নারী দিবস: উদযাপন নয়, প্রয়োজন আত্মজিজ্ঞাসা

নারী দিবস: উদযাপন নয়, প্রয়োজন আত্মজিজ্ঞাসা
শিমলা পাল
বছর ঘুরে ৮ মার্চ এলেই শহর সাজে বর্ণিল ব্যানারে, মঞ্চে উচ্চারিত হয় নারীর ক্ষমতায়নের জোরালো স্লোগান, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভরপুর শুভেচ্ছা বার্তা। এমন দৃশ্যপটে মনে হতেই পারে যে, নারীর জীবনে এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে! কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় যখন ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে, তখন প্রশ্ন জাগে নারী দিবসের এই উদযাপন কি কিছুটা প্রহসনে পরিণত হচ্ছে না? আন্তর্জাতিক নারী দিবসের মূল চেতনা ছিল সংগ্রাম, অধিকার আদায় এবং সমতার দাবি। এটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক দিবস নয়; বরং নারীর নিরাপত্তা, মর্যাদা ও মানবাধিকারের প্রশ্নে বিশ্বব্যাপী এক প্রতীকী অবস্থান। প্রতিদিন সংবাদপত্র খুললেই চোখে পড়ে ধর্ষণ, যৌন সহিংসতা ও শিশু নির্যাতনের খবর। কখনো স্কুলপড়ুয়া, কখনো কর্মজীবী নারী, কখনো গৃহবধূ নিরাপত্তাহীনতার বৃত্ত যেন ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। শুধু অপরাধের সংখ্যা নয়, ঘটনাগুলোর নির্মমতাও আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়। এটি আমাদের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক মূল্যবোধের দুর্বলতাকেই প্রকাশ করে। প্রশ্ন জাগে, যে সমাজে নারীরা ঘর, রাস্তা কিংবা কর্মক্ষেত্র কোথাও পুরোপুরি নিরাপদ নন, সেখানে কিসের উদযাপন? নারী দিবস পালনের মাধ্যমে আমরা যে সম্মান প্রদর্শন করি, সেটা যদি বছরের বাকি ৩৬৪ দিনে প্রতিফলিত না হয়, তবে তা নিছক আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। প্রতিটি ঘটনার পেছনে থাকে একটি ভেঙে যাওয়া পরিবার, একটি আতঙ্কিত শৈশব এবং একটি অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ধর্ষণের ঘটনায় অনেক সময় ভুক্তভোগীকেই প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। তার পোশাক, সময় কিংবা অবস্থান নিয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। অথচ অপরাধীর মানসিকতা, সামাজিক শিক্ষার ঘাটতি এবং নৈতিক অবক্ষয় নিয়ে আলোচনা তুলনামূলক কম হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গিই প্রমাণ করে সমস্যা কেবল আইনের নয়; সমস্যা আমাদের মানসিকতায়ও। নারী দিবসে আমরা নারীদের সাফল্যের গল্প বলি। আজ নারীরা নেতৃত্ব দিচ্ছেন, অর্থনীতির চাকা সচল রাখছেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় ভূমিকা রাখছেন এবং বিশ্বকে বিস্মিত করছেন তাদের অর্জনে। কিন্তু একই সময়ে অনেক নারীকে ভয়ের মধ্যে ঘর থেকে বের হতে হয়, আরোপ করা হয় নানান বিধিনিষেধ। এই দ্বৈত বাস্তবতা আমাদের গভীর আত্মসমালোচনার দাবি তোলে।
নারী দিবস তখনই অর্থবহ হয়ে উঠবে, যখন এটি আত্মসমালোচনার দিন হিসেবেও বিবেচিত হবে। আমরা আমাদের সন্তানদের কী শিক্ষা দিচ্ছি? আমরা কি ছেলে সন্তানদের নারীর প্রতি সম্মান দেখাতে শেখাচ্ছি? আমরা কি নারীদের জন্য নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারছি? আমরা কি কন্যা শিশুর প্রতিও সমানভাবে যত্নশীল? সহিংসতার ঘটনায় আমরা কি নীরব থাকছি, নাকি প্রতিবাদ করছি? ধর্ষিত বা নির্যাতিত নারী হয়তো কারো সন্তান, কারো বোন, কারো স্ত্রী। আমরা ক্ষণিকের ক্ষোভ প্রকাশ করি, সামাজিক মাধ্যমে প্রতিবাদ লিখি, তারপর আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাই। তাহলে কি আমাদের উদযাপন এক ধরনের সামাজিক ভণ্ডামিতে পরিণত হচ্ছে? নারী দিবস কেবল উদযাপনের দিন হতে পারে না; এটি আমাদের বিবেককে জাগিয়ে তোলার দিনও। আমরা কোথায় পিছিয়ে আছি, কোন মূল্যবোধে ঘাটতি রয়েছে, কোন জায়গায় নীরবতা ভাঙা প্রয়োজন—সেসব ভাবার দিন। স্বীকার করতে হবে, আমাদের সমস্যা রয়েছে এবং তা গভীর। শুধু কঠোর শাস্তি দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়; প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন, সচেতনতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার বিকাশ। প্রয়োজন এমন একটি প্রজন্ম গড়ে তোলা, যারা নারীকে দুর্বল নয়, বরং সমাজের সমান অংশীদার হিসেবে দেখবে। শুভেচ্ছা জানানোর আগে নিশ্চিত করতে হবে সম্মান। উদযাপনের আগে প্রয়োজন আত্মসমালোচনা—আমরা সত্যিই কতটা বদলেছি?
তাই নারী দিবস হোক দ্বৈত প্রতিজ্ঞার দিন—অর্জনের আনন্দ এবং অসম্পূর্ণতার স্বীকারোক্তি। উদযাপনও থাকবে, আত্মসমালোচনাও থাকবে। কারণ সত্যিকারের সম্মান শুরু হয় আত্মজিজ্ঞাসা থেকে, আর সেখান থেকেই জন্ম নেয় ন্যায্য ও মানবিক সমাজ। যেদিন কোনো নারী ভয়ের পরিবর্তে আত্মবিশ্বাস নিয়ে পথ চলতে পারবে, যেদিন ধর্ষণের খবর ব্যতিক্রম হয়ে দাঁড়াবে—সেদিন ৮ মার্চ নিঃসন্দেহে প্রকৃত উদযাপনের দিন হবে। তার আগে পর্যন্ত এটি আমাদের জন্য আয়নার সামনে দাঁড়ানোর দিন, নিজেদের বদলে দেওয়ার অঙ্গীকারের দিন।
শিমলা পাল
শিক্ষার্থী, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

