স্কুলব্যাগ নয়, কাঁধে শ্রমের বোঝা: হারিয়ে যাচ্ছে শৈশব
স্কুলব্যাগ নয়, কাঁধে শ্রমের বোঝা: হারিয়ে যাচ্ছে শৈশব
সকালের আলো ফুটতেই যখন অনেক শিশু বই-খাতা নিয়ে বিদ্যালয়ের পথে হাঁটে, তখন একই সময়ে দেশের অসংখ্য শিশু জীবিকার তাগিদে পা বাড়ায় কর্মক্ষেত্রে। কারও হাতে চায়ের ট্রে, কারও কাঁধে ইটের বোঝা, কেউ বাসা বাড়িতে, আবার কেউ ব্যস্ত রিকশার গ্যারেজে। যে বয়সে তাদের খেলাধুলা ও স্বপ্ন দেখার কথা, সেই বয়সেই তারা জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। এই দৃশ্য আমাদের সমাজে এক নীরব কিন্তু গভীর সংকটের ইঙ্গিত দেয় কেননা আজকের শিশুই আগামীর ভবিষ্যৎ। বাংলাদেশের বহু শিশুর শৈশব হারিয়ে যাচ্ছে এই শ্রমের ভিড়ে।
বিশ্বব্যাপী শিশুশ্রম এখন একটি গুরুতর সমস্যা। বিবিএস বলছে, আমাদের দেশের মোট জনসংখ্যার ৪৫ শতাংশই শিশু। দেশে প্রায় ৩৫ লাখ শিশু শ্রমিক রয়েছে এবং ১০ লাখ শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপ অনুযায়ী, দেশে ৪৫ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজ রয়েছে, যার মধ্যে ৪১ ধরনের কাজেই শিশুরা জড়িত।
এই শিশুশ্রম শুধু শৈশবকে কেড়ে নেয় না, এটি শিশুর স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং মানসিক বিকাশকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। অনেক সময় শিশুদের বাড়ি বা কাজের স্থানে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়। তারা দীর্ঘ সময় কাজের চাপ, ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ এবং অবহেলার মধ্যে দিয়ে বেড়ে ওঠে।ফলে স্বাভাবিক শৈশব হারিয়ে যায় এবং একটি শিশুর ভবিষ্যতকে গলাটিপে হত্যা করা হয়।
বাংলাদেশে এমন অহরহ ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটিয়ে যাচ্ছে। কিছুদিন আগেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঢাকার উত্তরায় একটি বাসায় গৃহকর্মী শিশুর ওপর ভয়াবহ নির্যাতনের ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল,মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছিল ছোট্ট মোহনা। এছাড়াও ময়মনসিংহ ১৮ বছরের শিশু গৃহকর্মীকে শরীরে ব্লেড দিয়ে কেটে নির্যাতনের চিত্র আমাদের মাদের বিবেক নাড়া দিয়েছিল।আবার রাজধানীর ধানমন্ডির একটি বাসায় ১১ বছরের শিশু মারিয়াকে দেওয়া হয়েছিল গৃহকর্মী হিসেবে। বিনিময়ে তার পিতা মাসুদ ইসলাম নিয়েছিলেন অটোরিকশা কেনার টাকা। মাত্র চার মাসের মাথায় লাশ হতে হয়েছে শিশুটিকে। এসব কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় বরং শিশু শ্রমের গভীর প্রতিচ্ছবি।
অপরদিকে বাংলাদেশে শিশুশ্রম প্রতিরোধে আইনগত কাঠামো বিদ্যমান । শিশু আইন ২০১৩ অনুযায়ী ১৮ বছরের নিচে সবাই শিশু।বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬(সংশোধন ২০১৮) অনুযায়ী ১৪ বছরের কম বয়সী শিশুদের যেকোনো প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং এটি দণ্ডনীয় অপরাধ । ১৪-১৮ বছর বয়সীরা শুধুমাত্র হালকা কাজ করতে পারবে, যা তাদের স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় ব্যাঘাত ঘটাবে না ।একই সঙ্গে সরকার জাতীয় শিশুশ্রম নিরসন নিতে ২০১০ গ্রহণ করেছে, যার লক্ষ্য ধীরে ধীরে সব ধরনের শিশুশ্রম বন্ধ করা । তাছাড়া গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণনীতি ২০১৫ অনুযায়ী ১৪ বছরের নিচে গৃহকর্মে নিয়োগ নিষিদ্ধ। বাংলাদেশ সংবিধানের ৩৪ অনুচ্ছেদে সব ধরনের জবরদস্তি বা জোরপূর্বক শ্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে । এছাড়া, ১৭ অনুচ্ছেদে শিশুদের বাধ্যতামূলক ও অবৈতনিক শিক্ষা এবং ২৭ অনুচ্ছেদে সমতার কথা বলা হয়েছে।১৯৮৯ সালে গৃহীত জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ (UNCRC) এর ৩২ নং ধারায় শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট সুরক্ষা প্রদান করা হয়েছে । বাংলাদেশ ১৯৯০ সালেই এই সনদে স্বাক্ষর ও অনুসমর্থন করেছে। ১৯৯০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এটি আন্তর্জাতিক আইনের অংশে পরিণত হয়। শিশু অধিকার সনদ জাতিসংঘের সবচেয়ে ব্যাপকভাবে গৃহিত মানবাধিকার চুক্তি যা জাতিসংঘের প্রায় সকল রাষ্ট্রই অনুমোদন করেছে। তদুপরি আন্তর্জাতিক শ্রম ও সংস্থা (ILO)Convention No.138 এবং ILO Convention No. 182 শিশুশ্রম নির্মূলের জন্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নির্ধারণ করেছে, যার সঙ্গে বাংলাদেশও অঙ্গীকারবদ্ধ। তবে দুঃখজনক ব্যাপার হলো এসব আইন ও নীতিমালা থাকা সত্ত্বেও শিশুশ্রম এখনো পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। আইন থাকা সত্ত্বেও বাস্তবে তা কার্যকর হয় না। অনেক কারখানা, হোটেল, গৃহকর্ম বা ইটভাটায় শিশুদের কাজ চালু থাকে, কারণ পর্যাপ্ত নজরদারি নেই এবং অল্প মজুরিতে তাদের শ্রম সহজেই ব্যবহার করা যায়।অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিক নিয়োগকর্তারা আইন অমান্য করলেও শাস্তি পাওয়ার আশঙ্কা কম।সবচেয়ে বড় কারণ হলো দারিদ্র্য । নিম্নআয়ের পরিবারগুলোতে প্রায়ই শিশুকেই উপার্জনের একটি উৎস হিসেবে দেখা হয়। পরিবারে অভাব, অসুস্থতা বা একমাত্র উপার্জনকারী না থাকার কারণে শিশুদের কাজ করতে বাধ্য করা হয়। বিশেষ করে ঢাকা শহরে শিশুশ্রম একটি চরম বাস্তবতা, যেখানে দারিদ্র্য ও পারিবারিক অসচ্ছলতার কারণে লাখো শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত। আবার একই সঙ্গে অনেক শিশুর কাছে মানসম্মত শিক্ষা সহজলভ্য নয় বা পরিবার পড়াশোনার গুরুত্ব বোঝে না। অনেকেই পড়াশোনা কে বাড়তি খরচ বলে মনে করে। এছাড়াও শিক্ষা খাতে অনেক সময় দুর্নীতির কারণে নিম্ন আয়ের মানুষজন তাদের ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা করাতে অনাগ্রহী হয়। পাশাপাশি রয়েছে সচেতনতার অভাব ,অনেক অভিভাবক জানেন না বা বিশ্বাস করেন না যে শিশুশ্রম তাদের সন্তানদের জন্য ক্ষতিকর। একই সঙ্গে সমাজের একটি অংশ এখনও শিশুশ্রমকে স্বাভাবিক বা গ্রহণযোগ্য বলে মনে করে।কিন্তু ওই শিশু শ্রমিকের কি হয় আমরা কখনো ভেবে দেখেছি? গবেষণায় দেখা গেছে পরিশেষে একজন শিশু শ্রমিক দরিদ্র অদক্ষ শ্রমিক হিসেবে থেকে যায়।শিশুশ্রমের প্রভাব শুধু একটি শিশুর জীবনে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে পুরো সমাজ ও রাষ্ট্রের ওপর। যে শিশু আজ শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, সে ভবিষ্যতে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত হওয়ার সুযোগ হারাচ্ছে। এতে একটি দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।একটি শিশুর হাতে বই থাকার কথা, স্বপ্ন থাকার কথা। যদি সেই হাতে শ্রমের বোঝা তুলে দেওয়া হয়, তবে শুধু একটি শৈশবই নয়, একটি জাতির ভবিষ্যৎও অন্ধকার হয়ে পড়ে।এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। প্রথমত, শিশুশ্রম প্রতিরোধে বিদ্যমান আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। নতুন সরকারের প্রতি আমাদের প্রত্যাশা অনেক। দ্বিতীয়ত, দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি আরও কার্যকর করতে হবে, যাতে শিশুদের উপার্জনের ওপর নির্ভর করতে না হয়। তৃতীয়ত, সকল শিশুর জন্য মানসম্মত ও সহজলভ্য শিক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি সমাজের প্রতিটি মানুষকে সচেতন হতে হবে,শিশুশ্রমকে যেন আর স্বাভাবিক বা গ্রহণযোগ্য হিসেবে দেখা না হয়।তাই আইন শুধু কাগজে নয় বরং এখনই সময় শিশুদের হারিয়ে যাওয়া শৈশব ফিরিয়ে দেওয়ার। কারণ একটি শিশুর হাতে বই ও স্বপ্নের আলোই পারে একটি জাতির আগামীকে আলোকিত করতে।সবার যৌথ উদ্যোগে, সচেতনতা ও কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে শিশুর হারানো শৈশব ফিরিয়ে আনাই পারে জাতির সত্যিকারের অগ্রগতি। শিশুরা একটি জাতির সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ।তাই এখনই সময় শিশুদের হারিয়ে যাওয়া শৈশব ফিরিয়ে দেওয়ার। কারণ একটি শিশুর হাতে বই ও স্বপ্নের আলোই পারে একটি জাতির আগামীকে আলোকিত করতে।একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়তে হলে প্রথমে রক্ষা করতে হবে শিশুর হাসি, স্বপ্ন ও শৈশবকে।

