বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

ঈদ, কিন্তু তা যেন সবার নয়!

Author

মো বাইজিদ শেখ , Gopalganj science and technology University

প্রকাশ: ১৮ মার্চ ২০২৬ পাঠ: ১২৩ বার

ঈদ, কিন্তু তা যেন সবার নয়!

মো. বাইজিদ শেখ

 

আকাশে শাওয়ালের একফালি চাঁদ উঁকি দিলেই চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে অনাবিল আনন্দ। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ঈদ মানেই আনন্দ; ঈদ মানেই সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের এক অপূর্ব মিলনমেলা। ধনী-গরিব কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এক কাতারে দাঁড়ানোর এই দিনটি মূলত ভেদাভেদ ভুলে যাওয়ার দিন। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে যদি প্রশ্ন করা হয়—ঈদের এই আনন্দ কি সত্যিই সার্বজনীন? উত্তরটি বেদনাদায়ক এবং রূঢ়। চারপাশে তাকালেই চোখে পড়ে এক অসম অর্থনীতির নির্মম চিত্র, যা ঈদের সার্বজনীনতার ধারণাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।

 

অধিকার ও সমতার সাংঘর্ষিক বাস্তবতা কী বলে? সংবিধানে সুযোগের সমতা ও ন্যায়বিচারের কথা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ থাকলেও বাস্তব প্রয়োগে চিত্রটি ভিন্ন। ‘আইনের চোখে সবাই সমান’—এই নীতির চর্চা বহু ক্ষেত্রে হোঁচট খাচ্ছে। সম্পদের সুষম বণ্টনের অভাবে মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হাতে দেশের অধিকাংশ সম্পদ কুক্ষিগত হচ্ছে। প্রভাবশালীরা সহজেই দায়মুক্তি পাচ্ছে, আর প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ন্যায্য অধিকার ও বিচার থেকে প্রতিনিয়ত বঞ্চিত হচ্ছে।

 

বাড়ির মালিকের সমবয়সী কন্যা যখন দামী লেহেঙ্গা পরে উৎসবে মেতে ওঠে, তখন কাজের মেয়ে ময়নার গায়ে থাকে মালিকের দেওয়া মাপে বড়, সস্তা একটি সুতির পোশাক। ড্রয়িংরুমে যখন উৎসবের ভোজে সবাই ব্যস্ত, ময়না তখন রান্নাঘরের এক কোণে বসে নীরবে চোখের জল ফেলে। সে ভাবতে থাকে—গ্রামে থাকা তার ছোট ভাইটির কি ঈদে নতুন জামা জুটেছে?

 

বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা যেন মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। একদিকে উন্নয়ন ও কাঠামোগত অগ্রগতির চাকচিক্য, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের নীরব সংগ্রাম। শহরের বিলাসবহুল বিপণিবিতানগুলোতে ঈদকে ঘিরে উপচে পড়া ভিড় চোখে পড়ে। লাখ টাকার পোশাক, দামি সুগন্ধি ও জুতা কেনার প্রতিযোগিতায় মত্ত সমাজের একটি অংশ। তাদের কাছে ঈদ মানেই বিদেশ ভ্রমণ কিংবা আভিজাত্যের প্রদর্শন। অন্যদিকে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের বৃহৎ অংশ ফুটপাতের দোকান বা সুলভ বাজারে দরদাম করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েন। সন্তানের মুখে হাসি ফোটাতে গিয়ে অনেকেই নিজের জন্য নতুন পোশাক কেনার চিন্তাও ত্যাগ করেন। একই দেশে, একই উৎসবে এমন আকাশ-পাতাল বৈষম্য নিঃসন্দেহে হতাশাজনক।

 

রাজধানীর এক বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে দশ বছরের শিশু গৃহকর্মী ময়নার ঈদ কাটে রান্নাঘরের ধোঁয়ার মধ্যে। বাড়ির মালিকের সমবয়সী কন্যা যখন দামী লেহেঙ্গা পরে উৎসবে মেতে ওঠে, তখন কাজের মেয়ে ময়নার গায়ে থাকে মালিকের দেওয়া মাপে বড়, সস্তা একটি সুতির পোশাক। ড্রয়িংরুমে যখন উৎসবের ভোজে সবাই ব্যস্ত, ময়না তখন রান্নাঘরের এক কোণে বসে নীরবে চোখের জল ফেলে। সে ভাবতে থাকে—গ্রামে থাকা তার ছোট ভাইটির কি ঈদে নতুন জামা জুটেছে? একই ছাদের নিচে কয়েক হাত দূরত্বে থাকা দুটি শিশুর এই বৈপরীত্যই আমাদের সমাজের নির্মম অর্থনৈতিক বৈষম্যের এক করুণ প্রতিচ্ছবি।

 

ঈদের আনন্দ অনেকাংশেই নির্ভর করে উৎসবের সামর্থ্যের ওপর। কিন্তু বর্তমান বাজার পরিস্থিতি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। আকাশচুম্বী মূল্যস্ফীতি এবং অসাধু বাজার-সিন্ডিকেটের কারণে চাল, ডাল, মাংসসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। একজন শ্রমজীবী মানুষের মাসিক আয় যেখানে পরিবারের ন্যূনতম ভরণপোষণেই অপ্রতুল, সেখানে ঈদের অতিরিক্ত ব্যয় তাদের জন্য এক কঠিন বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। জিডিপি প্রবৃদ্ধি বা মাথাপিছু আয়ের পরিসংখ্যান যতই উজ্জ্বল হোক, সুষম বণ্টনের অভাবে তার সুফল সাধারণ মানুষের ঘরে পৌঁছায় না।

 

অর্থনীতি সম্প্রসারিত হচ্ছে, তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন ধনকুবের। কিন্তু দুঃখজনকভাবে সম্পদের সিংহভাগ সীমাবদ্ধ থাকছে অল্প কিছু মানুষের হাতে। ইসলামী অর্থব্যবস্থায় জাকাত ও ফিতরা সম্পদ বণ্টনের কার্যকর মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হলেও আমাদের দেশে এর প্রয়োগ অধিকাংশ ক্ষেত্রে কাঠামোবদ্ধ ও উৎপাদনমুখী নয়; বরং তা অনেক সময় লোকদেখানো বস্ত্রবিতরণে সীমাবদ্ধ থাকে। ফলে দারিদ্র্য বিমোচনে এর প্রত্যাশিত ভূমিকা অনুপস্থিত।

 

ঈদের আনন্দ তখনই প্রকৃত অর্থে সার্বজনীন হবে, যখন সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষ ন্যূনতম অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও স্বস্তি অনুভব করবে। এ জন্য প্রয়োজন সুষম ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক নীতিমালা, যাতে সম্পদ গুটিকয়েক মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত না থাকে। পাশাপাশি কঠোরভাবে বাজার-সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখতে হবে। শ্রমজীবী মানুষের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি করাও সমানভাবে জরুরি। একই সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক জাকাত ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলে সেই তহবিলকে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে স্বাবলম্বী করার উদ্যোগ নিতে হবে।

 

ঈদের চাঁদ ধনী-গরিব সবার আকাশেই উদিত হয়, কিন্তু তার আলো সবার ঘরে সমানভাবে পৌঁছায় না। যতদিন এই তীব্র অর্থনৈতিক বৈষম্য বিরাজমান থাকবে, ততদিন ‘সার্বজনীন ঈদ’-এর ধারণা কেবল তাত্ত্বিক কথামাত্র হয়েই থাকবে। বৈষম্যহীন সমাজ গড়তে আমাদের প্রত্যেককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

 

বৈষম্যের দেয়াল ভেঙে যেদিন প্রতিটি জীর্ণ কুটিরেও এক চিলতে হাসি ফুটবে, সেদিনই পূর্ণতা পাবে ঈদের চাঁদ। আসুন, কেবল ব্যক্তিগত ভোগে নয়—সবার সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার মধ্য দিয়েই আমরা একটি সত্যিকারের সার্বজনীন ঈদের প্রত্যাশা লালন করি।

 

লেখক : তরুণ কলামিস্ট ও শিক্ষার্থী, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

লেখক: সদস্য, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ১৮ মার্চ ২০২৬ তারিখে Muldhara - Bangla Daily পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!