মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধঝড়: বাংলাদেশের অর্থনীতি ও শ্রমবাজারের সামনে নতুন সংকট

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধঝড়: বাংলাদেশের অর্থনীতি ও শ্রমবাজারের সামনে নতুন সংকট
সাদিয়া সুলতানা রিমি
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ আজ বারুদের গন্ধে ভারি। ইরান, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে তৈরি হওয়া সামরিক উত্তেজনা কেবল একটি আঞ্চলিক সংঘাতের গল্প নয়; এটি দ্রুতই বৈশ্বিক অর্থনীতি ও নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে। বিশ্বায়নের যুগে একটি অঞ্চলের যুদ্ধ আর সেই অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না তার ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে পৃথিবীর নানা প্রান্তে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল ও আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য এই সংঘাত বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। কারণ আমাদের অর্থনীতির দুটি প্রধান ভিত্তি প্রবাসী শ্রমবাজার ও জ্বালানি নিরাপত্তা দুটিই মধ্যপ্রাচ্যের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ফলে এই অঞ্চলে অস্থিরতা যত বাড়বে, ততই বাংলাদেশের অর্থনীতি নতুন নতুন চাপের মুখে পড়বে।
বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস হলো প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স। এই রেমিট্যান্সের বড় অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান, বাহরাইন এবং জর্ডানের মতো দেশগুলোতে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি শ্রমিক কাজ করছেন। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে প্রায় ৬০ লাখেরও বেশি বাংলাদেশি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কর্মরত আছেন। নির্মাণশ্রমিক থেকে শুরু করে গৃহকর্মী, প্রকৌশলী থেকে স্বাস্থ্যকর্মী বিভিন্ন পেশায় তারা সেখানে কাজ করছেন এবং দেশে পরিবার-পরিজনের জন্য অর্থ পাঠাচ্ছেন। এই রেমিট্যান্স বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু যুদ্ধ বা সামরিক উত্তেজনা এই শ্রমবাজারকে অত্যন্ত ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়।
যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে আগে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শ্রমবাজার। নিরাপত্তা সংকট দেখা দিলে নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে যেতে পারে, বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প স্থগিত হতে পারে, এমনকি অনেক প্রতিষ্ঠান অস্থায়ীভাবে বন্ধও হয়ে যেতে পারে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে বিদেশি শ্রমিকদের ওপর। কর্মসংস্থান অনিশ্চিত হয়ে পড়লে অনেক শ্রমিককে দেশে ফিরতে বাধ্য হতে হয়। আবার অনেক সময় সরকারিভাবে নতুন শ্রমিক নিয়োগও বন্ধ হয়ে যায়। ফলে বাংলাদেশের মতো শ্রম রপ্তানিনির্ভর দেশের জন্য এটি বড় ধরনের অর্থনৈতিক ধাক্কা হয়ে দাঁড়ায়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত বাংলাদেশিরা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। ইতোমধ্যে বিভিন্ন দেশে বিমান চলাচল ব্যাহত হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। আকাশসীমা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেক ফ্লাইট বাতিল হয়েছে এবং হাজার হাজার প্রবাসী কর্মীর কর্মস্থলে ফেরা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। অনেকের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে আসছে, কিন্তু তারা দেশে ফিরতে পারছেন না কিংবা কর্মস্থলেও ফিরতে পারছেন না। ফলে আইনি জটিলতা এবং আর্থিক সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তাদের অধিকার রক্ষা করা।
এই সংকট মোকাবিলায় কূটনৈতিক তৎপরতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোকে আরও সক্রিয় হতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রাখতে হবে। যুদ্ধ বা উত্তেজনা দীর্ঘায়িত হলে অনেক শ্রমিককে নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থাও করতে হতে পারে। পাশাপাশি যেসব শ্রমিক ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাদের জন্য আর্থিক সহায়তা বা পুনর্বাসন কর্মসূচির কথা ভাবতে হবে। কারণ হঠাৎ করে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক দেশে ফিরে এলে দেশের অভ্যন্তরীণ শ্রমবাজারেও চাপ সৃষ্টি হবে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের দ্বিতীয় বড় আঘাত আসে জ্বালানি খাতে। বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হলো হরমুজ প্রণালি। এই প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পরিবহন করা হয়। যদি কোনো কারণে এই পথ বন্ধ হয়ে যায় বা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে, তাহলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দেয়। ইতোমধ্যে তেলের বাজারে অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে এবং বিভিন্ন বিশ্লেষক আশঙ্কা করছেন, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কারণ আমাদের জ্বালানি তেলের বড় অংশই আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন ব্যবস্থা এবং শিল্পকারখানা সবকিছুই এই জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ বেড়ে যাবে, পরিবহন খরচ বাড়বে এবং তার প্রভাব পড়বে দ্রব্যমূল্যের ওপর। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যাবে, যা ইতোমধ্যেই উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করে দিতে পারে।
শুধু জ্বালানি নয়, বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থাতেও এই সংঘাত বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। মধ্যপ্রাচ্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট অঞ্চল। ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে সমুদ্রপথে যাতায়াতের জন্য সুয়েজ খাল এবং লোহিত সাগরের পথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি এই পথে নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়ে যায়, তাহলে অনেক জাহাজকে বিকল্প দীর্ঘপথ ব্যবহার করতে হবে। এতে পরিবহন সময় ও খরচ উভয়ই বৃদ্ধি পাবে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প এই পরিস্থিতিতে বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। দেশের প্রধান রপ্তানি খাত হিসেবে তৈরি পোশাকশিল্প ইতোমধ্যেই বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার চাপে রয়েছে। যদি পরিবহন খরচ বেড়ে যায় বা পণ্য সরবরাহে বিলম্ব ঘটে, তাহলে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা বিকল্প বাজারের দিকে ঝুঁকতে পারেন। এতে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়বেন, কারণ অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয় বা বিমা খরচ বহন করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে উঠবে।
যুদ্ধ পরিস্থিতিতে আরেকটি বিষয় সামনে আসে বিমা ব্যয় বৃদ্ধি। আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে সংঘাত বা নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হলে জাহাজ চলাচলের জন্য অতিরিক্ত বিমা খরচ দিতে হয়, যাকে বলা হয় ‘ওয়ার রিস্ক প্রিমিয়াম’। এই খরচ অনেক সময় পরিবহন ব্যয়ের বড় অংশ হয়ে দাঁড়ায়। ফলে রপ্তানিকারকদের পণ্যের দাম বেড়ে যায় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো একটি সমন্বিত সংকট ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা তৈরি করা। প্রথমত, প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং তাদের কর্মসংস্থান টিকিয়ে রাখতে কূটনৈতিক উদ্যোগ বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে বিকল্প উৎস খুঁজে বের করা জরুরি। মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে অন্য অঞ্চল থেকে জ্বালানি আমদানির সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা যেতে পারে। একই সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি মজুদ ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করতে হবে।
তৃতীয়ত, রপ্তানি খাতকে সহায়তা করার জন্য বিশেষ নীতি গ্রহণ করা প্রয়োজন। পরিবহন খরচ বেড়ে গেলে সরকার প্রণোদনা দিতে পারে অথবা বিকল্প শিপিং রুট ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে বন্দর ব্যবস্থাপনা আরও দক্ষ করে তুলতে হবে যাতে পণ্য দ্রুত রপ্তানি করা সম্ভব হয়।
দীর্ঘমেয়াদে এই সংকট আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বয়ে আনতে পারে। অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে কোনো একটি অঞ্চল বা খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে হবে। শ্রমবাজারের ক্ষেত্রে নতুন নতুন দেশ অনুসন্ধান করতে হবে এবং দক্ষ শ্রমশক্তি তৈরি করতে হবে যাতে তারা উন্নত দেশগুলোর বাজারেও কাজের সুযোগ পায়। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
বিশ্ব রাজনীতির অস্থিরতা কখনোই পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব নয়। কিন্তু সঠিক পরিকল্পনা এবং দূরদর্শী নীতির মাধ্যমে তার প্রভাব অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য একটি সতর্কবার্তা—অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও কৌশলগত প্রস্তুতির গুরুত্ব নতুন করে উপলব্ধি করার সময় এখনই।
যুদ্ধের দামামা যখন মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে, তখন বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো আমরা কি এই ঝড় মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত? বিশ্ব রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতে না থাকলেও এর অভিঘাত থেকে নিজেদের অর্থনীতি ও জনগণকে রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদেরই নিতে হবে। সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত, কার্যকর কূটনীতি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমেই এই সংকটের মধ্য দিয়ে টিকে থাকার পথ খুঁজে বের করতে হবে।
সাদিয়া সুলতানা রিমি
শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
ইমেইল : sadia15.jnu@gmail.com

