বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন
হোম / গল্প / নিবন্ধ

আমরা তোমাদের ভুলব না

Author

আবদুল্লাহ আল সিয়াম , বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ১১ মার্চ ২০২৬ পাঠ: ৪৪ বার

” আমরা তোমাদের ভুলব না ”

 

আজ বুধবার । প্রতি সপ্তাহের এই দিনে বাবা রুনাকে নিয়ে মেলায় যেত । মেলা হতো তাদের গ্রামের ঠিক পূর্ব পাশের বিলনগর গ্রামে । তবে অনেক দিন হলো এখন আর সেই মেলা হয় না । ওটা এখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অস্থায়ী ক্যাম্প । এদিকে বাবাও বাড়ি থেকে চলে গেছে অনেকদিন হলো । এর মাঝে যদিও দু’একবার এসেছিল তবে রুনা তা দেখেনি কারণ সে ঘুমিয়ে থাকতো । বাবা রাতে আসতো আবার খুব ভোরে আলো ফোটার আগেই চলে যেত । রুনার বাবা রহিম মিয়া ছিলেন একজন ব্যবসায়ী । গ্রামের বাজারে তার ছোট দোকান ছিল। কয়েক মাস আগেই সেখানে হানাদার বাহিনী আগুন লাগিয়ে দেয়। গ্রামে তখন আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে । অনেকই গ্রাম ছেড়ে অন্য গ্রামে চলে যায় । রহিম মিয়াও ভাবতেছিল কি করবে । অনেকদিন হলো বাড়িতেই বসে আছে । এরমাঝে একদিন সজল তার বাড়িতে আসে। সজলের দোকান ছিল রহিম মিয়ার পাশে। ওর বাড়ি ওই বাজারের পাশেই । সজল বলল অন্তুকে হানাদাররা চোখ বেঁধে তুলে নিয়ে গেছে । রহিম মিয়া হঠাৎ চমকে ওঠে । অন্তু সারাদিন বাজারে ছোটাছুটি করত। সকলের বিপদে এগিয়ে আসত । ও একদিন রহিম মিয়াকে বলছিল ” চাচা আমরা স্বাধীন হবোই “। ছেলেটির চোখেমুখে ছিল প্রতিবাদের ভাষা । ও গ্রামের একদল মুক্তিবাহিনীকে খাবার দিত নদীর পারে । একদিন রাজাকার মন্টু মোল্লা ওকে দেখে ফেলে। তাই হয়তো ওকে হানাদার বাহিনী তুলে নিয়ে গেছে । এরপর সজল চলে যায় । রহিম মিয়া একদম নিশ্চুপ হয়ে যায় । অন্তুর বিষয়টা তাকে আর স্বাভাবিক থাকতে দেয় না । অন্তুর বাবা মা শহরে গিয়েছিল কয়েকমাস আগে । অন্তু রহিম মিয়াকে বলেছিল শহর থেকে নৌকায় করে ফেরার সময় তার বাবা – মা হানাদারদের সামনে পড়েছিল । ঐ নৌকায় আরও লোক ছিল । নৌকার মাঝি দূর থেকে হানাদার বাহিনীর নৌকা দেখতে পেয়ে সবাইকে সতর্ক করলো । সবাই ভয় পেয়ে গেল । নৌকার ভিতরে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাও ছিল। তাদের সাথে অস্ত্র ছিল । তারা সেগুলো নিয়ে লুকিয়ে পড়ল । হানাদারদের সাথে ছিল রাজাকার মন্টু মোল্লা । তিনিই হানাদারদের সব খবর দিতেন। একটা সময় হানাদারদের নৌকা তাদের নৌকার কাছে এসে গেল । সবাইকে নানান ধরনের প্রশ্ন করলেন । এরপর অন্তুর বাবা আনোয়ার হোসেনকে তারা ধরে নিয়ে গেল । আনোয়ার হোসেন একবার সবার সামনে মন্টু মোল্লাকে দেশদ্রোহী বলেছিলেন । এদিকে অন্তুর মা খুব চিন্তিত । নৌকায় থাকা বাকি লোকেরা তাকে স্বান্ত্বনা দিতে লাগলেন । নৌকায় ছিল এক মাওলানা ও তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী । নৌকা অনেকদূর যাওয়ার পর মুক্তিযোদ্ধারা বের হলেন । সবাইকে বললেন সাহস নিয়ে দেশের জন্য লড়াই করতে । সবাইকে উদ্ভুদ্ধ করলেন যুদ্ধ করতে। কয়েকজন তাদের সাথে যুদ্ধে যেতে রাজি হলেন । ওই মাওলানা সাহেবও তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে রেখে যুদ্ধে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত । তারা এক জায়গায় নেমে গেলেন। নৌকা গ্রামে যেতে এখনও অনেক সময় লাগবে । এরপর নৌকা গ্রামে পৌঁছাল । তখন বিকাল হয়ে গিয়েছিল । সবাই বাড়ি ফেরে। অন্তুর মা অন্তুকে সব বলে। অন্তুর বয়স মাত্র ১৬ । সে অদম্য এক বালক। ঐদিন থেকে অন্তু প্রতিজ্ঞা করে যে সে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করবে। সে নিয়মিত খাবার, তথ্য এসব দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করে আসছিল। অথচ আজ তাকেও ধরে নিয়ে গেছে । সে আর কখনও ফিরবে কিনা জানা নাই। এভাবে তিন- চারদিন কেটে যায় । পাশের গ্রামে এক বুড়ি ছিল। তার ছেলেও যুদ্ধে গেছে কিছুদিন আগে । সে তার এক প্রতিবন্ধী নাতি ও ছেলের বৌকে নিয়ে থাকে । একদিন হঠাৎ দু’জন মুক্তিযোদ্ধা তাদের বাড়িতে আসে। তারা এসে বলে আমাদেরকে পাকবাহিনী খুঁজতেছে, আমাদেরকে একটু আশ্রয় দিন । বুড়ি তাদেরকে ঘরের মধ্যে লুকিয়ে রাখে । কিছুক্ষণ পর তিন-চার জন হানাদার আসে এবং দরজা খুলতে বলে । বুড়ি ভাবে কি করা যায়। তিনি কোনোভাবেই মুক্তিযোদ্ধাদের ধরিয়ে দেবেন না। কারণ তিনি মনে করেন এরাই দেশকে স্বাধীন করবে । তিনি ওই মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকে একটা অস্ত্র এনে তার প্রতিবন্ধী নাতির হাতে দেয়। ও তো তেমন কিছুই বোঝে না। কিন্তু বুড়ির চোখ দিয়ে পানি পরে। বুড়ি জানে এটাই ওর শেষ দিন। বুড়ি তার নাতির কপালে চুমো দিয়ে তাকে বাইরে বের করে দেয় অস্ত্র হাতে । এরপর পাকবাহিনী তাকে মুক্তিযোদ্ধা ভেবে গুলি করে মেরে ফেলে। এরপর চলে যায়। বুড়ি ঘর থেকে বের হয়ে তার নাতিকে জড়িয়ে ধরে কান্না করতে থাকে । একা একা বলে ” তুই দেশের জন্য শহীদ হয়েছিস, তুই মুক্তিযোদ্ধা । এরপর ঘর থেকে বেরিয়ে আসে ওই দু’জন মুক্তিযোদ্ধা । তাদের কাছে থাকা লাল- সবুজ পতাকা দিয়ে লাশটি ঢেকে দেয় । তারা স্যালটু দিয়ে চলে যাওয়ার সময় বলে ” এই রক্ত দিয়েই আমরা নাম লিখবো স্বাধীন বাংলাদেশের নাম “। এরকম নানান ঘটনা কানে আসে প্রত্যেকদিন। সবগুলোই মনে মুক্তির চেতনা জাগায়। একদিন সন্ধ্যায় কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা রহিম মিয়ার বাড়িতে আসে । তারা কিছু খাবারের জন্য এসেছিল । কিন্তু ঘরে তেমন কিছু ছিল না। সালেয়া বিবি চুলায় ভাত বসাইয়া দিতে যায়। এদিকে রহিম মিয়া ওই লোকগুলোর সাথে কথা বলতে থাকে। রুনা তার কোলে বসা ছিল। হঠাৎ রুনা প্রশ্ন করে বসে ” বাবা, এই লোকগুলো কি তোমাকে নিতে এসেছে ? ” বাবা কোনো উত্তর খুঁজে পায় না । তার ভিতর মুক্তির চেতনা উঁকি দেয় । এর মধ্যে ভাত চলে আসে। রহিম মিয়াও তাদের সাথে একসাথে বসে খায় । এরপর ওই লোকগুলো বলে ” আমরা দেশকে মুক্ত করে তবেই ফিরবো “। এই বলে তারা যখন চলে যাচ্ছিল তখন রহিম মিয়া তাদেরকে পিছন থেকে ডাক দিল। বলল ” আমিও যাবো তোমাদের সাথে । রুনা বলল ” বাবা তুমি কখন আসবে? ” রহিম মিয়া বলল ” মা, খুব শিগগিরই ফিরবো “। সালেয়া বিবি তার চোখের পানি মুছতে থাকল । সালেয়া বিবি মেয়েকে নিয়ে ঘরে ফিরে গেল । এরপর অনেকদিন কেটে গেল । অন্তু হঠাৎ একদিন ফিরে এলো । রহিম মিয়ার বাড়িতে এসে তাকে খোঁজ করল কিন্তু সালেয়া বিবির কাছে শুনলো সে যুদ্ধে গেছে। এরপর সালেয়া বিবি ওর কাছে খোঁজ খবর নিতে শুরু করলো । অন্তু বলল ” আমকে দু’জন হানাদার নৌকায় করে নিয়ে যাচ্ছিল সালামের বাড়ি খুঁজতে , আমি নৌকা ডুবিয়ে দিয়েছি। ওরা ডুবে মারা গেছে , আমি পালিয়ে এসেছি । অন্তু বলল “আমার বাবাকে ওরা মেরে ফেলেছে । বুড়ির ছেলেকেও । তবে রহিম চাচার কোনো খোঁজ পাই নাই। তাইতো আপনাদের বাড়িতে আসলাম । তবে আমার বিশ্বাস বিজয় আমাদের নিকটে । হানাদাররা গ্রাম ছেড়ে চলে যাচ্ছে । রহিম চাচাও বিজয় নিয়েই ফিরবে, চিন্তা করিয়েন না। ” অন্তু বলল আমাকে একটু বুড়ির বাড়ি যেতে হবে আনোয়ার চাচার খবর দিতে। সালেয়া বিবি অন্তুকে বলল কিছু খেয়ে যেতে। অন্তু বলল দুপুরে আসব খেতে। এরমাঝে একদিন অন্তুর মা এসেছিল সালেয়া বিবির কাছে। ছেলে ও স্বামীকে হারিয়ে অনেকটা অন্যরকম হয়ে গিয়েছিল। এখন হয়তো ছেলেকে ফিরে পেয়ে একটু হলেও শান্তি পাবে। তবে আজ রুনার খুব মনে পরে তার বাবার কথা। মনে পরে বাবার সাথে মেলায় যাওয়ার সেই দৃশ্যগুলো ৷ সন্ধ্যা নেমে আসলো । প্রতিদিনের মতো আজকেও সালেয়া বিবি রুনাকে পড়াতে বসলেন। কিন্তু আজকে যেন কারোরই মন ভালো নেই। রুনা প্রত্যেক বৃহস্পতিবারের জন্য অপেক্ষা করে । ভাবে এইদিন তার বাবা আসবে। একবার তার বাবা শহরে গিয়েছিল । তখনও রুনা তাকে অনেকদিন দেখেনি । সেইবার তার বাবা কোনো এক বৃহস্পতিবার বাড়ি ফিরে আসছিল । ওই জন্যই সে ভাবে বাবা হয়তো বৃহস্পতিবার বাড়ি ফিরবে। সে ঘুমিয়ে গেল। বৃহস্পতিবার সকাল । রুনা বাড়ির উঠোনে বসে থাকে। তবে আজ সকালটা যেন অন্যরকম । চারিদিক থেকে খবর আসলো হানাদার বাহিনীরা নাকি আত্মসমর্পণ করেছে। রুনা এতো কিছু বোঝে না । সে তার মাকে বলে, ” মা, আজকে বাবা ফিরবে? “। সালেয়া বিবি বলে, ” ফিরবে মা “। চারিদিকে বিজয়ের আনন্দ । সালেয়া বিবি ও রুনা অপেক্ষায় বসে থাকে । দুপুরের পর বাজারে বিজয়ের মিছিল বের হয় ।অন্তু লাল- সবুজ পতাকা নিয়ে ছুটি আসে রহিম মিয়ার বাড়িতে । সালেয়া বিবিকে জানায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পণ করেছে । রুনা জিজ্ঞেস করে, ” বাবা কোথায়? ” অন্তু বলে ” বিজয়ের পতাকা হাতে আসতেছে। অন্তু বাজারে চলে যায় । সবার আনন্দ- উল্লাস দেখে। এর আগে কেউ কখনো মানুষের এতো আনন্দ দেখেনি। এরপর হঠাৎ দেখে দু’জন লোকের উপর ভর করে রহিম মিয়া আসতেছে । সবাই তার দিকে ছুটে গেল। যুদ্ধে তিনি তার দুটো পা হারিয়ে পঙ্গু হয়ে গিয়েছেন। তার দুটো পা’য়ের বিনিময়ে স্বাধীনতা এসেছে। কত মানুষ প্রাণ হারিয়েছে । তারা আর কোনোদিন ফিরবে না। ফিরবে না তো কি হয়েছে , তারা প্রত্যেকে এক একটা স্বাধীন বাংলাদেশ ।সবার উদ্দেশ্যে রহিম মিয়া বললেন ” স্বাধীনতা অর্জন করার চেয়ে রক্ষা করা কঠিন। ” তোমাদেরকে সেটা করতে হবে । রহিম মিয়া উপস্থিত সবাইকে স্বাধীনতা যুদ্ধে অবদান রাখা মুক্তিযোদ্ধাদের ত্যাগকে হৃদয়ে ধারণ করতে বললেন। বাজারে উপস্থিত সবাই সমস্বরে বলল ” যাদের বিনিময়ে এসেছে এ স্বাধীনতা, আমরা তোমাদের ভুলব না। ” শেষ বিকেলে সবাই বিজয়ের মিছিল দিয়ে রহিম মিয়াকে নিয়ে তার বাড়ি আসে । ঘরে থাকা রুনা ও সালেয়া বিবি বিজয় মিছিল শুনতে পেয়ে দৌড়ে বাইরে আসে । দেখে অনেক লোক তার বাড়ির দিকে আসতেছে । রহিম মিয়াকে দেখে কান্না ধরে রাখতে পারলেন না । রুনা দৌঁড়ে বাবার কাছে গেলেন । সালেয়া বিবি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন । রহিম মিয়াকে চিনতে যেন কষ্ট হচ্ছে। ক্ষত- বিক্ষত শরীর, পা নেই । সালেয়া বিবি কাছে গেলেন। বললেন ” আপনি হেরে যাননি, আমাদের জন্য ইতিহাস হয়ে ফিরেছেন। ” রুনা বলে, ” বাবা তুমি হাঁটতে না পারলে কি হয়েছে, আমি বড় হয়ে তোমাকে মেলায় নিয়ে যাবো।” মেয়ের কথা শুনে রহিম মিয়া কান্না করে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে। তার যেন বলার কিছুই নেই। ভাঙা কণ্ঠে রহিম মিয়া বলে উঠলেন, ” আমার দুটো পা নেই, কিন্তু এই স্বাধীন মাটিতে আজ আমি সম্পূর্ণ একজন মানুষ। এই দেশই আমার শক্তি, বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা। ”রুনা তার বাবাকে জড়িয়ে ধরা অবস্থায় বলল, ” তোমার রক্তে লেখা সাহস আমি নিজের ভিতর রাখবো আজীবন। সালেয়া বিবি চুপচাপ তাকিয়ে রইল, চোখের কোণে চিকচিক করল আনন্দের অশ্রু, আর মুখে ভেসে উঠল এক অনন্ত বিজয়ের হাসি ।

লেখক: সদস্য, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!