সংবিধান মানুষের জন্য, কিন্তু মানুষ কী সংবিধান জানে?
সংবিধান মানুষের জন্য, কিন্তু মানুষ কী সংবিধান জানে?
বাংলাদেশের সংবিধান রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন। এটি আমাদের অধিকার ,কর্তব্য এবং রাষ্ট্র পরিচালনার রূপরেখা নির্ধারণ করে দেয়। সংবিধান শুধুমাত্র বিচারিক প্রক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ নয় বরং দেশের সর্বস্তরের মানুষের জীবনে সমতা, ন্যায্যতা এবং স্বাধীনতার আধার হিসেবে ,রাষ্ট্র ও জনগণের সম্পর্কের মাঝে মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। কারণ এই সংবিধানে বলে যে তারা সমান অধিকার পাবে, ন্যায় বিচার, বাক স্বাধীনতা , স্বাস্থ্য ও শিক্ষার সুযোগ পাবে ।কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে যে সংবিধান সাধারণ মানুষের জন্য, সেই সংবিধান বা আইন সাধারণ মানুষজন কতটুকু জানে?
Ignorance of the law excuses no one(আইন না জানা কাউকে ক্ষমা করে না)। কিন্তু আমাদের দেশের অধিকাংশ নাগরিক জানে না তাদের মৌলিক অধিকার কী, নাগরিক কর্তব্য কী, কিংবা সংবিধান কীভাবে তাদের জীবনে প্রভাব ফেলে। সাধারণ জনগণের ধারণা এতটাই কম যে তারা প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হয় ,মৌলিক অধিকার হারায়, কখনো কখনো অজান্তেই অপরাধী হয়ে ওঠে। একজন গার্মেন্টস শ্রমিক সাপ্তাহিক ছুটি না পেলে যায় জানে না সে কোথায় অভিযোগ করবে কিংবা কোন একজন ব্যক্তি জমি সংক্রান্ত মামলায় কাগজপত্র না বুঝেই স্বাক্ষর করে সর্বস্ব হারিয়ে ফেলল ,এটাই আইন না জানার নির্মমতা। সংবিধান হলো রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলিল, অথচ সেটি কেবল বিচারক, আমলা বা আইনজীবীদের জ্ঞানে সীমাবদ্ধ। আইনি অজ্ঞতা যেন একটি নিঃশব্দ দৈত্য, যা প্রতিদিন সাধারন মানুষকে গিলে ফেলছে।
আইনি অজ্ঞতার কারণ:
১. শিক্ষাব্যবস্থায় ঘাটতি: মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকে সংবিধান ,নাগরিক কর্তব্য, মৌলিক অধিকার নিয়ে খুব কম আলোচনা হয়েছে বা অনেকটা গুরুত্বহীন।
২. প্রশাসনিক জটিলতা: মানুষ মনে করে আদালত মানেই ভোগান্তি। এই ভয় ও মানুষকে দূরে সরিয়ে দেয়।
৩. আইনের কঠিন ভাষা: সংবিধান বা প্রচলিত আইনের ভাষা সাধারণ মানুষের বোধগম্য নয় ।
৪.সচেতনতার অভাব: গণমাধ্যমে বা জনপরিসরে খুব কম আইনভিত্তিক আলোচনা হয় । ফলে জনগণ আইন নিয়ে ভাবে না এবং জানে ও না।
এর ফলে আইনের মৌলিক বিষয় না জানার কারণে প্রতিনিয়ত অধিকাংশ মানুষ প্রতারণা, হয়রানির শিকার হচ্ছে। জমি কেনাবেচা থেকে শুরু করে পুলিশি গ্রেপ্তার, শ্রমিকের মজুরি না পাওয়া কিংবা নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনায় অজ্ঞতা মানুষকে করে তুলেছে অসহায়। বিচার প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ, আইনি সহায়তা গ্রহণ কিংবা মামলার নিয়ম না জানার কারণে প্রতিনিয়ত মানুষ তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। প্রতিটি ক্ষেত্রে যদি মানুষ আইন জানতো তাহলে অনিয়ম এবং দুর্নীতির পথ অনেকটাই বন্ধ হয়ে যেত। আদালতে হয়রানি আইনের অপব্যবহার বা আমলা তান্ত্রিক দুর্নীতির শিকার হয়ে মানুষ মনে করে আইন শুধু প্রভাবশালীদের জন্য , গরিবদের জন্য নয়। সংবিধান না জানা বা আইনের এই অজ্ঞতা শুধুমাত্র একক ব্যক্তির উপরে প্রভাব ফেলে না বরং দেশের শাসন ব্যবস্থায় ও এক বিরূপ প্রভাব ফেলে। কারণ সচেতন নাগরিক ছাড়া সুশাসন, ন্যায়বিচার, দুর্নীতি দমন বা মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।
সমাধান:
১. আইন শিক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধিতে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ।
২.সরকারি এবং বেসরকারি উদ্যোগে জনসাধারণের জন্য সহজ ভাষায় আইন সংক্রান্ত তথ্য সরবরাহ করা
৩. মিডিয়া এবং সামাজিক গণমাধ্যমে আইনের গুরুত্ব প্রচার করা।
৪. আইনজীবী ,বিচারক বা সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের জোরদার ভূমিকা পালন করা।
৫. আইনি শিক্ষা বিষয়ে স্কুল-কলেজ পর্যায়ে ক্লাব এবং সেমিনার আয়োজন।
৬. সাধারণ মানুষের সমস্যা দ্রুত সমাধানের জন্য সহজ ও দ্রুত আইনি প্রক্রিয়া গ্রহণ। যাতে আইনের জটিলতার কমে এবং মানুষের আইনের প্রতি আস্থা ফিরে পায়।
৭. ডিজিটাল প্লাটফর্মে আইনের সহজ এক্সেস।
৮. আইন সংক্রান্ত হেল্পলাইন এবং সহায়তা কেন্দ্র স্থাপন।
৯. সংবিধান এবং আইনের পুস্তিকা সহজলভ্য এবং জনপ্রিয়করণ।
১০. আইন শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা।
একটি জাতিকে জানতে হবে সংবিধান শুধুমাত্র রাজনীতিবিদদের অস্ত্র নয় এটি সাধারন মানুষের ঢাল।
একজন রিকশাচালক যেদিন বলবে “এই কাজটি সংবিধান বিরোধী ,আমি এর প্রতিবাদ করি”সেদিনই বোঝা যাবে সংবিধান শুধু মানুষের জন্য নয় ,মানুষ ও সংবিধান বোঝে। আজ আমাদের দরকার আইনের ভাষায় নয়, জীবনের ভাষায় সংবিধানকে বোঝানো। মানুষ সংবিধান জানলে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে জানবে, অধিকার আদায় করতে পারবে এবং সম্মান নিয়ে বাঁচতে পারবে। মানুষ জানবে রাষ্ট্র শুধু শাসকের নয়, তার ও। সংবিধান শুধু রাষ্ট্রের কোন দলিল নয় , একজন নাগরিকের নৈতিক চেতনা ও জীবনবোধের ও অংশ । এখন সময় এসেছে আমাদের অজ্ঞানতার দেয়াল ভেঙ্গে ফেলার এবং দায়িত্বশীল, সচেতন নাগরিক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার। এই উপলব্ধিই হতে পারে সুবিচার ভিত্তিক সমাজের ভিত্তি।

