বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

গণতন্ত্র যখন কেবলই ক্ষমতার লড়াই

Author

সাদিয়া সুলতানা রিমি , জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫ পাঠ: ৮৪ বার

 

‘রাষ্ট্রের মূল দায়িত্ব কি গণতন্ত্র নিশ্চিত করা, নাকি নাগরিকের জীবন নিরাপদ রাখা’ এই প্রশ্নটি আজ বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রগুলোর জন্য সবচেয়ে অস্বস্তিকর, কিন্তু সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন। কারণ যে দেশে মানুষ বাঁচার নিশ্চয়তা পায় না, সে দেশে ভোট, মতপ্রকাশ বা গণতন্ত্র সবই হয়ে ওঠে তাত্ত্বিক বিলাসিতা। অপরাধী ও মাফিয়ারা যখন রাষ্ট্রের ভেতরে শক্ত ঘাঁটি গড়ে তোলে, তখন রাষ্ট্র নিজেই নাগরিকের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যায়। তখন গণতন্ত্র আর জনগণের ক্ষমতা নয়, বরং অপরাধীদের ঢাল হয়ে দাঁড়ায়।

 

বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি সেই ভয়াবহ দ্বন্দ্বের ভেতর দিয়েই যাচ্ছে-একদিকে গণতন্ত্রের দাবি, অন্যদিকে নাগরিক নিরাপত্তার চরম সংকট। চাঁদাবাজি, খুন, ধর্ষণ, অপহরণ, দখলবাজি, মাদক ব্যবসা-এই শব্দগুলো এখন আর বিচ্ছিন্ন অপরাধের বর্ণনা নয়, বরং একটি গোটা ব্যবস্থার পরিচয়। এই ব্যবস্থায় অপরাধীরা একা নয়; তাদের পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক আশ্রয়, প্রশাসনিক নীরবতা ও সামাজিক বৈধতা।

 

গণতন্ত্রের মৌলিক ধারণা হলো জনগণের ক্ষমতা। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে-কোন জনগণ? যখন সমাজের বড় অংশ ভয়, দলীয় অন্ধত্ব

 

ও সুবিধাবাদের কারণে অপরাধীদের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে না, তখন সেই জনগণের ক্ষমতা কার হাতে যায়? বাস্তবে তা যায় গ্যাং লিডার, মাফিয়া ডন, রাজনৈতিক মাস্তান এবং তাদের পৃষ্ঠপোষক নেতাদের হাতে। গণতন্ত্র তখন আর সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর নয়, বরং অপরাধী নেটওয়ার্কের কৌশলগত অস্ত্র হয়ে ওঠে।

 

একজন সাধারণ মানুষ জানে, সে যদি অন্যায়ের প্রতিবাদ করে, তাহলে রাষ্ট্র তাকে রক্ষা করবে না। পুলিশ মামলা নেবে না, আদালত প্রক্রিয়ায় বছরের পর বছর কেটে যাবে, আর অপরাধী বাইরে থেকেই তাকে হুমকি দেবে। এই ভয়ের সংস্কৃতি গণতন্ত্রকে ভেতর থেকে পচিয়ে দেয়। কারণ ভয়গ্রস্ত নাগরিক কখনো স্বাধীন নাগরিক হতে পারে না।ধীনতা

 

রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা যত তীব্র হয়, অপরাধীদের চাহিদা তত বাড়ে। তারা মিছিল-মিটিংয়ে শক্তি দেখায়, বিরোধী পক্ষ দমন করে, ভোটের মাঠে প্রভাব বিস্তার করে। ফলে অপরাধীরা হয়ে ওঠে রাজনীতির অপরিহার্য অংশ। এই বাস্তবতায় গণতন্ত্র আর নৈতিক শাসন নয়, বরং শক্তির খেলা হয়ে দাঁড়ায়। বস্তুত আইনের শাসন ছাড়া গণতন্ত্র অর্থহীন।

 

বাংলাদেশে সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো অপরাধের সামাজিক বৈধতা। খুনিকে রাজনৈতিক কর্মী বলা হয়, চাঁদাবাজকে সংগঠক বলা হয়, দখলবাজকে প্রভাবশালী বলা হয়।

 

মিডিয়ার একাংশ, তথাকথিত বুদ্ধিজীবী ও টকশো সংস্কৃতি এই বৈধতাকে আরো শক্ত করে। অপরাধীকে অপরাধী না বলে ‘বিতর্কিত’, ‘বিরোধী মতের শিকার’ বা ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ভুক্তভোগী’ বানানো হয়। এতে সাধারণ মানুষের ন্যায়বোধ ভেঙে পড়ে।

 

এমন সমাজে আদালত, পুলিশ বা প্রশাসন যতই আইন দেখাক, তা কার্যকর হয় না। কারণ আইন তখন কাগজে থাকে, বাস্তবে নয়। আইনের শাসন মানে শুধু আইন থাকা নয়; মানে আইনের ভয় থাকা। সেই ভয় যখন অপরাধীর মনে থাকে না, তখন নাগরিকই ভয় পায়। রাষ্ট্র তখন শক্তিশালীদের রাষ্ট্র হয়ে ওঠে, ন্যায়বিচারের রাষ্ট্র নয়।

 

এখানে সবচেয়ে কঠিন সত্যটি হলো-সবসময় নরম রাষ্ট্র মানবিক হয় না। কখনো কখনো নরম রাষ্ট্রই সবচেয়ে অমানবিক হয়, কারণ সে অপরাধীদের দমন না করে সাধারণ মানুষকে বলি দেয়। শিশু, নারী, শ্রমজীবী মানুষ, পথচারী-তাদের নিরাপত্তা বিসর্জন দিয়ে যদি রাষ্ট্র নিজেকে গণতান্ত্রিক বলে দাবি করে, তাহলে সেই গণতন্ত্র আসলে এক ধরনের নিষ্ঠুর প্রতারণা।

 

অবশ্যই শক্ত রাষ্ট্র মানেই স্বৈরতন্ত্র নয়। শক্ত রাষ্ট্র মানে এমন রাষ্ট্র, যেখানে আইন সবার জন্য সমান, যেখানে রাজনৈতিক পরিচয় অপরাধের ঢাল হতে পারে না, যেখানে মিডিয়া গুজব ছড়ানোর স্বাধীনতা নয়, বরং দায়িত্বশীলতার

 

মধ্যে থাকে এবং যেখানে আদালত ভয়হীনভাবে রায় দিতে পারে। এই শক্তি না থাকলে গণতন্ত্র কেবল শব্দ হয়ে থাকে, বাস্তবতা নয়।

 

বাংলাদেশের জন্য তাই প্রশ্নটা ‘গণতন্ত্র না স্বৈরতন্ত্র’ এই সরল দ্বন্দ্ব নয়। আসল প্রশ্ন হলো-অপরাধী-মাফিয়ার রাষ্ট্র না নাগরিকের রাষ্ট্র? যদি রাষ্ট্র অপরাধীদের দখলে থাকে, তাহলে সেই রাষ্ট্র যতই নির্বাচন করুক, সংবিধানের কথা বলুক, তা নাগরিকের জন্য নিরাপদ নয়। আর নিরাপত্তাহীন রাষ্ট্রে গণতন্ত্র টিকে না; টিকে শুধু ক্ষমতার লড়াই।

 

নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে কোনো আদর্শিক গণতন্ত্র টেকসই হতে পারে না। আগে অপরাধ দমন, আগে আইনের শাসন, আগে জবাবদিহিতা-এরপর ধীরে ধীরে রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্থবহ হয়।

 

অপরাধী-মাফিয়ার রাষ্ট্র ভাঙা সহজ নয়, কিন্তু অসম্ভবও নয়। এজন্য প্রয়োজন সাহসী নেতৃত্ব, দল-মত নির্বিশেষে অপরাধ দমনের রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সমাজের নৈতিক অবস্থান। গণতন্ত্রকে রক্ষা করতে হলে আগে তাকে অপরাধীদের হাত থেকে উদ্ধার করতে হবে। নইলে গণতন্ত্র নিজেই নাগরিক নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে দাঁড়াবে।

 

 

লেখক: যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে আমার দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!