বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন
হোম / ফিচার / নিবন্ধ

বৃষ্টিভেজা বন্ধুত্ব: স্মৃতির ভেলায় ভেসে চলা

Author

মোছাঃ ইসমা খাতুন , ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৫ পাঠ: ১০৯ বার

আমাদের বন্ধুত্বের বন্ধনটা যেন একটি ডায়েরি, যেখানে প্রতিটি পাতায় লেখা আছে হাসি-কান্না, পাগলামি আর অফুরন্ত ভালোবাসার গল্প। সময় পেরিয়ে যায়, কিন্তু এই বন্ধনটা আরও মজবুত হয়। ঠিক যেমন নদীর ধারা, যা কোনো বাধাতেই পথ হারায় না, অবিচল বয়ে চলে। চতুর্থ সেমিস্টার পরীক্ষা শেষ করে পরদিন আমরা চারজন মিলে যখন বের হলাম, তখন নিমিষেই পৃথিবীটা যেন আরও রঙিন হয়ে উঠল, দিনটা ছিল তেমনই এক চমৎকার স্মৃতিময়।
দিনটি ছিল বৃহস্পতিবার, সকাল ৯ টার বাসে কুষ্টিয়ার উদ্দেশ্য ক্যাম্পাসের বাসে চারজন বের হয়েছি। হাফসা, রিথি আর নুসরাত বাসের কাছে আগেই পৌঁছে গিয়েছিল। আমার সকালে কোচিং থেকে আসতে হয়েছিল বলে পৌঁছাতে সামান্য দেরি হয়ে গেল। এদিকে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়তে আরম্ভ করেছে। আমরা বাসে উঠে পড়লাম। আমাদের সাথে ছিল রিথীর ছোট বোন। এসএসসি পরীক্ষা শেষে আমাদের ক্যাম্পাসে বেড়াতে আসছে, মূলত ওর জন্যই আমাদের ঘুরতে যাওয়া। ডাবল ডেকার বাসের উপর তলার একদম পিছনে আমরা। সিট নেই, আমি,নুসরাত আর রিথির বোন সিঁথি কোনোভাবে গাদাগাদি করে বসলাম। হাফসা আর রিথী আমাদের সামনেই দাঁড়িয়ে ছিল। সবাই কাছাকাছি থাকায় আমাদের গল্প করার আরো সুবিধা হয়ে গেল। এদিকে অনেক জোরে বৃষ্টি শুরু হয়ে গিয়েছে, এখন ঘুরবো কিভাবে! সে বিষয়েপাত্তা না দিয়ে আমরা চলতে থাকলাম। অবশেষে পৌঁছে গেলাম আমাদের কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য ফকির লালন শাহের মাজারে। তখন ভারী বৃষ্টি শুরু হয়ে দিয়েছিল। আমরা ছাতা নিয়ে কোন মতো ভিতরের প্রবেশ করলাম। প্রবেশপথটি যথেষ্ট গোছানো এবং সুন্দর পরিবেশ ছিল। প্রবেশ করতেই সামনেই সমাধি স্তম্ভ গুলো ছিল। সুন্দর সুসজ্জিত ছোট একটি কক্ষের মধ্যে আবদ্ধ ছিল লালন ফকিরের মাজারটি। আর বাইরে কিছু মাজার ছিল তার শিষ্যদের। মাজারটি দেখে প্রথমেই আমার মনে হল, যদি লালন ফকির থাকতেন তবে তার মাজারের এই দশা দেখে তিনি আবার কতই না গান রচনা করতেন!
কারণ যে লালন সারা জীবন জাতপাতের বিরুদ্ধে লড়াই করে গিয়েছেন, আজ তার মাজার হচ্ছে পূজনীয়। তার মাজারটি লালসালু দ্বারা আবৃত ছিল, পাশে জ্বলন্ত মোমবাতি এবং একটি বৈদ্যুতিক পাখা দেওয়া রয়েছে। আমার ধারণা, লালন ফকির এসব দেখলে জীবিত মানুষের অবহেলার দশা এবং মৃত মানুষের এ সকল আড়ম্বরপূর্ণ পূজনীয় পরিবেশ সম্পর্কে না জানি কী বলতেন! আশেপাশে তার গানের কিছু লাইন দেখতে পেলাম। গানগুলো সবই আমাদের জন্য কমন ছিল, কারণ রেসেন্ট সেমিস্টারে লালন ফকিরের উপর কোর্স ছিল আমাদের। যাইহোক,১০ টাকার টিকিট কেটে আমরা ভেতরে প্রবেশ করলাম। সেখানে লালন ফকিরের ব্যবহার্য বিভিন্ন আসবাবপত্র এবং তার জীবনের কিছু তথ্যচিত্র সুসজ্জিত করা ছিল। আমাদের সেখান থেকে ফেরার সময় হয়ে গেল, কিন্তু তখনো ভারি বৃষ্টি। বাহিরে কিছু দোকানপাট ছিল। সবাই সেখান থেকে কিছু জিনিস কিনে আমরা রওনা হলাম বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত রবীন্দ্র কুঠিবাড়িতে। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি, মৃদু হাওয়া আর ভীরহীন পরিবেশ আমাদের জন্য ছিল অত্যন্ত উপভোগের বিষয়। সেখানে গিয়ে জানতে পারলাম ছোটবেলায় পড়া ‘দুই বিঘা জমি’ কবিতার সেই উপেনের কাহিনী। আমরা পাঁচজন প্রত্যেকটি জায়গা ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম এবং বেশি লোকজন না থাকার ফলে ইচ্ছামত ছবি তুলতে ভালোই ব্যস্ত ছিলাম। প্রকৃতি ঘেরা, দারুণ কারুকার্য মণ্ডিত বাড়িটি অসম্ভব সুন্দর। দুপুরের খাবার খেয়ে সবাই আবার ক্যাম্পাস ব্যাক করলাম।

কিন্তু আমাদের ভ্রমণ এখনো শেষ হয়নি। পরদিন চলে এলাম আড়াইশো বছরের পুরোনো এক জমিদার বাড়ি। হাফসা আর নুসরাতের ঐ দিনই বাড়িতে যাওয়ায় ওরা সেদিন যেতে পারল না। সেদিনের ভ্রমণে আমাদের সাথে যুক্ত হলো তারিন আর অনিক। অনিকের বাসা ঝিনাইদহে, ওর থেকে জেনেই আমরা ক্যাম্পাসের বাস থেকে নেমে পড়লাম ঝিনাইদহ শহরের প্রবেশমুখ আরাপপুর। এখান থেকে প্রায় দুই কিলো দূরে এককালের স্রোতস্বিনী নবগঙ্গার কোলঘেঁষে মুরারীদহ গ্রামে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মিয়ার দালাল। সেখানে পৌঁছে জানতে পারলাম তৎকালীন (১৮২২খ্রি.) নলডাঙ্গা রাজবংশের দেওয়ান সলিমুল্লাহ নবগঙ্গা নদীতে সপরিবারে নৌবিহারকালে ব্যাঙ সাপকে খেয়ে ফেলার অস্বাভাবিক দৃশ্য দেখে সেখানে একটি অবকাশ কেন্দ্র নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন। নদীতে বাঁধ দিয়ে ইমারতটি নির্মাণ করা হয়েছিল। সলিমুল্লাহর মতে, এ ছিল যেন নদীর মাঝে ভাসমান একখানা পদ্মফুল। লোকমুখে শোনা যায়, এই বাড়িটি থেকে নবগঙ্গা নদীর নিচ দিয়ে একটি সুড়ঙ্গ ছিল, যার প্রবেশমুখ এখনো চিহ্নিত করা যায়। কালের পরিক্রমায় হাত বদল হয় বাড়িটির মালিকানা। সলিমুল্লাহ থেকে সেলিম চৌধুরী। এই সেলিম চৌধুরী স্থানীয়ভাবে পরিচিতি পায় মিয়া সাহেব নামে। আর সেখান থেকেই ‘মিয়ার দালান’। বাড়িটি ছোট হলেও হালকা বৃষ্টিতে সৌন্দর্যমন্ডিত ভবনে কাটানো আমাদের প্রতিটি মুহূর্তই ছিল অসাধারণ।
এখান থেকে চলে গেলাম প্রকৃতির এক নৈসর্গিক স্থান মর্ডান মোড়ে ধোপাঘাটা ব্রিজ সংলগ্ন রিভার গার্ডেন ক্যাফে। হালকা বৃষ্টিতে প্রকৃতির মনোরম পরিবেশ বেষ্টিত জায়গাটি ছিল অসাধারণ মনোমুগ্ধকর। কৃত্রিম লেইক এ রঙিন মাছের খেলা করার দৃশ্যটি ছিল অবর্ণনীয়। এছাড়াও সুন্দর সুন্দর গাছ দ্বারা সাজানো অসম্ভব সুন্দর পরিবেশ। ক্যাম্পাসের বাস আসতে তখনও অনেক দেরি। তাই সবাই ঠিক করল ঝিনাইদহের বিখ্যাত শিক-কাবাব খেতে যাবো। কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখি শুক্রবার হওয়ায় সব দোকানই বন্ধ। অনিক খুব চেষ্টা করেছিল যাতে আমরা খেতে পারি। প্রায় আশেপাশে সবগুলো দোকানই চেক করা হয়েছিল খোলা আছে নাকি। না পেয়ে অবশেষে দুপুরের খাবার শেষ করে ক্যাম্পাসের বাসে করে চলে এলাম আমাদের বৃষ্টি বিলাসের গল্প শেষ করে। হয়ে গেল আমাদের এক স্মৃতিময় ভ্রমণ।

লেখক: কার্যনির্বাহী সদস্য, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ১০ আগস্ট ২০২৫ তারিখে প্রতিদিনের সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!