বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

ইসরাইল-ফিলিস্তিন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা

Author

সাদিয়া সুলতানা রিমি , জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ২৯ মার্চ ২০২৫ পাঠ: ৩৮ বার

ইসরাইল-ফিলিস্তিন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা

সাদিয়া সুলতানা রিমি

ইসরাইল-ফিলিস্তিন যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রধান সংঘাত, যা দীর্ঘদিন ধরে অঞ্চলটির রাজনীতি, অর্থনীতি ও সামাজিক পরিস্থিতির ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে। এই যুদ্ধ শুধু ইসরাইল ও ফিলিস্তিনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থির করে তুলেছে এবং বিশ্ব রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলছে। আরব দেশগুলো, পশ্চিমা শক্তিগুলো এবং আঞ্চলিক মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলো এই সংঘাতের বিভিন্ন পর্যায়ে জড়িত, যা মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক স্থিতিশীলতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাতের শেকড় বহু শতাব্দী পুরনো হলেও এর আধুনিক রূপ দেখা যায় ১৯৪৮ সালে, যখন ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়।দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইহুদিরা ইউরোপে প্রচণ্ড নির্যাতনের শিকার হয়, বিশেষ করে হলোকাস্টের সময়।ব্রিটিশ ম্যান্ডেটাধীন ফিলিস্তিনে ইহুদিরা একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন শুরু করে।১৯৪৭ সালে জাতিসংঘ ফিলিস্তিনকে দুটি রাষ্ট্রে ভাগ করার প্রস্তাব দেয়—একটি ইহুদিদের জন্য, অন্যটি ফিলিস্তিনিদের জন্য।আরব রাষ্ট্রগুলো এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে এবং ১৯৪৮ সালে ইসরাইল রাষ্ট্র গঠনের পরপরই যুদ্ধ শুরু হয়।
১৯৪৮, ১৯৬৭ ও ১৯৭৩ সালে আরব দেশগুলোর সঙ্গে ইসরাইলের যুদ্ধ হয়।১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধে ইসরাইল পশ্চিম তীর, গাজা, পূর্ব জেরুজালেম, সিনাই উপদ্বীপ ও গোলান মালভূমি দখল করে।ফিলিস্তিনিরা ধীরে ধীরে নিজ ভূমি হারাতে থাকে এবং তারা শরণার্থী হয়ে পড়ে।ফিলিস্তিনের প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে হামাস ও ফাতাহ অন্যতম।১৯৮৭ সালে প্রথম ইন্তিফাদা (অসহযোগ ও প্রতিরোধ আন্দোলন) শুরু হয়, যা ১৯৯৩ সালে অসলো চুক্তির মাধ্যমে কিছুটা শান্ত হয়।২০০০ সালে দ্বিতীয় ইন্তিফাদা শুরু হলে আবারও ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করে।

ইসরাইল-ফিলিস্তিন যুদ্ধ শুধু এই দুটি জনগোষ্ঠীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি পুরো মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতির ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে।ইরান, সিরিয়া, লেবানন, মিশর ও সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশ এই সংঘাতের সাথে জড়িত।ইরান সরাসরি হামাস ও হিজবুল্লাহকে সহায়তা দিয়ে থাকে, যা ইসরাইলের বিরুদ্ধে সামরিক উত্তেজনা বাড়ায়।সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত পশ্চিমা বিশ্ব ও ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চাইলেও জনগণের চাপের মুখে পড়ে যায়।যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন এই অঞ্চলে রাজনৈতিক ও সামরিক হস্তক্ষেপ করে, যা সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলছে।মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ তেল রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল।যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে যায়, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলে।ফিলিস্তিনের অবকাঠামো বারবার ধ্বংস হওয়ায় তাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ব্যাহত হয়।গাজা ও পশ্চিম তীরে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও মৌলিক চাহিদার সংকট তীব্র হচ্ছে।
জাতিসংঘের তথ্যমতে, লক্ষ লক্ষ ফিলিস্তিনি শরণার্থী হিসেবে জীবনযাপন করছে।ইসরাইলি আগ্রাসন এবং ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীগুলোর প্রতিশোধমূলক হামলার ফলে সাধারণ জনগণের জীবন বিপর্যস্ত।ইসরাইল বিশ্বের অন্যতম সামরিক শক্তিশালী রাষ্ট্র, যার রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় উন্নত প্রযুক্তি।ইরান ও তুরস্ক আঞ্চলিক প্রতিপত্তি বিস্তারের জন্য ইসরাইল-বিরোধী সংগঠনগুলোকে সহায়তা দিচ্ছে।লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরাও ইসরাইল-বিরোধী অবস্থান নিয়েছে।

ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাত নিরসনের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে, তবে এখনো কোনো স্থায়ী সমাধান আসেনি।জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ফিলিস্তিন ও ইসরাইলকে পৃথক দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে।এই সমাধান বাস্তবায়িত হলে ফিলিস্তিনিরা নিজেদের সার্বভৌমত্ব ফিরে পাবে।তবে ইসরাইলি বসতি স্থাপন এবং হামাসের মতো গোষ্ঠীগুলোর অস্তিত্বের কারণে এটি বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়েছে।মিশর, কাতার ও তুরস্ক মধ্যস্থতার চেষ্টা করছে, তবে এখনো সফল হয়নি।২০২০ সালে কিছু আরব দেশ ইসরাইলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেছে (আব্রাহাম অ্যাকর্ডস), তবে এটি ফিলিস্তিনিদের অবস্থান দুর্বল করেছে।জাতিসংঘ ও অন্যান্য সংস্থাগুলো মানবিক সহায়তা দিচ্ছে এবং যুদ্ধবিরতির চেষ্টা করছে।যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ ইসরাইলের প্রতি সমর্থন জানালেও ফিলিস্তিনিদের অধিকারের বিষয়ে সমালোচনার মুখে পড়ছে।

ইসরাইল-ফিলিস্তিন যুদ্ধ শুধু দুটি জাতির সংঘাত নয়, এটি মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় হুমকি। দীর্ঘদিন ধরে চলা এই সংঘাতে হাজারো মানুষ প্রাণ হারিয়েছে, লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং সামরিক উত্তেজনা প্রতিনিয়ত বাড়ছে।এই সমস্যার সমাধানে প্রয়োজন কূটনৈতিক সংলাপ, আন্তর্জাতিক চাপ এবং একটি ন্যায়সঙ্গত সমঝোতা। দুই-রাষ্ট্র সমাধান বাস্তবায়নই হতে পারে শান্তি প্রতিষ্ঠার সর্বোত্তম উপায়। তবে যদি আঞ্চলিক শক্তিগুলো রাজনৈতিক ও সামরিক প্রতিযোগিতা চালিয়ে যায়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা আরও দীর্ঘস্থায়ী হবে। সুতরাং, ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধান না হলে, এই যুদ্ধ শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, পুরো বিশ্বের জন্যই একটি বড় সংকট হয়ে থাকবে।

লেখক: যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ২৯ মার্চ ২০২৫ তারিখে খোলা কাগজ পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!