নবী – রাসূলদের পূণ্যভূমি ‘শাম’

আশ-শাম হলো পৃথিবীর প্রাচীনতম ও ইসলামের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলোর মধ্যে অন্যতম। আজকের চারটি আরব রাষ্ট্র সিরিয়া, লেবানন, জর্ডান, ফিলিস্তিন বিশ্বের ক্যান্সার হিসেবে খ্যাত একমাত্র ইহুদি রাষ্ট্র, দখলদার ইসরাইল রাষ্ট্র ও মিশরের সিনাই উপত্যকা নিয়ে আশ-শাম গঠিত। পৃথিবীর কেন্দ্রস্থল মক্কা থেকে এটি উত্তর দিকে অবস্থিত। এর পশ্চিমে ভূমধ্যসাগর, দক্ষিণ জাযীরাতুল আরবের মরুভূমি ও লোহিত সাগর, পূর্বে ইরাকের সবুজ ছায়া সমৃদ্ধ এলাকা, দক্ষিণ-পশ্চিমে সমৃদ্ধ ইতিহাসের অধিকারী মিশর ও উত্তরে অটোমান সাম্রাজ্যের পিতৃভূমি তুরস্কের আনাতোলিয়া মালভূমি অবস্থিত। আজকে আলোচনা করব ইসলাম ও পৃথিবীর সভ্যতার ইতিহাসে প্রাচীনতম ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই ভূখণ্ড এবং নবুওয়াত ও কিতাব নাযিলের স্থান হিসেবে এর গুরুত্ব নিয়ে।
আশ-শামের সাথে পূর্ববর্তী নবী-রাসূলগণের সম্পর্ক: পূর্ববর্তী নবী-রাসূলগণের সাথে আশ-শাম ভূমির সম্পর্ক ছিল অবিচ্ছিন্ন, অবিচ্ছেদ্য ও গভীর। পৃথিবীতে প্রেরিত নবী – রাসূলগণের বিশাল অংশের জন্মস্থান, পিতৃভূমি নবুওয়াত লাভ ও ইসলাম প্রচারের মারকায হওয়ার সুবাদে আশ-শাম বরাবরই মুসলিমদের নিকট নবুওয়াতের দোলনা হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
এটি বহুসংখ্যক আসমানী কিতাব নাযিলের স্থান হিসেবেও সুপরিচিত। হযরত ইব্রাহীম (আ.) এখানে জীবনের বেশিরভাগ সময় অবস্থান করেছেন। তাঁরই পরিবারের সদস্য এবং দুই পুত্র হযরত ইসমাঈল ও ইসহাক (আ.) ফিলিস্তিনে জন্মগ্ৰহণ করেন। হযরত ইসহাক (আ.) এর পুত্র হযরত ইয়াকুব (আ.) এখানকার স্থায়ী বাসিন্দা ছিলেন। হযরত ইব্রাহীম (আ.) এর ভাগিনা ও কুরআনে বর্ণিত আল্লাহর আরেক নবী হযরত দূত (আ.) ছিলেন আমুরা ও সাদুম এলাকার নবী।
এখানকার অন্তর্গত সিনাই উপত্যকার ‘তূর’ পাহাড়ে হযরত মূসা (আ.) নবুওয়াত ও ‘তাওরাত’ কিতাব লাভ করেন। হযরত হারুন (আ.) কে তাঁর সহকারী নিযুক্ত করা হয় এবং নবুওয়াত দেয়া হয়। সারা পৃথিবীর প্রথম শাসনকর্তা হযরত দাউদ (আ.) এর শাসনের কেন্দ্রস্থল ছিল আশ-শামের ফিলিস্তিন অংশ। তাঁকে ‘যাবুর’ কিতাব দেয়া হয়েছিল। তাঁর পুত্র হযরত সুলাইমান (আ.) কে আল্লাহ তায়ালা বিশ্বজোড়া রাজত্ব ও প্রভাব প্রতিপত্তি দান করেছিলেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, “সে (হযরত সুলাইমান আলাইহিস সালাম) বলল, “হে আমার প্রভু, আমাকে ক্ষমা করুন এবং এমন রাজত্ব দান করুন, যা লাভ করা আমার পর আর কারো পক্ষে সম্ভব হবে না, নিশ্চয় আপনি দাতা”।” (সুরা সোয়াদ: ৩৫)
এ অঞ্চলের অন্য নবীদের মধ্যে রয়েছে হযরত ইলিয়াস (আ.), আল ইয়াসা (আ) এবং আল খিদর (আ.) প্রমুখ।
হযরত ইমরান (আ.) এর পরিবারের অন্তর্ভুক্ত দুই নবী ও রাসূল হযরত ঈসা (আ.) ও হযরত ইয়াহইয়া (আ.) এখানেই জন্মগ্ৰহণ করেন, নবুওয়াত ও কিতাব লাভ করেন এবং তাঁদের দ্বীন প্রচারের মারকায হিসেবে নির্ধারণ করেন। কুরআন ও হাদীসের বিভিন্ন রেওয়ায়াত থেকে জানা যায়, হযরত ঈসা (আ.) কে আল্লাহ তায়ালা এখানকার প্রধান শহর দামেশক থেকে আসমানে উঠিয়ে নিয়েছিলেন।
কুরআনুল কারীমের সুরা ইয়াসিনে বর্ণিত তিনজন নবীর মারকায ছিল সিরিয়ার ইনতাকিয়া অঞ্চলে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, “ আর (হে নবী) আপনি তাদের নিকট সেই জনপদের বাসিন্দাদের উদাহরণ পেশ করুন, যখন তাদের নিকট রাসূলগণ (প্রেরিত নবীগণ) এসেছিলেন।” (সুরা ইয়াসিন:১৩) এদের বাইরেও কয়েকজন ব্যতীত বাকিরা সকলেই এখানকার কোনো না কোনো অঞ্চলের সাথে সম্পর্কিত রয়েছেন।
হযরত মুহাম্মদ (সা.) ও আশ-শাম: হযরত মুহাম্মদ (সা.) নবুওয়াতপূর্ব জীবনে বাণিজ্য উপলক্ষে বহুবার আশ-শাম অঞ্চলে এসেছেন। তিনি তাঁর চাচা আবু তালিবের সাথে কৈশোরকালে বিভিন্ন সময়ে ব্যবসা করতে এসেছিলেন। যৌবনকালে আরবের শ্রেষ্ঠ ধনী ব্যবসায়ী এবং তাঁর প্রথমা স্ত্রী সাইয়্যেদা খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদ (রা.) এর বাণিজ্যবহর নিয়ে সিরিয়ায় যেতেন। আর নবুওয়াতের পর ইসরা ও মিরাজের রাতে এখান থেকেই একমাত্র মানব হিসেবে সাত আসমানের উপরে আল্লাহ তায়ালার সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং প্রথম মানব হিসেবে মহাকাশভ্রমণ করেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, “তিনি পবিত্র সত্ত্বা (আল্লাহ), যিনি তাঁর বান্দাকে মাসজিদুল হারাম থেকে মাসজিদুল আকসা পর্যন্ত এক রাতে ভ্রমণ করিয়েছেন, যে সময়কে আমি বরকতময় করেছি, যেন আমি আমার নিদর্শনসমূহ প্রদর্শন করি। নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা।” (সুরা বনী ইসরাইল:১) এ ভূমিতেই ইসলামের ইতিহাসের ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ অনুষ্ঠিত হয়। সেগুলো হচ্ছে মুতা, তাবুক, ইয়ারমুক, আজনাদিন, ক্রুসেড ও আইনেজালুতের যুদ্ধ।
লেখক: আদিয়াত উল্লাহ,
শিক্ষার্থী, আরবি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
কার্যনির্বাহী সদস্য, বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা।
ই-মেইল: saadhafeezdhaka@gmail.com.
মোবাইল নাম্বার:01926869482.
আশ-শাম হলো পৃথিবীর প্রাচীনতম ও ইসলামের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলোর মধ্যে অন্যতম। আজকের চারটি আরব রাষ্ট্র সিরিয়া, লেবানন, জর্ডান, ফিলিস্তিন বিশ্বের ক্যান্সার হিসেবে খ্যাত একমাত্র ইহুদি রাষ্ট্র, দখলদার ইসরাইল রাষ্ট্র ও মিশরের সিনাই উপত্যকা নিয়ে আশ-শাম গঠিত। পৃথিবীর কেন্দ্রস্থল মক্কা থেকে এটি উত্তর দিকে অবস্থিত। এর পশ্চিমে ভূমধ্যসাগর, দক্ষিণ জাযীরাতুল আরবের মরুভূমি ও লোহিত সাগর, পূর্বে ইরাকের সবুজ ছায়া সমৃদ্ধ এলাকা, দক্ষিণ-পশ্চিমে সমৃদ্ধ ইতিহাসের অধিকারী মিশর ও উত্তরে অটোমান সাম্রাজ্যের পিতৃভূমি তুরস্কের আনাতোলিয়া মালভূমি অবস্থিত। আজকে আলোচনা করব ইসলাম ও পৃথিবীর সভ্যতার ইতিহাসে প্রাচীনতম ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই ভূখণ্ড এবং নবুওয়াত ও কিতাব নাযিলের স্থান হিসেবে এর গুরুত্ব নিয়ে।
আশ-শামের সাথে পূর্ববর্তী নবী-রাসূলগণের সম্পর্ক: পূর্ববর্তী নবী-রাসূলগণের সাথে আশ-শাম ভূমির সম্পর্ক ছিল অবিচ্ছিন্ন, অবিচ্ছেদ্য ও গভীর। পৃথিবীতে প্রেরিত নবী – রাসূলগণের বিশাল অংশের জন্মস্থান, পিতৃভূমি নবুওয়াত লাভ ও ইসলাম প্রচারের মারকায হওয়ার সুবাদে আশ-শাম বরাবরই মুসলিমদের নিকট নবুওয়াতের দোলনা হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
এটি বহুসংখ্যক আসমানী কিতাব নাযিলের স্থান হিসেবেও সুপরিচিত। হযরত ইব্রাহীম (আ.) এখানে জীবনের বেশিরভাগ সময় অবস্থান করেছেন। তাঁরই পরিবারের সদস্য এবং দুই পুত্র হযরত ইসমাঈল ও ইসহাক (আ.) ফিলিস্তিনে জন্মগ্ৰহণ করেন। হযরত ইসহাক (আ.) এর পুত্র হযরত ইয়াকুব (আ.) এখানকার স্থায়ী বাসিন্দা ছিলেন। হযরত ইব্রাহীম (আ.) এর ভাগিনা ও কুরআনে বর্ণিত আল্লাহর আরেক নবী হযরত দূত (আ.) ছিলেন আমুরা ও সাদুম এলাকার নবী।
এখানকার অন্তর্গত সিনাই উপত্যকার ‘তূর’ পাহাড়ে হযরত মূসা (আ.) নবুওয়াত ও ‘তাওরাত’ কিতাব লাভ করেন। হযরত হারুন (আ.) কে তাঁর সহকারী নিযুক্ত করা হয় এবং নবুওয়াত দেয়া হয়। সারা পৃথিবীর প্রথম শাসনকর্তা হযরত দাউদ (আ.) এর শাসনের কেন্দ্রস্থল ছিল আশ-শামের ফিলিস্তিন অংশ। তাঁকে ‘যাবুর’ কিতাব দেয়া হয়েছিল। তাঁর পুত্র হযরত সুলাইমান (আ.) কে আল্লাহ তায়ালা বিশ্বজোড়া রাজত্ব ও প্রভাব প্রতিপত্তি দান করেছিলেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, “সে (হযরত সুলাইমান আলাইহিস সালাম) বলল, “হে আমার প্রভু, আমাকে ক্ষমা করুন এবং এমন রাজত্ব দান করুন, যা লাভ করা আমার পর আর কারো পক্ষে সম্ভব হবে না, নিশ্চয় আপনি দাতা”।” (সুরা সোয়াদ: ৩৫)
এ অঞ্চলের অন্য নবীদের মধ্যে রয়েছে হযরত ইলিয়াস (আ.), আল ইয়াসা (আ) এবং আল খিদর (আ.) প্রমুখ।
হযরত ইমরান (আ.) এর পরিবারের অন্তর্ভুক্ত দুই নবী ও রাসূল হযরত ঈসা (আ.) ও হযরত ইয়াহইয়া (আ.) এখানেই জন্মগ্ৰহণ করেন, নবুওয়াত ও কিতাব লাভ করেন এবং তাঁদের দ্বীন প্রচারের মারকায হিসেবে নির্ধারণ করেন। কুরআন ও হাদীসের বিভিন্ন রেওয়ায়াত থেকে জানা যায়, হযরত ঈসা (আ.) কে আল্লাহ তায়ালা এখানকার প্রধান শহর দামেশক থেকে আসমানে উঠিয়ে নিয়েছিলেন।
কুরআনুল কারীমের সুরা ইয়াসিনে বর্ণিত তিনজন নবীর মারকায ছিল সিরিয়ার ইনতাকিয়া অঞ্চলে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, “ আর (হে নবী) আপনি তাদের নিকট সেই জনপদের বাসিন্দাদের উদাহরণ পেশ করুন, যখন তাদের নিকট রাসূলগণ (প্রেরিত নবীগণ) এসেছিলেন।” (সুরা ইয়াসিন:১৩) এদের বাইরেও কয়েকজন ব্যতীত বাকিরা সকলেই এখানকার কোনো না কোনো অঞ্চলের সাথে সম্পর্কিত রয়েছেন।
হযরত মুহাম্মদ (সা.) ও আশ-শাম: হযরত মুহাম্মদ (সা.) নবুওয়াতপূর্ব জীবনে বাণিজ্য উপলক্ষে বহুবার আশ-শাম অঞ্চলে এসেছেন। তিনি তাঁর চাচা আবু তালিবের সাথে কৈশোরকালে বিভিন্ন সময়ে ব্যবসা করতে এসেছিলেন। যৌবনকালে আরবের শ্রেষ্ঠ ধনী ব্যবসায়ী এবং তাঁর প্রথমা স্ত্রী সাইয়্যেদা খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদ (রা.) এর বাণিজ্যবহর নিয়ে সিরিয়ায় যেতেন। আর নবুওয়াতের পর ইসরা ও মিরাজের রাতে এখান থেকেই একমাত্র মানব হিসেবে সাত আসমানের উপরে আল্লাহ তায়ালার সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং প্রথম মানব হিসেবে মহাকাশভ্রমণ করেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, “তিনি পবিত্র সত্ত্বা (আল্লাহ), যিনি তাঁর বান্দাকে মাসজিদুল হারাম থেকে মাসজিদুল আকসা পর্যন্ত এক রাতে ভ্রমণ করিয়েছেন, যে সময়কে আমি বরকতময় করেছি, যেন আমি আমার নিদর্শনসমূহ প্রদর্শন করি। নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা।” (সুরা বনী ইসরাইল:১) এ ভূমিতেই ইসলামের ইতিহাসের ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ অনুষ্ঠিত হয়। সেগুলো হচ্ছে মুতা, তাবুক, ইয়ারমুক, আজনাদিন, ক্রুসেড ও আইনেজালুতের যুদ্ধ।
লেখক: আদিয়াত উল্লাহ,
শিক্ষার্থী, আরবি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
কার্যনির্বাহী সদস্য, বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা।

