের বিকাশে Muhammad ibn Musa al-Khwarizmi এর অবদান, জ্যোতির্বিজ্ঞান, চিকিৎসাবিজ্ঞান ও অপটিক্সে Ibn al-Haytham এর কাজ, চিকিৎসাশাস্ত্রে Ibn Sina এর প্রভাব শতাব্দীর পর শতাব্দী ইউরোপে ছিল। কিন্তু তারপরও Orientalist বর্ণনায় প্রাচ্যকে অযৌক্তিক বা বিজ্ঞানবিমুখ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এডওয়ার্ড সাঈদের মতে, এটি কেবল সাংস্কৃতিক উপস্থাপন নয় বরং একটি রাজনৈতিক প্রকল্প, যা ঔপনিবেশিক শাসনের নৈতিক বৈধতা তৈরিতে সহায়তা করেছে। কারণ কোনো জনগোষ্ঠীকে অযোগ্য বা পশ্চাৎপদ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা গেলে তাকে শাসন করাও সহজ হয়ে যায়।
এডওয়ার্ড সাঈদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল এই সত্যটি উন্মোচন করা যে, জ্ঞান কখনোই সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ নয়। জ্ঞান উৎপাদন প্রায়ই ক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত। যে পক্ষ বর্ণনা করার ক্ষমতা রাখে, অনেক সময় সেই পক্ষই বাস্তবতাকে সংজ্ঞায়িত করার ক্ষমতাও অর্জন করে।
ঔপনিবেশিক যুগে ইউরোপীয় ভ্রমণকাহিনি, উপন্যাস ও চিত্রকলায় প্রাচ্যের যে ছবি আঁকা হয়েছিল তা বাস্তবতার সাথে অনেক বেশি সাংঘর্ষিক ছিল । “others” হিসেবে প্রাচ্যকে নির্মাণ করা হয়েছিল এমনভাবে যাতে পশ্চিমা আধিপত্যকে, পশ্চিমা “self” ধারণাকে স্বাভাবিক বলে মনে হয়। ওরিয়েন্টালিজমে পাশ্চাত্য প্রাচ্যকে তার বাস্তব জটিলতায় দেখেনি বরং কয়েকটি স্টেরিওটাইপের মাধ্যমে একটি বিশাল ও বৈচিত্র্যময় ভূখণ্ডকে একক পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করেছে। Orientalism এর সমালোচকরা বলেন, পশ্চিমারা প্রাচ্যের অর্জন অস্বীকার করেনি সবসময়, কিন্তু তারা এমন একটি narrative তৈরি করেছিল যেখানে প্রাচ্যের সাফল্যগুলো গৌণ হয়ে যায় এবং দুর্বলতাগুলো হয়ে ওঠে প্রধান পরিচয়।
ঔপনিবেশিক যুগের অবসানের পর অনেকেই ভেবেছিলেন, আধিপত্যের সেই ইতিহাসও শেষ হয়ে গেছে। একসময় সাম্রাজ্যবাদ প্রতিষ্ঠিত হতো বন্দুক, জাহাজ ও সেনাবাহিনীর মাধ্যমে। আজ আধিপত্যের ভাষা বদলেছে কিন্তু আধিপত্য নিজে বিলুপ্ত হয়নি। বরং তা নতুন রূপে, নতুন প্রযুক্তিতে এবং নতুন narrative এ আমাদের সামনে হাজির হয়েছে। এ কারণেই সমকালীন চিন্তাবিদেরা ‘নিউ কলোনিয়ালিজম’ বা নব-উপনিবেশবাদের ধারণা সামনে এনেছেন। নব-উপনিবেশবাদ সরাসরি ভূখণ্ড দখলের মাধ্যমে পরিচালিত হয় না। বরং এটি কাজ করে ঋণনীতি, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক প্রভাব এবং প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে। একটি রাষ্ট্র রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন হলেও তার অর্থনীতি, তথ্যপ্রবাহ কিংবা প্রযুক্তিগত অবকাঠামো যদি বহিরাগত শক্তির ওপর নির্ভরশীল থাকে, তবে সেই স্বাধীনতা অনেকাংশেই সীমিত হয়ে পড়ে।
ডিজিটাল যুগে এই প্রবণতা নতুন মাত্রা পেয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম এমন বিষয়কে বেশি ছড়িয়ে দেয়, যা মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করে। ফলে কোনো অঞ্চলের ব্যতিক্রমী বা নেতিবাচক ঘটনা কখনো কখনো পুরো সমাজের প্রতিনিধিত্বকারী চিত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এই প্রক্রিয়ায় পুরোনো স্টেরিওটাইপ নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে পুনরুৎপাদিত হতে থাকে। একবিংশ শতাব্দীতে এই প্রক্রিয়া আরও জটিল রূপ নিয়েছে, যার নাম ‘ডেটা কলোনিয়ালিজম’। মানব ইতিহাসে আগে কখনো ব্যক্তিগত তথ্য এত বিপুল পরিমাণে সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণ করা হয়নি। ডেটা কলোনিয়ালিজমের ধারণা বলছে, প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো মানুষের আচরণ, পছন্দ, অভ্যাস ও সামাজিক সম্পর্ককে তথ্যের মাধ্যমে সংগ্রহ করে নতুন ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষমতা অর্জন করছে। অতীতে উপনিবেশিক শক্তিগুলো যেমন দূরবর্তী অঞ্চল থেকে কাঁচামাল আহরণ করত, আজকের ডিজিটাল অর্থনীতিতে তথ্য হয়ে উঠেছে সেই নতুন কাঁচামাল। পার্থক্য শুধু এতটুকু যে, এবার সম্পদ আহরণ করা হচ্ছে মানুষের দৈনন্দিন জীবন থেকে। এখানেই ওরিয়েন্টালিজমের সঙ্গে ডেটা কলোনিয়ালিজমের একটি গভীর সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যায়। উভয় ক্ষেত্রেই ক্ষমতার কেন্দ্র অন্যকে সংজ্ঞায়িত করার অধিকার নিজের হাতে রাখতে চায়। একসময় প্রাচ্যকে নিয়ে গল্প লেখা হতো পশ্চিমা দৃষ্টিকোণ থেকে আজ মানুষের আচরণ, পরিচয় ও সামাজিক বাস্তবতাকে অ্যালগরিদমের ভাষায় অনুবাদ করা হচ্ছে প্রযুক্তিগত ক্ষমতার কেন্দ্রগুলোতে। উভয় ক্ষেত্রেই প্রশ্নটি একই কে কাকে বর্ণনা করছে এবং সেই বর্ণনার নিয়ন্ত্রণ কার হাতে?
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে এই প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ অ্যালগরিদম নিরপেক্ষ নয় এগুলো মানুষের তৈরি তথ্যভান্ডার থেকে শেখে। যদি সেই তথ্যভান্ডারে বৈষম্য, স্টেরিওটাইপ বা ক্ষমতার অসমতা বিদ্যমান থাকে, তবে প্রযুক্তিও সেই অসমতাকে পুনরুৎপাদন করতে পারে। ফলে ডিজিটাল প্রযুক্তি কেবল মুক্তির সম্ভাবনাই নয়, আধিপত্যের নতুন অবকাঠামোও তৈরি করতে পারে। তবে Orientalism এর সমালোচনা মানে পশ্চিমকে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করা নয়। বরং এর উদ্দেশ্য হলো জ্ঞান উৎপাদনের প্রক্রিয়াকে প্রশ্ন করা এবং বিভিন্ন সমাজকে তাদের নিজস্ব কণ্ঠে উপস্থাপনের সুযোগ সৃষ্টি করা। আজকের বিশ্বে আন্তঃসাংস্কৃতিক বোঝাপড়া, বহুমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং পারস্পরিক সম্মান আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রয়োজন।
Orientalism আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, কোনো সমাজকে বোঝার আগে তার সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাগুলোকে সমালোচনামূলকভাবে পরীক্ষা করা জরুরি। এই New colonialism থেকে বেড়িয়ে আসার অন্যতম উপায় হচ্ছে narrative কে প্রশ্ন করা, নিজস্ব কণ্ঠস্বরকে পুনঃধারণ করা। কারণ বাস্তব পৃথিবী কখনোই একরৈখিক নয় প্রতিটি সমাজের রয়েছে নিজস্ব ইতিহাস, জটিলতা ও বৈচিত্র্য। সেই বৈচিত্র্যকে স্বীকৃতি দেওয়াই হতে পারে আরও ন্যায়সংগত ও মানবিক বৈশ্বিক সম্পর্কের ভিত্তি।
