মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা: বিশ্ব ব্যবস্থা, বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের রূপরেখা
মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা: বিশ্ব ব্যবস্থা, বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের রূপরেখা
মো বাইজিদ শেখ
মধ্যপ্রাচ্য বরাবরই বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। তবে সাম্প্রতিক সময়ের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, সংঘাত এবং ক্ষমতা প্রদর্শনের লড়াই এই অঞ্চলকে এক অভূতপূর্ব অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিয়েছে। গাজা-ইসরায়েল সংঘাত, লোহিত সাগরে হুতিদের তৎপরতা এবং ইরান ও তার মিত্রদের সাথে পশ্চিমা শক্তিগুলোর ছায়াযুদ্ধ—সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এখন একটি বারুদের স্তূপের মতো। এই উত্তেজনা কেবল ওই অঞ্চলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এর ঢেউ আছড়ে পড়ছে সমগ্র বিশ্বের অর্থনীতি ও রাজনীতিতে। এই বৈশ্বিক টালমাটাল পরিস্থিতিতে একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান, ঝুঁকি এবং কৌশলগত প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত স্বতন্ত্র এবং তাৎপর্যপূর্ণ।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট: বহুমুখী মেরুকরণের নতুন অধ্যায়
বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য সংকট স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী এককেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার অবসানের একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়। আমেরিকা ও তার পশ্চিমা মিত্ররা একদিকে যেমন ইসরায়েল ও নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় মরিয়া, অন্যদিকে চীন এবং রাশিয়া এই অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বিস্তারে অত্যন্ত কৌশলী ভূমিকা পালন করছে। লোহিত সাগর এবং সুয়েজ খাল দিয়ে বিশ্বের প্রায় ১২ শতাংশ বাণিজ্য সম্পন্ন হয়। এই রুটে জাহাজের ওপর হামলার কারণে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল (Supply Chain) ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। জাহাজগুলোকে আফ্রিকা ঘুরে যাতায়াত করতে হচ্ছে, যার ফলে পরিবহন খরচ এবং সময়—উভয়ই বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর অনিবার্য পরিণতি হিসেবে বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ছে এবং জ্বালানি তেলের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট: বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে মধ্যপ্রাচ্য থেকে দূরে হলেও অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে এই অঞ্চলের সাথে গভীরভাবে যুক্ত। মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা বাংলাদেশের ওপর মূলত তিনটি প্রধান উপায়ে প্রভাব ফেলে:
১। জ্বালানি নিরাপত্তা ও আমদানি নির্ভরতা: বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেকটাই আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। দেশে ব্যবহৃত এলএনজি (LNG) এবং জ্বালানি তেলের একটি বড় অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। উপসাগরীয় অঞ্চলে যে কোনো সংঘাত বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়িয়ে দেয়, যা সরাসরি বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা এবং পরিবহন খাতে উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দেয়।
২। রেমিট্যান্স ও প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা: বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হলো রেমিট্যান্স, যার অর্ধেকের বেশি আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে। ওই অঞ্চলে প্রায় অর্ধ কোটির বেশি বাংলাদেশি প্রবাসী কর্মরত আছেন। সংঘাত বিস্তৃত হলে প্রবাসীদের কর্মসংস্থান ও জীবনের নিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে পড়বে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর মারাত্মক চাপ ফেলবে।
৩। বাণিজ্য ও সরবরাহ শৃঙ্খল: লোহিত সাগরে চলমান সংকটের কারণে ইউরোপ ও আমেরিকায় বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (RMG) রপ্তানিতে সরাসরি প্রভাব পড়ছে। শিপিং খরচ বৃদ্ধি এবং লিড টাইম (Lead Time) বেড়ে যাওয়ার কারণে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক বাজারে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে।
বাংলাদেশের কূটনৈতিক কৌশল: ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়’
এই বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক উত্তেজনার মাঝে বাংলাদেশ অত্যন্ত পরিপক্ব ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক নীতি অনুসরণ করছে। বাংলাদেশ ফিলিস্তিনের জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার এবং স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবিকে সবসময় জোরালোভাবে সমর্থন করে আসছে। গাজায় সাধারণ মানুষের ওপর হামলার তীব্র নিন্দা জানানোর পাশাপাশি বাংলাদেশ দ্রুত যুদ্ধবিরতি এবং মানবিক সহায়তার আহ্বান জানিয়েছে। একদিকে যেমন মুসলিম উম্মাহর সাথে সংহতি প্রকাশ করছে, অন্যদিকে পশ্চিমা ক্রেতা দেশগুলোর সাথেও বাণিজ্যিক সম্পর্ক অটুট রাখছে। কোনো বিশেষ পরাশক্তির বলয়ে প্রবেশ না করে, বাংলাদেশ নিজের অর্থনৈতিক ও জাতীয় স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা ও উত্তরণের কৌশলগত রূপরেখা
এই ক্রমবর্ধমান অস্থিতিশীলতা থেকে অর্থনীতি ও নাগরিকদের সুরক্ষিত রাখতে বাংলাদেশকে কিছু সুনির্দিষ্ট, আইনি ও কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে:
আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধি: জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ (UNGA) এবং আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (ICJ) মতো বহুপাক্ষিক ফোরামগুলোতে সংঘাত নিরসন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশকে আরও জোরালো আইনি অবস্থান গ্রহণ করতে হবে। একইসাথে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সাথে বিদ্যমান শ্রম চুক্তিগুলোর (MoU) আইনি কাঠামো পর্যালোচনা করে আপৎকালীন পরিস্থিতিতে প্রবাসী শ্রমিকদের সর্বোচ্চ সুরক্ষা নিশ্চিত করার শর্ত যুক্ত করা প্রয়োজন।
প্রবাসী সুরক্ষা ও আপৎকালীন ব্যবস্থাপনা: যুদ্ধ বা চরম অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে প্রবাসীদের নিরাপদে ও দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য একটি সুস্পষ্ট ‘জরুরি স্থানান্তর প্রোটোকল’ (Emergency Evacuation Protocol) এখনই প্রস্তুত রাখা প্রয়োজন। এছাড়া আকস্মিক কর্মচ্যুতি বা সংঘাতের কারণে ফিরে আসা শ্রমিকদের পুনর্বাসন এবং আইনি সহায়তার জন্য একটি বিশেষ ‘ক্রাইসিস ফান্ড’ গঠন করতে হবে।
সরবরাহ শৃঙ্খল ও সামষ্টিক অর্থনীতি: লোহিত সাগরের সংকটের কারণে তৈরি পোশাক রপ্তানি যেন ব্যাহত না হয়, সেজন্য ইউরোপ ও আমেরিকায় পণ্য পৌঁছানোর জন্য বিকল্প ও নিরাপদ শিপিং রুট এবং লজিস্টিক হাব অন্বেষণ করতে হবে। পাশাপাশি প্রচলিত বাজারের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে ল্যাটিন আমেরিকা, পূর্ব এশিয়া এবং আফ্রিকান দেশগুলোর সাথে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (PTA) বা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) স্বাক্ষরের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে হবে।
জ্বালানি নিরাপত্তা কৌশল: আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামের আকস্মিক ওঠানামা থেকে অর্থনীতিকে রক্ষা করতে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে অপরিশোধিত তেল ও এলএনজির একটি শক্তিশালী ‘কৌশলগত মজুত’ (Strategic Reserve) গড়ে তোলা অপরিহার্য। এছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দেশীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে আইনি ও কাঠামোগত প্রণোদনা নিশ্চিত করতে হবে।
উপসংহার
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা বিশ্বের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির জন্য এটি একইসাথে একটি বড় চ্যালেঞ্জ এবং টিকে থাকার কৌশল নির্ধারণের পরীক্ষা। আবেগতাড়িত না হয়ে, বাস্তবমুখী ভূ-অর্থনৈতিক কৌশল, দূরদর্শী আইনি সুরক্ষা এবং ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির মাধ্যমেই বাংলাদেশ এই বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতার নেতিবাচক প্রভাব থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে সক্ষম হবে। মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা কেবল ওই অঞ্চলের জন্যই নয়, বাংলাদেশের অবিচ্ছিন্ন উন্নয়ন এবং বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার জন্যও একান্ত অপরিহার্য।
মো বাইজিদ শেখ
শিক্ষার্থী, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইল: shmdbayazid@gmail.com
মোবাইল:01835544692

