বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

গালিবের গজল: বাসনার দ্বিতীয় পদক্ষেপ

Author

মোছাঃ ইসমা খাতুন , ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

প্রকাশ: ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫ পাঠ: ৫২ বার

জীবনভর একই ভুল করে

গেলে গালিব, ধুলা ছিল চেহারায়,

পরিষ্কার করলে আয়না

-মির্জা গালিব

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়ার বাংলা বিভাগ নিয়মিত বিভিন্ন সেমিনার এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডসহ গবেষণাধর্মী কাজের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারাদেশে এক উন্নত ভাবমূর্তির সৃষ্টি করেছে। এই বিভাগ শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জ্ঞানচর্চা ও শিক্ষামূলক কার্যক্রমকে উৎসাহিত করা এবং নিয়মিত পাঠ্যক্রমের বাইরে শিক্ষার্থীদের অগ্রসর হওয়ার ক্ষেত্রে বিভিন্ন সেমিনারের আয়োজন করা হয়ে থাকে। ঠিক এমনই এক সেমিনারের সাক্ষী হলাম গত ১ ডিসেম্বর বাংলা বিভাগ কর্তৃক আয়োজিত ‘গালিবের গজল: বাসনার দ্বিতীয় পদক্ষেপ’ শীর্ষক এক সেমিনারে উপস্থিত হয়ে।

মির্জা গালিব ছিলেন উর্দু ও ফার্সি সাহিত্যের এক মহান প্রদীপ্ত স্তম্ভ, যিনি তার দার্শনিক গজল, কবিতা এবং কাওয়ালী গানের মাধ্যমে ভারতীয় সাহিত্যকে চিরদিনের জন্য সমৃদ্ধ করে গিয়েছেন।

প্রতিদিনের মতো রুটিন অনুযায়ী সকাল ৯টা থেকে আমাদের ক্লাস শুরু হয়েছে। দ্বিতীয় ক্লাস চলাকালীন শ্রদ্ধেয় ম্যাম ডক্টর ফৌজিয়া খাতুন দ্রুত ক্লাস শেষ করে দিয়ে আমাদের সবাইকে সেমিনারে উপস্থিত হওয়ার জন্য অনুপ্রাণিত করলেন। আমরা সবাই সেমিনারের উদ্দেশ্যে ‘গগন হরকরা গ্যালারী’ তে চলে আসলাম। কিছুক্ষণ পরেই প্রায় এগারোটার দিকে এই অনুষ্ঠানের কার্যক্রম শুরু হলো। অনুষ্ঠানের সঞ্চালনায় ছিলেন আমাদের অত্যন্ত প্রিয় শিক্ষক, প্রফেসর ডক্টর মো. রশিদুজ্জামান। কিছুক্ষণের মধ্যেই উপস্থিত হলেন সেমিনারে প্রধান অতিথি ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. নকীব মোহাম্মদ নসরুল্লাহ, বিশেষ অতিথি কলা অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. মো. এমতাজ হোসেন এবং সেমিনারে মূল আলোচক লেখক ও গবেষক জাভেদ হুসেন।

শুভেচ্ছা বক্তব্য ও স্যারদের বরণ করে নেওয়ার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানটি শুরু হল। আমরা বসেছিলাম এই কক্ষের মাঝামাঝিতে। আমি, হাফসা, রিথী আর নুসরাত একসঙ্গে বসেছি। সত্যি বলতে অনুষ্ঠানের প্রথম পর্যায়ে আমি একদম মনোযোগী ছিলাম না। কিন্তু ভাইস চ্যান্সেল স্যারের বক্তব্যে গালিবের সৃষ্টিশীলতা ও আধুনিক সাহিত্যচিন্তায় তার প্রভাবের গুরুত্ব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি এতটা প্রাণবন্ত আলোচনা করেছিলেন যে কখন তার বক্তব্য হারিয়ে গিয়েছি বুঝতেই পারিনি। আমাদের ভিসি স্যারের সঙ্গে আমার এর আগে বিতর্ক প্রতিযোগিতার মধ্যে দিয়ে দুইবার সাক্ষাৎ হয়েছিল। তখন থেকে আমার মনে হয়েছে তিনি অত্যন্ত সৌখিন মানুষ। রস দিয়ে বর্ণনা করতে তিনি যে কতটা দক্ষ আজ সেটা আরো ভালোভাবে বুঝতে পারলাম। তিনি বললেন, ‘গালিবের গজল কেবল প্রেম বা বাসনার অনুভূতির প্রকাশ নয়, এটি মানবিক ও দার্শনিক অন্তর্দৃষ্টির এক অনন্য মাধ্যম। যা সাহিত্য প্রেম, জীবনদর্শন ও আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানের সমন্বয়।’ গালিবের গানকে তিনটি ধারা প্রেম ও বাসনা, মানবিক আবেগ এবং দার্শনিক ধারা যা জীবন, মৃত্যু, বাস্তবতা ও মানবিক সত্য নিয়ে গভীর চিন্তা এবং আধ্যাত্মিক অর্থাৎ আত্মা, ঈশ্বর ও ব্রহ্মাণ্ডের রহস্য অনুধাবনের প্রচেষ্টা ও সুফি ভাবধারায় ব্যাখ্যা করলেন।

এর পরেই শুরু হলো সেমিনারের মহেন্দ্রক্ষণ। অনুষ্ঠানের মূল আলোচক জাভেদ হুসেন স্যার বক্তব্য রাখলেন। উল্লেখ্য, তিনি মির্জা গালিব সম্পর্কে নিজেই অনুবাদ করেছেন। তাই তার আলোচনা অত্যন্ত উৎসাহ নিয়ে শুনছিলাম। প্রথমে তিনি গালিবের উক্তি দিয়ে সাজানো আমাদের গ্যালারি রুম, যা উন্নত রুচির পরিচয় দেয় বলে প্রশংসা করলেন এবং উচ্চপদস্থ ব্যক্তিরা শুধু পদমর্যাদার সুবাদে আসেননি বরং সেমিনারের বিষয়বস্তু সম্পর্কে তাদের চর্চা করে আসার এ বিষয়ে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেন এবং অভিভূত হন। স্যার অত্যন্ত সাবলীল ভাষায় মির্জা গালিবের জীবন ভাবনা ও প্রেম চেতনা বিশ্লেষণ করলেন। তিনি তার বক্তব্যের মধ্যে কবিদেরকে অর্থের স্রষ্টা বলে আখ্যায়িত করেছেন। শব্দ, রুপ, রস, উপমা ইত্যাদির মধ্য দিয়ে চৈতন্যর মিল ঘটিয়ে কবিতার সৃষ্টি ঘটে। আর এই বিষয় সম্পর্কেই তিনি ধারণা দিয়েছিলেন অত্যন্ত চমৎকার এবং আকর্ষণীয়ভাবে। তিনি ‘প্রেমের বাজি খেলা’ নামে এক অভিনব বাজির কথা শুনালেন। যেখানে কবি প্রেয়সির কাছে বাজি ধরেছিল যে, ‘জিতে গেলে তুমি আমার আর হেরে গেলে আমি তোমার।’ এই সুনিপুণ দার্শনিক বাজি একমাত্র সাহিত্যিকদের পক্ষেই ধরা সম্ভব। গালিবের কবিতাগুলো যেহেতু আরবি এবং ফারসি ভাষায় রচিত, স্যার আমাদের সেই ভাষাতেই তা আবৃত্তি করে শোনাচ্ছিলেন এবং সুন্দরভাবে তা ব্যাখ্যা করে দিচ্ছিলেন। তিনি একটি লাইন বলেছিলেন, ‘প্রেমের মন্দিরে প্রতিমা তার প্রিয়, আর তিনি সেই মন্দিরের উপাসক।’ এখানে তিনি প্রেয়সিকে মন্দিরের মূর্তির সঙ্গে তুলনা করেছে। কারণ একটি পাথরের মূর্তিতে যেমন আনন্দ, দুঃখ, কষ্ট, আবেগ থাকে না; তার প্রিয়াও ছিল সেই গুনসম্পন্ন। কারণ সে তাকে ভালোবাসতো না। কিন্তু তিনি দুঃখে আক্রান্ত হয়ে কখনো কাবু হতেন না। বরং স্রষ্টার কাছে এই প্রার্থনা করেছিলেন, “হে খোদা আমার ভাগ্যে যদি তুমি এতই দুঃখ দিবে, আপত্তি নেই কিন্তু একটা হৃদয় কেন দিলে?”

কবি এখানে বোঝাতে চেয়েছিল তাকে যত দুঃখই দেওয়া হোক সে তা অনায়াসে গ্রহণ করতে পারবেন কিন্তু তা বহন করার জন্য তার একটা হৃদয় যথেষ্ট নয়। তিনি অভিযোগ করেছেন কেন স্রষ্টা তাকে এগুলো রাখার জন্য আরো হৃদয় দেননি? এরপর আমাদের একটা প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছিলেন যে, ‘জগতে আমরা যাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করি আসলেও কি তাই গুরুত্বপূর্ণ?’ প্রেম গালিবকে নিষ্কর্মা করে দিয়েছিল। তার মতে, প্রেমের মধ্যে জীবন, বেঁচে থাকার আনন্দ প্রেম। আবার প্রেমের মধ্যে জীবন-মৃত্যুর তফাৎ নেই।

এরই মাঝে আমাদেরকে হালকা নাশতা হিসেবে সিঙ্গারা এবং জিলিপি দেওয়া হয়। তখন সময় ছিল দুপুর একটা, সবাই ক্ষুধার্ত ছিলাম তাই খাচ্ছিলাম আর আলোচনা শুনছিলাম। স্যার তার আলোচনার এক পর্যায়ে মির্জা গালিবকে ইতিহাস চেতনার অন্যতম ফসল হিসেবে আখ্যায়িত করলেন। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহে মির্জা গালিব তার বন্ধুকে-ভাইকে মারা যেতে দেখেছিলেন। তিনি দেখেছিলেন কিভাবে তার মৃত ভাইকে-বন্ধুকে কবর দেওয়া হয়েছিল। তখন তিনি মনে মনে ভেবেছিলেন, কিয়ামতের দিন তো এক এক শ্রেণির মানুষ একেক জায়গায় থাকবে; একই শ্রেণিভুক্ত প্রত্যেকেরই দেখা হবে, কিন্তু তার ভাই-বন্ধুরা তো সব শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। তাহলে সবার সঙ্গেই কি তার দেখা হবে! তিনি গালিবের কবিতার আদম, কেরামুন-কাতেবিন, রাধা-কৃষ্ণ প্রত্যেকের প্রসঙ্গেই আলোচনা করেছিলেন।

আলোচনার শেষ পর্যায়ে স্যার আমাদের উদ্দেশ্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি কথা বললেন। সেটি হল, “আম গাছে এত মুকুল দেখতে পাই কিন্তু আম দেখতে পাই না।” একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমি মনে করি এই বাক্যটি আমাদের জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী বাক্যের মধ্যে অন্যতম। আম গাছের যেমন অসংখ্য মুকুল আম হতে পারে না, আগেই ঝরে পড়ে। পড়ালেখার জগৎটাও ঠিক তেমন। অবশেষে স্যার অত্যন্ত চমৎকার এবং আকর্ষণীয় একটি বিষয় ‘বাসনার পদক্ষেপ’ সম্পর্কে বললেন। তার মতে, মহাবিশ্বের যা কিছু হয়েছে এবং অনাগত কাল পর্যন্ত যা কিছু হবে সবই বাসনার প্রথম পদক্ষেপ এবং দ্বিতীয় পদক্ষেপটি কি হতে পারে এ বিষয়ে তিনি প্রশ্ন রেখেছিলেন?

অনুষ্ঠানে সর্বশেষ পর্যায়ে আমাদেরকে প্রশ্ন করার সুযোগ দেওয়া হয়। আমাদের সম্মানিত শিক্ষকরা স্যারের দুর্দান্ত আলোচনা এবং আমাদের আগ্রহ সম্পর্কে সাধুবাদ জানালেন। এবং তারা বাসনার দ্বিতীয় পদক্ষেপ সম্পর্কে নিজেদের অভিমত ব্যক্ত করলেন। শ্রদ্ধেয় ডক্টর মো. হাবিবুর রহমান বললেন, ইহজগতের সব কিছু বাসনার প্রথম পদক্ষেপ এবং পরবর্তী জীবনের ভাবনা হচ্ছে বাসনার দ্বিতীয় পদক্ষেপ। এই অনুষ্ঠানে আমি যে বিষয়ে সবচেয়ে বেশি আশ্চর্যান্বিত হয়েছিলাম সেটি হলো, একটি ছেলে স্যারকে খুবই সুন্দর একটি প্রশ্ন করে এবং সে জানায় তিনি সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার বিভাগের একজন শিক্ষার্থী। এই সেমিনারে আমাদের বিভাগের বাইরের শিক্ষার্থীরও অংশগ্রহণ সত্যিই অত্যন্ত প্রশংসনীয়। পরিশেষে অনুষ্ঠানের সভাপতি বিভাগের চেয়ারম্যান, প্রফেসর ড. মো. মনজুর রহমান স্যারের বক্তব্যের মধ্যে দিয়ে অনুষ্ঠানের কার্যক্রম শেষ হলো। তিনি দীর্ঘ সময় ধরে এই ধরনের সেমিনারে শিক্ষার্থীদের মনোযোগী দেখে অত্যন্ত খুশি হলেন এবং প্রতিশ্রুতি দিলেন আমাদের সাহিত্যিক জ্ঞানের পরিধি বাড়াতে এ ধরনের সেমিনারের আয়োজন অব্যাহত থাকবে। খুব সুন্দর এবং সুশৃংখল পরিবেশের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানটি সম্পন্ন হলো।

লেখক: কার্যনির্বাহী সদস্য, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে প্রতিদিনের সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!