বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন
হোম / ইসলাম / নিবন্ধ

বিবাহের হুকুম ও শাওয়াল মাসে বিবাহের ফজিলত

Author

আদিয়াত উল্লাহ , ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ৩ মে ২০২৪ পাঠ: ৫৮ বার

বিবাহের হুকুম ও শাওয়াল মাসে বিবাহের ফজিলত

আদিয়াত উল্লাহ

 

বিবাহ ইসলামী সামাজিক বন্ধনের এক অতি গুরুত্বপূর্ণ অনুসঙ্গ। ইসলামী আদর্শ পরিবার ও সমাজ গঠনে বিবাহের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। এর বিপরীত কর্মকাণ্ড সর্বদা অসামাজিক ও অনৈসলামিক কাজ হিসেবে পরিগণিত। তাই আসুন আমরা জেনে নেই বিবাহের সংজ্ঞা, প্রকারভেদ, আহকাম, এর উৎকৃষ্ট সময়, সুন্নাত রীতিনীতি ও বর্জনীয় রীতিনীতি সম্পর্কে। ‘বিবাহ’ বাংলা শব্দ। আরবিতে একে ‘নিকাহ’ বলা হয়। এর অর্থ: ‘বিবাহ করা’। আল্লাহ তায়ালা বলেন, “আর তোমরা তোমাদের মধ্যকার যুবক যুবতী ও সৎ নারী পুরুষদের বিবাহ দাও। তারা যদি অভাবগ্রস্থ হয়, আল্লাহ তাঁর নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে ধনী করে দিবেন। আর আল্লাহ প্রশস্ত, সর্বজ্ঞানী।”(সুরা নূর৩২) বিবাহ করা নবীদের চিরাচরিত সুন্নাত সমূহের মধ্যে অন্যতম। হজরত আবু আইয়ুব (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “চারটি জিনিস নবীদের চিরাচরিত সুন্নাত: ১. লজ্জা-শরম, ২. সুগন্ধি ব্যবহার করা, ৩. মেসওয়াক করা, ৪. বিয়ে করা। (জামে তিরমিজি। ১০১৮) কোরআন মাজিদ ও হাদীসের দৃষ্টিতে বিবাহকে চক্ষু হেফাজতের উপায় হিসেবে দেখা হয়েছে। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা আমরা রাসুল্লল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে বের হলাম। আমরা ছিলাম যুবক। বিবাহের ব্যয় বহনের সামর্থা আমাদের ছিল না। তিনি বলেন, “হে যুবসমাজ, তোমাদের বিয়ে করা উচিত। কেননা এটি দৃষ্টিশক্তিকে সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থানকে রাখে সুরক্ষিত। আর তোমাদের মধ্যে যার বিবাহ করার সামর্থ্য নেই সে যেন রোজা রাখে, কেননা রোজা তার যৌনশক্তিকে দমিয়ে রাখবে।” (জামে তিরমিজি: ১০১৯) এর বিপরীত চিরকুমার থাকা ইসলামে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ ও নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “বিয়ে আমার সুন্নাত রীতিনীতি সমহের অন্যতম। সুতরাং যে আমার সুন্নাত রীতিনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে সে আমার দলভুক্ত নয়।” (ইবনে মাজাহ। অন্যদিকে আধুনিককালের ব্যভিচারের নতুন সংস্করণ ‘লিভটুগেদার’ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা ও নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে স্পষ্ট ভাষায় নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, “আর তোমরা ব্যভিচারের নিকটবর্তীও হইও না, নিশ্চয় এটা নিকৃষ্ট কাজ ও পন্থাসমূহের মধ্যে খারাপ পন্থা।” (সুরা আল ইসরা: ৩২)

 

 

বিবাহের উৎকৃষ্ট সময়:

কোরআন ও হাদীসের আলোকে বিবাহের সর্বোৎকৃষ্ট সময় হচ্ছে যৌবনকাল। কেননা এই সময়েই মানবদেহে যৌন উত্তেজনা সৃষ্টি হয় এবং তা বৃদ্ধি পেতে থাকে। এ অবস্থায় দৃষ্টিশক্তি ও যৌন কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য বিবাহ একটি কার্যকর পদ্ধতি।

 

 

বিবাহের সুন্নাতসমূহ: বিবাহের খরচ কম হওয়া, সাদাসিধে ও অনাড়ম্বর হওয়া, অপব্যয়-অপচয় ও অপসংস্কৃতি মুক্ত হওয়া, যৌতুকের শর্ত না থাকা এবং সামর্থ্যের অধিক দেনমোহর ধার্য বা শর্ত না করা ইত্যাদি বিবাহের সুন্নাত (মুসনাদে আহমাদ, মুসতাদরাকে হাকেম, তাবারানি আওসাত ৩৬১২, আবু দাউদ। ২১০৬)

 

 

শাওয়াল মাসে বিবাহের ফজিলত: আরবি বছরের বারোটি মাসেই বিবাহ করা বৈধ হলেও শাওয়াল মাসে বিবাহ করা নবীজির সুন্নাত। এ মাসেই নবীজি সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম আম্মাজান আয়েশা (রা.) কে বিবাহ করেছিলেন। উল্লেখ্য, ইংরেজি বছরের হিসেব করে বিয়ের তুলনায় আরবি বছরের হিসেবে বিবাহ করা সুন্নাহ সম্মত।

 

 

বিবাহের সময় বিচার্য বিষয়সমূহ: ইসলামে বিবাহ একটি স্বীকৃত সমাজ গঠন পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত। তবে এক্ষেত্রে কিছু বিষয় বিবেচনায় রাখা প্রযোজ্য, যা কোরআন ও হাদীস কর্তৃক সাব্যস্ত হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, “আর তোমরা মুশরিকাদের বিবাহ কর না যতক্ষণ না তারা ঈমান আনে। বরং মুমিনা দাসীও মুশরিকা (স্বাধীনা) নারী থেকে উত্তম, যদিও  সে তোমাদের আশ্চর্যান্বিত করে। আর তোমরা মুশরিকদের নিকট তোমাদের মেয়েদের বিবাহ দিবে না যতক্ষণ না তারা ঈমান আনে। বরং মুমিন দাসও মুশরিক (স্বাধীন) পুরুষ থেকে উত্তম, যদিও সে তোমাদের আশ্চর্যান্বিত করে। উহারা জাহান্নামের দিকে আহ্বান করে, আর আল্লাহ আহ্বান করেন জান্নাত প্রাপ্তি ও ক্ষমাপ্রাপ্তির দিকে। আর তিনি মানুষের জন্য বর্ণনা করেন তাঁর নিদর্শনসমূহ, যাতে আশা করা যায় যে তারা চিন্তা-গবেষণা করবে।” (সুরা বাকারা: ২২১) আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন, “ব্যাভিচারী যেন বিবাহ না করে ব্যভিচারিণী কিংবা মুশরিকা ব্যতীত। আর ব্যভিচারিণীকে ব্যভিচারী ও মুশরিক ব্যতীত কেহ বিবাহ না করে। আর মুমিনদের উপর এদের নিষিদ্ধ করা হয়েছে।” (সূরা আন নূর: ৩) কোরআন মাজিদের এ দুটি আয়াতে আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের জন্য কোন ব্যভিচারিণী কিংবা মুশরিকাকে বিবাহ করা এবং কোনো ব্যভিচারী বা মুশরিকের নিকট নিজেদের মেয়েদের বিবাহ দেওয়াকে নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন এবং এদেরকে বিবাহ করার পরিণতি সম্পর্কে সতর্কবার্তা জানিয়েছেন।

হাদীসে নববীতে চারটি বিষয়কে পর্যবেক্ষণ করে একজন মহিলা বা পুরুষকে বিবাহের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং দ্বীনদারিতাকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে বিবাহের বিষয়কে জোর দেওয়া হয়েছে। এ সম্পর্কে হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদীসে রাসূল্লল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “চারটি কারণ বিবেচনা করে কোনো মহিলাকে বিবাহ করা হয় ১. ধনসম্পদ, ২. বংশ-মর্যাদা, ৩. সৌন্দর্য, ৪. দ্বীনি চেতনা। অতএব দ্বীনি চেতনাকে অগ্রাধিকার দাও, তোমার হাত কল্যাণে পরিপূর্ণ হয়ে যাবে।” এই হাদীসে দ্বীনের চেতনা থাকাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করার আদেশ দেওয়া হয়েছে। অথচ আমাদের বর্তমান সমাজে এর ঠিক উল্টোটিই ঘটছে। দ্বীনি চেতনার বদলে অগ্রাধিকার পাচ্ছে বংশ মর্যাদা, ধনসম্পদ ও সৌন্দর্য। এখান থেকেই বোঝা যায় যে, আমাদের সমাজে কেন এত দাম্পত্য কলহ বেড়ে গেছে।

 

 

মোহরানা কি পরিমাণ দেওয়া উচিত: ইসলামী বিবাহের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ মোহরানা। এর বিপরীত কনে বা কনেপক্ষ কর্তৃক বর বা বরপক্ষকে প্রদেয় অর্থকে যৌতুক বলা হয়, যা আমাদের সমাজে আজ এক ভয়াবহ সংক্রামক ব্যাধি হয়ে দেখা দিয়েছে। অথচ কোরআন ও হাদীসে মোহরানা প্রদানকে ফরজ করা হলেও যৌতুক বা এজাতীয় কর্মকাণ্ডকে জুলুম হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, “আর তোমরা সন্তুষ্টচিত্তে তোমাদের স্ত্রীদের মোহরানা দাও। অতঃপর তারা যদি তার থেকে কিছু অংশ নিজ থেকে মাফ করে দেয় (বা সন্তুষ্টচিত্তে দান করে) তাহলে তা সন্তুষ্টচিত্তে ভক্ষণ কর।” (সুরা নিসা: ৪) তবে মোহরানার বিষয়টি বরের সামর্থ্যানুযায়ী হওয়া বাঞ্ছনীয়। বরের সামর্থ্যের তুলনায় বেশি মোহরানা ধার্য করা বিবাহ কঠিন ও ব্যভিচার সহজ হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ। বিশ্বের বহু দেশে বিবাহ কমার অন্যতম প্রধান কারণ বরের উপর সামর্থ্যের অতিরিক্ত মোহরানা ধার্য করা। উভয়পক্ষ এক হয়ে এ বিষয়ে যে সিদ্ধান্ত নিবে সেটিই ধার্য হবে। আবুল আজফা (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বলেছেন, “সাবধান, তোমরা নারীদের মোহর উচ্চহারে বৃদ্ধি করবে না। কেননা তা যদি দুনিয়াতে সম্মানের বস্তু অথবা আল্লাহর কাছে তাকওয়ার বস্তু তবে তোমাদের চেয়ে আল্লাহর নবী এ ব্যাপারে বেশি উদ্যোগী হতেন।কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বারো উকিয়ার বেশি মোহরে তার কোন স্ত্রীকে বিবাহ করেছেন বা কোনো কন্যাকে বিয়ে দিয়েছেন বলে আমার জানা নেই।” (জামে তিরমিজি-১০৫১) উপর্যুক্ত হাদীস ও কোরআনে বর্ণিত আয়াতসমূহ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, মোহরানা একটি ফরজ বিষয় তবে তা অবশ্যই বিবাহকারী পুরুষের সামর্থ্যের বাইরে নয়। সমাজে অনেক পুরুষ এমন আছেন যারা তাদের কিংবা তাদের পুত্র-কন্যাদের বিয়েতে এমন আকাশচুম্বী অংকের মোহরানা ধার্য করেন, যা পরবর্তীতে আদায় করার ইচ্ছেই রাখেন না বা বরপক্ষকে ঐ উচ্চ অংকের মোহরানা আদায়ের জন্য চাপে রাখেন। এটি সর্বাবস্থায় বর্তনীয়। কারণ এতে যেমন বিয়ের ফরজ অনুষঙ্গ আদায় করা কঠিন হয়ে যায়, তেমনি সমাজে ব্যভিচার ও সমকামিতা সহজলভ্য হয়ে যায়। অন্য এক হাদীস থেকে কম খরচে কম মোহরানার বিবাহে বেশি বরকত হবার বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে।

 

 

বিবাহে অনৈসলামিক সংস্কৃতি পালনের হুকুম: মুসলিমদের বিবাহে সবধরনের অনৈসলামিক সংস্কৃতি পালন করা কোরআন ও হাদীস কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছে। রাসূল (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি কোনো সম্প্রদায়ের সাদৃশ্য গাহণ করবে সে তাদের দলভুক্ত।” (বুখারী ও মুসলিম) আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে বিয়ের ফরজ আমল মোহরানা সার্থ্যানুযায়ী আদায় করা ও অপরকে আদায় করার তাগিদ দেওয়ার তাওফীক দান করুন। আমীন।

 

 

শিক্ষার্থী, আরবি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

লেখক: সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ৩ মে ২০২৪ তারিখে দৈনিক খোলা কাগজ পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!